কর্মহীনতার অনিশ্চয়তায় প্রবাসফেরত কর্মীরা

একটু ভালো করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে ১৪ বছর আগে বাহরাইনে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির ৩৫ বছর বয়সী মাহবুবুর রহমান। গত ফেব্রুয়ারিতে ছুটিতে দেশে এসে করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে আটকা পড়েন তিনি। এর মধ্যে তার ভিসার মেয়াদও ফুরিয়ে গেছে।

গোলাম মুজতবা ধ্রুব নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 August 2020, 07:16 AM
Updated : 24 August 2020, 08:30 AM

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “সেখানে গিয়েছিলাম ধার দেনা করে। এক কোম্পানির রিসিপশনে কাজ করে ৪০ হাজার টাকার মত পেতাম, মোটামুটি চলছিল। এখন দেশে আটকে থেকে আবার ধার দেনা করে চলতে হচ্ছে। বাহরাইনে ফেরার সম্ভাবনা দিন দিন কমছে। কি যে করব কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।”

মাহবুব তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দেশে কোনো কাজ করতে না পারায় এখন অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছে তার পরিবার। আর বাহরাইন থেকে তাকে বলা হয়েছে, মহামারী পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আপাতত আর ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই। 

মাহবুবের মত একই স্বপ্ন নিয়ে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের ছোট কালিয়াকৈর গ্রামের ৩২ বছর বয়সী মো. কবির হোসেন কাতারে গিয়েছিলেন ২০১০ সালে। অল্প বেতনে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে পরে একটি গ্যাস প্ল্যান্টের কর্মচারীর চাকরি পেয়েছিলেন।

জানুয়রির প্রথম সপ্তাহে দেড় মাসের ছুটিতে দেশে এসে তিনিও আর কাতারে ফিরতে পারেননি। ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ায় এখন তাকে আবার নতুন করে কোম্পানির অনুমোদন নিতে হবে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “তারা আমাকে চাকরিতে ফেরত নেবে। কিন্তু টিকেটের দাম অনেক বেড়ে গেছে। ওখানে গিয়ে সাত দিন কোনো হোটেলে কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। দুই মাসের প্রস্তুতি নিয়ে দেশে এসে সাত মাস পার হয়ে গেছে। এই কয় মাসে আত্মীয়-স্বজনের কাছে বেশ কিছু ধার-দেনাও হয়ে গেছে। এখন আবার দেড়-দুই লাখ টাকা জোগাড় করা আমার জন্য অনেক কঠিন।”

কবির ও মাহবুবুরের মতো প্রবাসী কর্মীদের আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বিদেশে থাকা এমন কর্মীর সংখ্যা ১ কোটির বেশি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে কোভিড-১৯ মহামারীর মধ্যে গত ৪ মাসেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৮০ হাজার প্রবাসী ফিরে এসেছেন অথবা তাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। 

তবে এপ্রিলের আগে যারা ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন, তাদের সংখ্যা ধরলে এই সংখ্যা পৌনে ৩ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর আগে যখন ফ্লাইট চালু ছিল, তখন ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দুই লাখের বেশি শ্রমিক দেশে ছুটিতে এসেছিলেন, যারা এখনও যেতে পারেননি। এরপর যখন ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেল তখন গত চার মাসে ভাড়া করা ফ্লাইটে দেশে এসেছেন প্রায় ২৫ হাজার কর্মী।

“আমাদের প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ হাজার লোক বিদেশে যেত। সেই হিসাবে করোনার কারণে যদি বলি, তাহলে আমাদের মার্চ থেকে জুলাই- এই পাঁচ মাসে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী বিদেশ যেতে পারেননি। অন্তত লাখখানেক কর্মীর ভিসা, পাসপোর্ট সব কিছু থাকার পরও তারা করোনাভাইরাসের কারণে বিদেশে যেতে পারেননি।”

ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ এপ্রিল থেকে ২২ অগাস্ট পর্যন্ত ২৩টি দেশ থেকে ৭৮ হাজার ৪৩ জন কর্মী বাংলাদেশে ফিরেছেন, যাদের মধ্যে ৭৩ হাজার ৩১১ জন পুরুষ এবং ৪ হাজার ৭৩২ জন নারী।

গত চার মাসে সবচেয়ে বেশি কর্মী ফিরেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। সেখানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ না থাকার কথা বলে ২৫ হাজার ৬৫৩ জন বাংলাদেশিকে ‘ছুটিতে’ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।     

সৌদি আরবে অবৈধ হয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে আউটপাস নিয়ে দেশে এসেছেন ১৫ হাজার ৩৮৯ জন, যাদের মধ্যে নারী কর্মী রয়েছেন ১ হাজার ৫৯৩ জন। এছাড়া ওমান থেকে ৩ হাজার ৮৮৪ জন, বাহরাইন থেকে ৭৪৬ জন কর্মী আউটপাস নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

পর্যটননির্ভর দেশ মালদ্বীপে মহামারীর মধ্যে কর্মহীন হয়ে পড়েন বিদেশি কর্মীদের অনেকেই। সেখান থেকে ৭ হাজার ৯০৯ জন বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজের চুক্তি শেষ হওয়ার পর মেয়াদ না বাড়িয়ে সিঙ্গপুর থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে ১ হাজার ৩৮২ জনকে।

অন্যদিকে কুয়েতে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় অবৈধ হয়ে পড়া ৭ হাজার ৩২৯ জন বাংলাদেশি কর্মী সাধারণ ক্ষমার আওতায় দেশে ফিরে এসেছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকা, কাতার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও ইরাকে কাজ নেই বলে এই ছয় দেশ থেকে ফেরত এসেছেন ১১ হাজার ১৩৩ জন কর্মী। কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর চুক্তি নবায়ন না করায় শ্রীলঙ্কা ও মরিসাস থেকে ফিরেছেন ১১৬ জন।

একই কারণে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে অন্তত ১০০ জন, জর্ডান থেকে ১ হাজার ২৬ জন, ভিয়েতনাম থেকে ১২২ জন দেশে ফিরে এসেছেন। আর ৬ জুলাই বাংলাদেশ থেকে ইতালি যাওয়া ১৫১ জন কর্মীকে নামতে না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে করোনাভাইরাস পরীক্ষা নিয়ে জালিয়াতির খবর আসার পর।

এছাড়াও রাশিয়া, তুরস্ক, লেবানন, নেপাল, হংকং ও জাপান থেকে ৩ হাজার ১০৩ জন কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন বলে ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে জানানো হয়েছে।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে এসে আটকা পড়া এই কর্মীদের যাতে আবার ফেরত পাঠানো যায়, সেজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি দেশের মানুষকে সরকার যেভাবে মানবিক সহায়তা দিচ্ছে, প্রবাসফেরত বাংলাদেশিদেরও তার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

ব্র্যাকের শরিফুল বলেন, যারা ছুটিতে দেশে এসে আটকা পড়েছেন, তাদের আবার বিদেশে যাওয়াটা নির্ভর করছে দুটো বিষয়ের উপর।

“একটা হচ্ছে তাদের নিয়োগকর্তা যদি তাদের আবার ফিরতে বলে, আর দ্বিতীয়টা হল দেশের মহামারী পরিস্থিতি। দুটো বিষয় পরস্পরের সাথে সংশ্লিষ্ট। যতক্ষণ না বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, নিয়োগকর্তারা তাদের ততক্ষণ কাজে ফিরতে বলবেন না।

“ইতোমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন দেশ কিছু দেশের জন্য আস্তে আস্তে দরজা খুলছে। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশ নেই, কারণ আমাদের এখানে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।”

শরিফুলের মতে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়টি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য দেশে মহামারী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসাটা জরুরি। আর এই সময়ে আটকা পড়া বাংলাদেশিরা যেন সরকারের জরুরি সহায়তা পায়, সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সভাপতি তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, দেশে করোনাভাইরাস পরীক্ষার সনদ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন দেশ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের দেশে বাংলাদেশিদের প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।

“সরকারের যেটা এখন করা দরকার, এ ধরনের ঘটনায় যে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটা বাইরে তুলে ধরতে হবে। সার্টিফিকেটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশপাশি কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে যেন নতুন করে কাউকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া না হয়। তাহলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে।”

দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের জন্য সরকার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ প্রকল্প নিয়েছে। এছাড়া ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে বিনা সুদে ২০০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে, যেখান থেকে ব্যাংক ৪ শতাংশ সরল সুদে প্রবাসফেরত ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ঋণ দেবে।

তাসনিম বলেন, এই সহায়তাগুলো পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে হতে হবে, তাহলে তার সুফল মানুষ পাবে।

এ বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মহামারীর সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে সরকার চাইবে প্রবাস থেকে এসে আটকা পড়া কর্মীদের দেশেই কোনো কাজে লাগানো যায় কি না।

“যেহেতু মহামারীর কারণে দুনিয়াতে অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে, তাই পরিস্থিতি এখনও অনেক ঘোলাটে। তবে আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, প্রোগ্রাম বানাচ্ছি।”

বিদেশফেরত ক্ষতিগ্রস্ত ও দরিদ্র কর্মী এবং বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের পরিবারের যে সদস্যরা দেশে আছেন, তাদের সরকারের সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

“বিদেশফেরত কর্মীদের কোয়ারেন্টিন শেষে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তারা যাতে দেশে ঋণ নিয়ে কাজ শুরুর চেষ্টা করতে পারেন, সেজন্য ৭০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন হয়েছে। তাদেরকে পুনঃ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আবার বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক