Published : 26 Jul 2026, 10:44 PM
মন্দ ঋণ বাড়তে থাকায় অনেক ব্যাংকে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়ে আর্থিক খাতে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে বলেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক।
এছাড়া জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগে মন্দাভাব এবং বেসরকারি খাতে ঋণের কম চাহিদাকে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে এই সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মুদ্রানীতি’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি ডিপার্টমেন্ট এসব তথ্য তুলে ধরেছে।
বৈঠকের পর উপস্থাপনার একটি কপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পেয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, কয়েক বছর ধরে মন্দ ঋণ বাড়ায় অনেক ব্যাংকে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এতে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ব্যাহত হচ্ছে।
এ কারণে ব্যাংক খাতে সৃষ্ট অস্থিরতা কমাতে ব্যাংক রেজুলেশন ও আমানত সুরক্ষা আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিশেষ এক্সিট পলিসি (এককালীন অথবা বিশেষ শর্তে ঋণ পরিশোধ করে ঋণের হিসাব একেবারেই বন্ধ করার ব্যবস্থা) বাস্তবায়ন এবং ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট (দুর্দশাগস্ত্র সম্পদ) আইন প্রণয়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
দুদর্শাগ্রস্ত ঋণ হল খেলাপি, অবলোপ ও আদালতের নিষেধাজ্ঞায় খেলাপি না দেখানো ও সম্ভ্যাব্য ক্ষতিজনিত ঋণ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ঝুঁকিপূর্ণ বা দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা।
ঝুঁকিপূর্ণ এই ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত ডিসেম্বরের পর খেলাপি ঋণের অঙ্ক বেড়ে এখন ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
২০২৫ সালেই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি, অবলোপন, পুনঃতফশিল করা ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এদিকে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রেখে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তার লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার বা রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদদী ধারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদের হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ ও আমানতের সুদহার সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, নীতি সুদহার উচ্চ পর্যায়ে রাখায় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নামেনি। চাহিদার পাশাপাশি সরবরাহের ঘাটতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা থাকায় শুধু উচ্চ সুদহার দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে কৃষি, কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করা হবে।
প্যাকেজটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন, সরবরাহ, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি পণ্যমূল্যও কিছুটা কমবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
উপস্থাপনায় জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগে মন্দাভাব এবং বেসরকারি খাতে ঋণের কম চাহিদাকে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকির কথাও তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে প্রবাসী আয়ের উচ্চপ্রবাহ বহিঃখাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইসলামী ব্যাংকিং দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ হলেও এ খাতের জন্য প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতো আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার এখনও গড়ে ওঠেনি। এ ধরনের বাজার চালুর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে এবং নিকট ভবিষ্যতে তা চালু হতে পারে বলে উপস্থাপনায় জানানো হয়।
বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য অর্জনে বিদ্যমান সুদহার লক্ষ্যভিত্তিক কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যভিত্তিক মুদ্রানীতিতে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ সংশোধন করে মুদ্রানীতি কাঠামো ও মনিটারি পলিসি কমিটিকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মুদ্রানীতি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাজস্বনীতি ও বিনিময় হার নীতির সঙ্গে সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য মো. সাইফুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নীতি সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এবং একবার নির্ধারণ করে দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত না রেখে ছয় মাস পরপর পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা প্রধানত কয়েকটা জিনিস বলেছি যে, মানে নীতি সুদের হার সুদের হার এক অঙ্ক করা উচিত, এটা আমরা বলছি। আর কি, তো এটা বাংলাদেশ ব্যাংক দেখবে, এটা সবচেয়ে বড় ব্যাপার।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের অর্থের অপব্যবহার ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের কথাও বলেন তিনি।
কম সুদে প্রণোদনার ঋণ নিয়ে অন্যত্র রেখে মুনাফা করার সুযোগ যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য সাইফুল আলম বলেছেন।
খেলাপি ঋণ আদায়ে তৃতীয় পক্ষ নিয়োগের পরিকল্পনায় সমর্থন জানালেও প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত রাখার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
সাইফুল আলম বলেন, “আমরা মানে এটার সাথে একমত, এটা আমি আগে নিজেও বলছিলাম বহুবার যে ‘বাট দিস শুড বি ভেরি ভেরি ট্রান্সপারেন্ট এবং ওপেন’, মানে আহ্বান করতে হবে এবং স্বচ্ছ থাকতে হবে। তা না হলে ওইটা আবার যদি ওইটার ব্যাপারে লোকদের সন্দেহ হয় বা তারাই করে তাহলে তো আমাদের আরো ক্ষতি হয়ে গেল।”
ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অসংগতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার কথাও বলেছেন বিরোধী দলের এই সদস্য।
“আমরা বলেছি, একটা হল ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স হওয়া দরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের ইসলামি ব্যাংকিং দেশ অসংগতি আছে, রুলসের ক্ষেত্রে পাওয়ার ফাংশনের ক্ষেত্রে সেটা বাংলাদেশ ব্যাংক যেন বিষয়টা দেখে।”
মন্দ ঋণের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নয়, ঋণ অনুমোদনকারী পরিচালকদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার পক্ষে মত দেওয়া কথা বলেছেন সাইফুল আলম।
তিনি বলেন, “যখন একটা মন্দ ঋণ হয়ে যায় তখন কিন্তু দায়ী করে নিচের ছোট ছোট অফিসারদেরকে বা আরেকটু বড় অফিসারদের, মাঝারি অফিসার, বাদ পড় যায় ডিরেক্টর সাহেব, ডিরেক্টরদের এটা যদি ট্যাগ করা হয়, লোন দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা সতর্ক।”
তবে এসব বিষয়ে কমিটির আনুষ্ঠানিক সুপারিশ হয়েছে কি না, তা কার্যবিবরণী পাওয়ার পর জানা যাবে, বলেন তিনি।
কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে অন্যদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, মো. জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, মো. শাহাদাত হোসেন, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন এবং হাসনাত আব্দুল্লাহ অংশ নেন।