Published : 29 Jun 2026, 05:21 PM
আগামী অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিল সংসদে তোলার পর জনমত যাচাই প্রস্তাব ও বিলের সাধারণ নীতির আলোচনায় অংশ নিয়ে ঘাটতি বাজেট, চীনা ঋণ বা বিনিয়োগের আশ্বাস, কর-ভ্যাট, বিনিয়োগের শর্ত, ব্যাংক খাতের দুর্নীতি এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্যরা।
সোমবার জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলীর শুরুতে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অর্থ বিল, ২০২৬ অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব তোলেন।
তিনি বলেন, “আমি প্রস্তাব করছি যে সরকারের আর্থিক প্রস্তাবাবলী কার্যকরকরণ এবং কতিপয় আইন সংশোধন করতে আনীত বিলটি অর্থ বিল, ২০২৬ সংসদে অবিলম্বে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক।”
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, বিলটির ওপর কয়েকজন সংসদ সদস্য জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব এবং বিলের সাধারণ নীতি সম্পর্কিত আলোচনা একসঙ্গে হবে বলে জানান তিনি।
আলোচনার শুরুতে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্পিকার বলেন, সময় দুই মিনিট; অনেক বক্তা থাকায় সময় বাড়ানো সম্ভব হবে না।
জামায়াতের সংসদ সদস্য শফিকুল বলেন, জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে বাজেট এখন শেষ ধাপে এসেছে। সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ সদস্যদের আলোচনার ভিত্তিতে বাজেট সামনে এগোচ্ছে বলে তিনি ধন্যবাদ জানান।
শিক্ষা খাত নিয়ে তিনি বলেন, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, কারিকুলামভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং বছরজুড়ে তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে আরও কার্যকর পরিকল্পনা দরকার।
শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিকেন্দ্রীকরণের কথাও তিনি বলেন। তার প্রস্তাব, মেগা সিটি বা বিদেশকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণের পরিবর্তে উপজেলা পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
শফিকুল বলেন, এতে শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা বাড়বে এবং জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো তৈরি হবে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি। তার মতে, মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা না হলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
‘অপচয় থেকে সাবধান থাকতে হবে’
রাজশাহী-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান অর্থ বিলের আলোচনায় অংশ নিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারে সতর্কতার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, মানুষের রিজিক হালাল হওয়া দরকার। জাতীয় জীবনেও অর্থ ব্যবহারে অপচয় এড়াতে হবে।
মুজিবুর রহমান বলেন, অর্থ বিল নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেছেন, ভালো প্রস্তাবও দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবের কিছু অংশ গ্রহণ করা হয়েছে, যা জাতীয়ভাবে উপকারে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
অপচয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “জাতীয় জীবনে টাকা-পয়সা অপচয় সব জায়গায়। অপচয় থেকে আমাদেরকে সাবধান থাকতে হবে।”
আলোচনায় অংশ নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য জি এম নজরুল ইসলাম বলেন, একটি দেশের অর্থ বিল শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি ১৮ থেকে ২০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তার মতে, সাধারণ মানুষের ওপর কিছু করের চাপ কমানোর উদ্যোগ থাকলেও সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি ও বাজারের ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়ে গেছে।
নজরুল বলেন, কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করার কিছু বিধান প্রত্যাহারের কথা শোনা গেলেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত উদ্বেগ তৈরি করছে।
সিকিউরিটিজ, ইউনিট ফান্ড ও মিউনিসিপাল ফান্ডে বিনিয়োগ ধরে রাখার নতুন শর্ত নিয়ে তিনি বলেন, এতে বিনিয়োগকারীর জরুরি অর্থ ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
জামায়াতের এই এমপির ভাষ্য, চাকরি পরিবর্তন, পারিবারিক জরুরি অবস্থা বা চিকিৎসার প্রয়োজনের মত পরিস্থিতিতে কেউ মেয়াদ পূর্তির আগে টাকা তুলতে না পারলে সাধারণ বিনিয়োগকারী বিপাকে পড়তে পারেন।
ব্যাংক খাতের সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধকে জরুরি বলে মন্তব্য করেন জি এম নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। অর্থ বিলে রাজস্ব আহরণের কৌশল থাকলেও দুর্নীতি, অর্থপাচার রোধ এবং পাচার অর্থ ফেরানোর বিষয়ে আরও কঠোর দিকনির্দেশনা দরকার।
এর আগে পাচার অর্থ ফেরানোর উদ্যোগের কথা সংসদকে বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সে প্রসঙ্গ ধরে জি এম নজরুল বলেন, বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে দেখা দরকার।
‘স্বপ্ন দেখি, ফল ভোগ করতে হয়’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বাজেটের ঘাটতি ও রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, “প্রতিবছর এই বাজেট দেওয়ার সময় আমরা নির্ঝরের মতন স্বপ্ন দেখি এবং সারা বছর ধরে সেই স্বপ্ন ভঙ্গের ফল আমাদের ভোগ করতে হয়।”
প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং আয় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে, সে হিসেবে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
সে প্রসঙ্গ ধরে রুমিন বলেন, শুধু এই ঘাটতি থাকলেও কথা ছিল, কিন্তু রাজস্ব আহরণের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, তা কোনো বছরই পুরোপুরি আদায় করা যায় না। ফলে ঘাটতি বাড়তে থাকে এবং সেই ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি ঋণ বা বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে রুমিন বলেন, “আমি আপনার মাধ্যমে জানতে চাই, চীনের কাছ থেকে আমাদের ঋণের কোনো আশ্বাস আমরা পেয়েছি কি না। পেয়ে থাকলে সেই ঋণের আশ্বাসের পরিমাণ কত, কিংবা বাংলাদেশে তারা কোনো বিনিয়োগ করবে কি না, এরকম কোনো আশ্বাস এসেছে কি না।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা কি কেবলমাত্র চাইতে গেছি ভিক্ষার ঝুলি হাতে?’
“আমরা কেউ আশা করি না যে বাংলাদেশের মন্ত্রী-মিনিস্টাররা দেশের বাইরে ভিক্ষার ঝুলি হাতে ভিক্ষা করতে যাবেন। তবে বাস্তবতার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকলেও তো হবে না।”
দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সংকটের কথা তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি, ঋণখেলাপির বৃদ্ধি, ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এর আগে অর্থ বিল, ২০২৬-এর সংশোধনী তালিকায় ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করহার কমানো, ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা পরিবর্তন, খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে অগ্রিম কর সংগ্রহ, স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যবসায় উৎসে কর এবং দ্রুত আয়কর রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনার প্রস্তাব আসে।
সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে ব্যক্তি করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা রয়েছে।
নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতার ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের আয়ের ওপর করহার ৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও সংশোধনীতে আছে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর কমানো, কয়েকটি টিআইএন বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং কিছু খাতে কর-ভ্যাট ছাড়ের প্রস্তাব অর্থমন্ত্রীর বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ করেছেন।