Published : 21 May 2025, 07:50 PM
টাকা পাচার হওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্পেশাল অ্যান্ড হিসটোরিকাল ফাইন্যান্সিয়াল ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে গভর্নর এ কথা বলেন।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই), দ্য ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে।
গভর্নর বলেন, “১০০ টাকা করে ধরলেও ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা সিস্টেম থেকে চলে গেছে। কোথায় চলে গেছে? বিদেশে চলে গেছে। আমার ডিপোজিট প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পেছনে ফান্ডামেন্টাল কারণ তো এটাই। এখন জোড় করে টাকা ছাপিয়ে বাজারে দিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।”
বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারে। ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কমে যাওয়ার কারণে বাজার থেকে তারল্য কমেছে বলে মন্তব্য করেন আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, “ডিপোজিট গ্রোথ ইজ স্লো (আমানত প্রবৃদ্ধি কম), ইন্টারেস্ট রেট ইজ হাই (ঋণের সুদের হার চড়া) কারণ দেশে তো অর্থ নেই। আবার এই সমস্যার সহজ সমাধান নাই। কারণ দেশ থেকে টাকা পাচার করা হয়েছে আর সেটার খেসারত এখন আমাদেরকে… পুরো ইকোনোমিকে সেটার খেসারত দিতে হচ্ছে।”
রিজার্ভ বাড়িয়ে সার্বিক আর্থিক অবস্থাকে উন্নতি করার লক্ষ্য নিয়ে সামনে আগানোর কথা বলেন গভর্নর।
তিনি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একার পক্ষে আর্থিক খাত ও ব্যাংকিং রেগুলেশন আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। পরবর্তী সরকারকে সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।
“পরবর্তী সরকার এটাকে সুন্দরভাবে সামনের দিকে নিয়ে যাবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। এগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই সময়ের দরকার রয়েছে। সে সময়টুকু দেওয়া লাগবে।”
গভর্নর মনে করেন, তারল্য দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর যা ক্ষতি হয়েছে, তা নতুন আইনের মাধ্যমে ঠিক করতে সময় লাগবে। সেখানে সরকারকে কিছু টাকা ঢালতে হবে।
আর্থিক খাতকে শক্তিশালি করাই প্রধান লক্ষ্য জানিয়ে তিনি বলেন, “অর্থনীতিতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই সেই অবস্থা থেকে স্বাভাবিক অবস্থানে নিয়ে আসতে সময় লাগবে।”
গভর্নর মনে করেন, রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হলেই কেবল অর্থনীতির অবস্থা সচল হবে। কারণ একটি সঙ্গে আরেকটি জড়িত।
“রাজনৈতিক সেন্ট্রালাইজেশনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সেন্ট্রালাইজেশন অবশ্যই রিলেটেড। যতদিন পর্যন্ত আমরা রাজনৈতিক অবস্থা ঠিক করতে না পারি, ততদিন পর্যন্ত অর্থনীতির অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।”
দেশের প্রতিটি পরিবারকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আর্থিক খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে গভর্নর বলেন, দেশে ব্যাংক ব্র্যাঞ্চের কোনো অভাব নেই। বাংলাদেশ অনেক ব্যাংক শাখার অধিকারী।
“এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বেশিরভাগ ব্যাংক টাকা তোলে (আমানত) বেশি, তবে সে অনুযায়ী ঋণ বিতরণ করে কম। তবে ব্র্যাকের ক্ষেত্রে এটা উল্টো, ব্র্যাক ১০০ টাকা তুললে ২০০ টাকা ঋণ বিতরণ করছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব ঋণ তারা বিতরণ করছে।”
তিনি বলেন, “মহিলা এজেন্ট গ্রামের কোনো বাসার পাকঘরেও (রান্না ঘর) ঢুকতে পারবেন, আবার বেডরুমেও ঢুকতে পারবেন। গ্রামের মহিলাদের শাড়ির আঁচলে থাকা কিংবা বালিশের তলে থাকা লুকিয়ে থাকা টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে হবে।
“স্কুলগুলোতে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। ম্যাট্রিক পাস করা একজন নারীকেও এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।”
ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার আরো উন্নয়নের পক্ষে মত দিয়ে আহসান এইচ মনসুর বলেন, “২৬ শতাংশ ঋণের সুদ দিয়ে মাইক্রেডিট বেশি দিন থাকতে পারবে না। তবে এ বিষয়টি আমরা বলব না। বাজার ব্যবস্থাই বলে দিবে। এজেন্ট ব্যাংকিং থেকে যারা ১৩-১৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন, তারা কেন ২৬-২৭ শতাংশ দিয়ে মাইক্রক্রেডিট নেবেন। তাই তাদেরকেও অটোমেশন করতে হবে। কারণ এজেন্ট ব্যাংকিং অটোমেশন পদ্ধতিতে চলছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ল্যাপটপ দিয়েই ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বাড়িতে ঘুরে ঘুরেই তারা টাকা সংগ্রহ করছেন নিরাপত্তার সাথে।”
মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে প্রতিদিন ৫ হাজার কোটি টাকার মত লেনদেন হচ্ছে। শিগগিরই তা ৬ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে আশা করছেন গভর্নর।
তিনি মনে করেন, আর্থিক লেনদেনকে যতদূর সম্ভব করমুক্ত রাখা উচিত। বরং ভোগ ও আয়কে করের আওতায় আনতে হবে।
“ট্যাক্স পলিসি করতে গিয়ে নানা রকমের ভুল হচ্ছে, যার খেসারত দিতে হয় ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রিকে (অর্থ মন্ত্রণালয়)।”
অন্যদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জায়দি সাত্তার, প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট আশিকুর রহমান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের পরিচালক আনিস উর রহমান, এবং পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক খুরশীদ আলম অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।