Published : 12 Aug 2025, 09:04 PM
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে খাদের কিনার থেকে গত এক বছরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি করে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, এটাই তার সময়কালের ‘মোটা দাগের সফলতা’।
দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর উপলক্ষে মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
আগের ‘আইসিইউ’ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির স্বাভাবিক হওয়ার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এখন সবকিছু ইতিবাচক। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ, ডলারের দামে স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে অন্যান্য খাতের অবস্থা ভালো।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের মতে অর্থনৈতিক অবস্থা মোটামুটি সন্তোষজনক। আর্থিক খাতের বিশাল বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব ছিল। এমনিতেই আমাদের আর্থিক সক্ষমতা কম, তার মধ্যে এগুলো। সেজন্য আমি খাদের কিনারাই বলি, আইসিইউতে ছিল বলি। সেখান থেকে আমরা একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছি।”
দায়িত্ব গ্রহণের সময়কার দেশের পরিস্থিতি বর্ণনা করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “বাংলাদেশের ব্যাংক খাত থেকে যেভাবে অর্থ লুট করা হয়েছে, পৃথিবীর কোথাও এভাবে ব্যাংক খাতের অর্থ লুট করা হয়নি। আর্থিক খাতের বিশাল বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, সুশাসনের অভাবে দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারায় বা আইসিইউতে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে আরও একটু দ্রুত এগোতে পারলে ভালো হত।
“দায়িত্ব নেওয়ার পর অগাস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তেমন কিছু করতে পারি নাই। কারণ তখনও পরিস্থিতি অনেক টালমাটাল ছিল। এখন সবকিছু পজিটিভি। ফরেন এক্সচেঞ্জ রিজার্ভ, ডলারের দামে স্থিতিশীলতা, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক ঋণ থেকে শুরু করে অন্যান্য খাত।”
সংবাদ সম্মেলনে অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত বিশেষ সহকারী আনিসুজ্জামান চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থনীতিতে দুর্দশা তৈরির পেছনে ব্যাংক খাতের লুটপাটের কথা তুলে ধরে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আমি জানতে চাইলাম। এমডি আমার ছাত্র। সে বলছে- স্যার ৯৫ শতাংশই খেলাপি। কে নিয়েছে টাকা? চেয়ারম্যান সাহেব আর তার লোকজন। চিন্তা করতে পারেন। পৃথিবীর কোনো দেশে ব্যাংকের টাকা এভাবে নিয়ে যাওয়া হয়নি। সেটা আপনার-আমার টাকা কিন্তু।”
পুঁজিবাজার সম্পর্কে তিনি বলেন, “পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নাই যেখানে আপনি ফ্লোর প্রাইস দিয়ে দিলেন। ইচ্ছেমত সুকুক বন্ডের টাকা নিয়ে চলে গেলেন। আইএফআইসি আমার বন্ড। এখনতো ওই বন্ড যন্ত্রণায় ধুঁকছে। উনারই বন্ড, উনি টাকা নিয়ে চলে গেছেন। পুঁজিবাজারে এখন কিছু আস্থা চলে আসছে।”
এখন অবস্থা বদলানোর দাবি করে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমরা একেবারে খারাপ অবস্থায় নাই। মূল্যস্ফীতি কমে ৮ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। খারাপ খারাপ বললে তো খারাপই হয়ে যাব। প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না, কর্মংস্থান হচ্ছে না, কিছুই হচ্ছে না, এভাবে বললে তো হবে না। প্রবৃদ্ধি (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) তো ঋণাত্মক না। আনুমানিক একটা তথ্য প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশ, আমরা আশা করছি বছর শেষে ৫ থেকে ৫.৭ শতাংশ হবে।”
তিনি বলেন, “হয় তো আপনারা যেভাবে প্রত্যাশা করেন, সেভাবে হয়নি। তবে অনেক কিছুই হয়েছে। আর একটু দ্রুত গতিতে হলে হয় তো ভালো হত। আমরা আশা করছি সামনে অর্থনীতি আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে।”
কয়টি ব্যাংক মার্জ করা হবে এবং কবে নাগাদ করা হবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এটা নিয়ে বাংলাদেশ কাজ করছে। কয়টা ব্যাংক হবে, তা আমি বলতে চাই না। তবে হবে।”
এডিপি ছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়
অন্তর্বর্তী সরকারের এ সময়ে গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম হারে এডিপি বাস্তবায়ন হওয়ার খবর এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৬৮ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়। এত কম বাস্তবায়ন হার নিয়ে সমালোচনা করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “অনেকগুলো নেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়। আজকে দেখলাম একটা প্রকল্পের অগ্রগতি ৩/৪ শতাংশ। কয়েকশ কোটি টাকার প্রকল্প। চাহিদার ভিত্তিতে করা হয়নি। সেই প্রকল্পগুলো আমরা বাদ দিয়ে দিয়েছি। যেগুলো অনেক দূর এগিয়ে গেছে সেগুলো আমরা বাদ দিচ্ছি না। এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা একটু বাস্তববাদী।”
সরকার অনেক সংস্কার করলেও সবগুলো দৃশ্যমান নয় বলেও তুলে ধরেন তিনি। তবে সংস্কারের মাধ্যমে মানুষ উপকার পাচ্ছে বলে দাবি তার।
“অনেক সংস্কার হয়েছে ভেতরে ভেতরে। বিশেষ করে সঞ্চয়পত্রের ব্যাপারে। প্রতিবছর লাইসেন্স রিনিউ করার বিষয়টা এখন আর লাগছে না। এগুলো ছোটখাটো হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য খুব উপকারী। বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমেছে। এতকিছুর পরও ৪ বিলিয়ন ডলারের মত বকেয়া পরিশোধ করেছি। এর বেশিরভাগই আগের সরকারের সময়কার।”
ত্রিমুখী সমস্যা
কাজ শুরু করতে গিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে ত্রিমুখী সমস্যার মুখোমুখী হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সালেহউদ্দিন বলেন, “প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের পথে। অনেক প্রতিষ্ঠানের কাঠামো আছে। কিন্তু সেগুলোর পরিচালন নেই। প্রতিষ্ঠানের মানুষগুলোতো আর বদলে যায়নি। তারা সব আগের মতই আছে। কয়েকজনকে হয়ত বদলি করেছি।”
দেশ নিয়ে নিজের আকাঙ্খার কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে একটা কল্যাণমুখী ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চাই। সেটা হয়তো পুরোপুরি করা সম্ভব হবে না। আমরা কিছু সংস্কার করে যাব, কিছু সংস্কার নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে যাবে। আমাদের ভালো কাজগুলো যেন বাদ দিয়ে দেওয়া না হয়।”