ডলারের দরে অস্থিরতার পেছনে ‘কয়েকটি ব্যাংকও’: এবিবি

ডলারের দর নিয়ে কয়েকটি এক্সচেঞ্জ হাউস বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে দর কষাকষি করে বিক্রি করায় দাম বাড়ছে, বলছেন এবিবি চেয়ারম্যান।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 28 July 2022, 03:23 PM
Updated : 28 July 2022, 03:23 PM

রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশে ডলারের দরে যে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে, তাতে কয়েকটি ব্যাংকেরও ‘যোগসাজশ’ দেখছেন দেশে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি’র চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন।

তিনি বলেছেন, “ডলারের দর স্থিতিশীল করতে অচল হয়ে পড়া আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজার সচল করা প্রয়োজন। আস্থার অভাবে এ বাজার অচল হয়ে পড়েছে। এতে ডলার বিনিময় হলে দর এতটা উঠত না। কয়েকটি ব্যাংক সুযোগটি নিয়ে বাজার দর স্পেকিউলেশন করছে।”

বৃহস্পতিবার ঢাকার তেজগাঁওয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের প্রধান এসব কথা বলেন।

সেলিম বলেন, ডলারের দর নিয়ে কয়েকটি এক্সচেঞ্জ হাউস বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে দর কষাকষি করে বিক্রি করায় দাম বাড়ছে।

“…বাজার অস্থির করে কিছু গোষ্ঠী ব্যবসা করছে। উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে এ রকম সবসময় হয়।”

ডলার নিয়ে এমন সংকটের মধ্যে কেউ ডলার মজুদ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “বর্তমানে ডলারের মূল্য বৃদ্ধির এ সময়টিতে কেউ অবৈধভাবে ডলার মজুদ করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আন্তঃব্যাংক লেনদেন ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারটি কাযর্কর করতে পারলে সংকট উত্তরণ সম্ভব মন্তব্য করে অভিজ্ঞ ব্যাংকার সেলিম বলেন, “আমাদের মত দেশে ডলারের বাজার একেবারে ফ্রি ফ্লোর করা সম্ভব না। কিছুটা ম্যানেজ করতে হবে।”

সংকটের মধ্যে দেশে খোলাবাজারে মঙ্গলবার ডলারের দর রেকর্ড ১১১ টাকায় ওঠে। ঊর্ধ্বগতির কারণ খুঁজতে পরদিন মানি এক্সচেঞ্জ পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। রাষ্ট্রীয় আরও কয়েকটি সংস্থার সদস্যদেরও খোঁজ-খবর নিতে দেখা গেছে। তাতে করে সেদিন ডলারের দর ১০৮ টাকায় নেমে আসে।

ডলারের এমন চড়া দামের মধ্যেও কোনো ব্যাংক ডলার ছাড়ছে না দাবি করে তিনি বলেন, “ইন্টারব্যাংক বাজারকে চালু করে দিতে হবে। তাই বাজারকে সচল করতে হবে। বাজার চালু হলে এতে কিছুদিনের জন্য ব্যাংকে বাড়তে পারে ডলারের দর। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে স্থিতিশীল হয়ে যাবে। আমি বলছি না ডলারের দর কোথায় গিয়ে স্থির হবে। কিন্তু ১০-১৫ দিন পরে স্থির হবে।“

আন্তঃব্যাংক বাজার কার্যকর না থাকায় বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ডলার আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, “অনেকগুলো আছে কিন্তু হতে গোনা কয়েকটিই বড়।

‘‘তারা দর কষাকষি করে ডলারের দাম বাড়াচ্ছে। অনেক ছোট ছোট ব্যাংকেরই বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউজ নেই। তাদের সোর্স নেই। তারা যাবে কার কাছে। তার একটি এলসি’র পেমেন্ট দিতে হবে যে করেই হোক। তাদের বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজের কাছ থেকে দাম যাই হোক তাদের কাছ থেকেই ব্যাংকগুলোকে কিনতে হচ্ছে।’’

তার ভাষ্য, ‘‘যেহেতু দেশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্লেয়ারের কাছ থেকে কিনতে পারে না। এই সুযোগে বিদেশি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো লালে লাল হয়ে গেছে। এখানে কিছু স্পেকিউলেশনের কাজ হচ্ছে বিভিন্ন প্লেয়ারের মাধ্যমে আমার বিশ্বাস।’’

গত ১৮ জুলাই ঋণ পুনঃতফসিলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিপত্র জারি করেছে, তাতে খেলাপি ঋণ কমে আসার সঙ্গে তারল্য প্রবাহ বাড়বে বলে মনে করছেন এ ব্যাংকার।

ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষমতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে যাওয়ায় পরিচালকদের সুবিধা আগের চেয়ে বেশি হবে কি না কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের শঙ্কা আছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এ সুযোগ আগেও ছিল। এখন নীতিমালা হওয়ায় ব্যাংকে সুশাসন বাড়বে। যাই করতে চাওয়া হোক না কেন... নীতিমালার আলোকে করতে হবে। যদি কেউ অনিয়ম করে তাহলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শনে ধরবে। ইতোমধ্যে গভর্নর ১০টি ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

“ঋণ পুনঃতফসিল হতে আগে যেখানে ৩/৪ মাস সময় লাগত, এখন তা হবে সর্বোচ্চ ৭ দিনে। এতে খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি ভালো হবে…সময় বাঁচবে।”

পুঁজিবাজার ‘দুর্বল’ হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য এখনও ব্যাংকই ভরসা মন্তব্য করে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম বলেন, “ব্যাংক মূলত স্বল্পমেয়াদি ঋণ দেয়। সর্বোচ্চ ২/৩ বছরের জন্য চলতি মূলধন বিতরণ করে।

“কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে৷ অথচ আমরা বন্ড মার্কেট বা পুঁজিবাজারকে আরও সম্প্রসারিত করতে পারি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক