Published : 11 Jun 2026, 12:27 AM
বাজেটের হিসাব-নিকাশ আর ভালো-মন্দ না বুঝলেও প্রতি বছর কোন জিনিসের দাম বাড়ল বা কমল, কেবল সেই খবর রাখেন পোশাক শ্রমিক আবদুল হাকিম।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন তিনি। সকাল হলেই চলে যান কারখানায়, ফেরেন রাতে।
মাস শেষে যে বেতন পান, তা দিয়েই চলে হাকিমের পাঁচজনের সংসার। ফলে প্রতি বছর বাজেট যাই হোক, জিনিসপত্রের দাম নিয়েই কেবল তার ভাবনা আর উদ্বেগ।
আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার আগের দিন বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “মোবাইল-ফেইসবুকে বাজেটের খবর দেখি, কোনটার দাম কমছে আর কোনটার বাড়ছে শুধু এটার খবর রাখি। আর কিছুই বুঝি না।
“যা পাই তা দিয়ে সংসার চালাতে পারলেই হয়। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমলেই হয়।”
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘোষণা করা হবে বৃহস্পতিবার। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণার আভাস মিলেছে।
প্রতিনিয়ত নিজেদের আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া নানা শ্রেণিপেশার মানুষ বাজেটের আগে আগে পথে-ঘাটে চলতে ফিরতে কিংবা চায়ের দোকানেও নানা আলাপে মাতেন, যে আলোচনার বেশিরভাগটা জুড়েই থাকে জিনিসপত্রের দাম।

আইএমএফের ঋণের শর্ত মেলাতে গিয়ে গত কয়েক মাসে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের থালায় আঘাত পড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের উপরে, আর খাদ্য-বহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে আটকে আছে।
এ অবস্থায় বাজেট যাই হোক, চাল-ডাল-তেল আর মাছ-সবজির দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকলেই সন্তুষ্ট শ্রমজীবীরা। অন্য কিছু নিয়ে যেন তাদের ‘মাথাব্যথা নেই’।
মোহাম্মদপুর বসিলায় একটি নির্মাণাধীন ভবনে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন ৪৪ বছর বয়সি আকরাম হোসেন। বাজেটে জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি নিয়েই কেবল দুশ্চিন্তার তার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আকরাম বলেন, “বাজেট এলেই জিনিসপত্রের দাম আরেক দফা বাড়ে, কিন্তু মজুরি তো বাড়ে না। প্রধানমন্ত্রী গরিবের জন্য বিভিন্ন কার্ড দেয় শুনছি। কিন্তু ওসব আমাগোর কাছে আসে না।”
তার কথায়, “বাজেট নিয়ে চাওয়া নেই। শুধু চাল-ডালের দাম কমলেই হবে। দুইটা ভাত খেতে পারলেই চলে।”
এবারের বাজেট ঘোষণার পরদিনই শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। ফলে বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতির মধ্যে বাজেটের কথা আবার ভুলেও গেছেন কেউ কেউ।
ঢাকার কারওয়ান বাজারে পেট্রোবাংলার ভবনের বিপরীতে ফুটপাতের দোকানগুলোতে ঝুলছে বিভিন্ন ফুটবল দলের জার্সি। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলসহ পছন্দের দলের জার্সি কিনতে সেখানে ভিড় করছে মানুষ।
অন্যদের মত জার্সি কিনতে বুধবার সেখানে আসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি খন্দকার তৌসিফ খান। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, বিশ্বকাপের উত্তেজনায় বাজেটের কথা ভুলে গেছেন।
তার কথায়, “বাজেট প্রতিবছর হয়, বিশ্বকাপ হয় চারবছরে একবার। তাই এটি নিয়ে মাতামাতি বেশি হচ্ছে।”
বুধবার দুপুরে রাজধানীতে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে কারওয়ান বাজারে কথা হয় পান-সিগারেট বিক্রেতা হাসিব মিয়ার সঙ্গে। তার মতে, বাজেটে আসলেই দাম বাড়ে। দাম কমানোর উদ্যোগ নেবে সরকার- এমন প্রত্যাশা তার।

হাসিব মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজেটের কথা আমরাই আগে টের পাই। এসআর (বিক্রয় প্রতিনিধি) সিগারেট দেওয়া বন্ধ করে দেয়। দাম বাড়ায়, তারপর আবার আগের মতই সাপ্লাই দেয়।
“বাজেট আইলেই সবকিছুর দাম বাড়ে, এমন কিছু না হইলেই আমরা একটু স্বস্তি পাই।”
ঢাকায় একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন আবু রায়হান। নিজের বেতন আর আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করে নিজেকে ‘সংকুচিত মধ্যবিত্ত’ বলে বর্ণনা করলেন তিনি।
রায়হানের ভাষ্য, “গত তিন বছরে সামান্য আয় বেড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। এই বছর গৃহশিক্ষক না রেখে সন্তানকে কোচিংয়ে দিয়ে দিয়েছি। খাবার-দাবার কিনতেও হিসাব করি এখন। এর মধ্যে আবার করও কেটে রাখে কোম্পানি।”
বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৫ লাখ টাকা করার দাবি রায়হানের। সেইসঙ্গে বাজারে স্বস্তি ফেরানোর উদ্যোগ চান তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাওয়ার কথা বললেন ঢাকার নিউ মার্কেটের বুটিক ব্যবসায়ী সালমা আক্তার।
তিনি বলেন, “নামে-বেনামে বিভিন্ন খরচ বাড়ছে। তেলের পর বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ায় প্রতিমাসে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বেশি খরচ হবে। ফলে ব্যবসায় তো টিকে থাকতে পারব না।”

বাজেট নিয়ে তিনি বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আরো সুযোগ সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। যেমন- ‘ট্যাক্স হলিডে’ থাকতে পারে, সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দরকার।
তরুণদের কেউ কেউ ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে সরকারি বিভিন্ন চার্জ কমানোর দাবি তুলছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের এক শিক্ষার্থী তাহমীদ বলেন, “সৃজনশীল অর্থনীতির কথা বলা হলেও ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও ইন্টানেটের ওপর যদি শুল্ক না কমানো হয়, তবে প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
বিশ্ববিদ্যালয়টির চারুকলা অনুষদের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের একজন জয় সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে খোঁচাখুঁচিতে ব্যস্ত আছি। বন্ধুরা একসঙ্গে খেলা দেখার জন্য স্ক্রিন প্রজেক্টর, পতাকা আর জার্সি নিয়েই ব্যস্ত।
“তবে আমাদেরও বাজেটের খোঁজখবর রাখা দরকার। সরকার বা বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটের আগে আলোচনা সেমিনারে যুক্ত করলে অনেকেই সম্পৃক্ত হত।”