Published : 09 Jan 2026, 04:26 PM
অন্তর্বর্তী সরকার যে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে ‘নতুন উদ্ভাবন ও দৃষ্টান্ত স্থাপন’ করবে বলে মনে করছে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয় এ নেটওয়ার্ক এও বলেছে, “ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংকের আইন পাস হলে এটা হবে একটি দৃষ্টান্তমূলক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোর ভিত্তি আরও সুদৃড় হবে।
“প্রস্তাবিত ব্যাংকের আওতায় সেসব কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হবে তা হলো ডিপোজিট সবার কাছ থেকে নেয়া যাবে, এতে ঋণের মূলধনের চড়া সুদে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার দরকার হবে না।
“তাছাড়া ঋণ কার্যক্রম, ইনসুরেন্স সার্ভিস, রেমিটেন্স, দেশি বিদেশী অনুদান ও ঋণ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও কুটির শিল্প, কৃষি খাতে ঋণের পরিধি বাড়ানো সম্ভব হবে।”
এর আগে গত রোববার দেশের এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ১৭ শীর্ষ নির্বাহী এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, সরকারের প্রস্তাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ’ দেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতের বাস্তবতা ও দীর্ঘদিনের অর্জনের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’। প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ কার্যকর হলে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নে ক্ষুদ্রঋণ খাতের ইতিবাচক ভূমিকা গুরুতরভাবে ব্যাহত হতে পারে।
তারা বলেছিলেন, সরকার ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, এটা ‘নীতিগতভাবে ইতিবাচক’। তবে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের খসড়া পর্যালোচনায় দেখা যায়, এতে ক্ষুদ্রঋণ খাতের কাঠামো, দর্শন ও লক্ষ্য ‘যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি’।
সিডিএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদ হোসেনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ধারণা থেকে অনেক উন্নত ধারণা ও ব্যতিক্রমধর্মী পদক্ষেপ হচ্ছে প্রস্তাবিত এই ব্যাংক। কারণ এ ব্যাংকে মালিকানা থাকছে ৬০ শতাংশ গরিব সদস্য এবং বাকি ৪০ শতাংশ হবে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি।
“যেহেতু বিনিয়োগকৃত মূলধনের অতিরিক্ত মুনাফা বা ডিভিডেন্ট নেয়ার সুযোগ নেই, তাই কোন ব্যক্তি মুনাফা লাভের আশায় এ ধরনের বিনিয়োগ করতে আসবে না। তাই ৪০ শতাংশ মূলত: বিভিন্ন এনজিও উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে বিনিয়োগ আসবে। তাই যেটুকু মুনাফা হবে তা আবার সদস্যদেরই ঘুরে ফিরে উপকার করবে।”
সিডিএফ বলছে, “সামাজিক ব্যবসার মূল ধারণা হলো সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিনিয়োগ করা, যেখানে ব্যক্তিগত লাভ বা অতিরিক্ত মুনাফা প্রত্যাশা করা হয় না। ফলে ক্ষুদ্রঋণ খাতে অনৈতিক মুনাফা, অতিরিক্ত সুদ বা সুশাসনের সংকট তৈরি হবে; এমন আশঙ্কা ভিত্তিহীন।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ‘ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ২০২৫’–এর যে খসড়া প্রণয়ন করেছে, সেখানে বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য দূরীকরণে সামাজিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এ ব্যাংক। তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারবে না, অর্থাৎ, এসব ব্যাংকের শেয়ার পুঁজিবাজারে কেনাবেচার যোগ্য হবে না।
এখনকার ক্ষুদ্রঋণদানকারী বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলো সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় হিসেবে আমানত নিতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাংকের মত আমানত সংগ্রহ করতে পারে না। ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানতও সংগ্রহ করতে পারবে।
ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ কার্যকর হলে সব এনজিওকে ব্যাংকে রূপান্তর করা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে মনে করছে সিডিএফ।
“কোনো এনজিও চাইলে সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান বা আংশিকভাবে কিছু শাখা ব্যাংকে রূপান্তর করতে পারবে। তবে রূপান্তরিত অংশ সম্পূর্ণ আলাদা কাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে। এনজিও অংশটি আগের মতোই এনজিও হিসেবে চলবে এবং তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। অন্যদিকে ব্যাংক অংশটি নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
“সুতরাং এটা স্পষ্ট যে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রব্যাংক পরিচালিত হবে না।”
দেশে এখন ক্ষুদ্র ঋণদাতা এনজিওর সংখ্যা ৬৮৩। এসব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া সদস্যের সংখ্যা সোয়া ৩ কোটির বেশি, যাদের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ নারী।
ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ পেয়েছেন সদস্যরা। তাদের সঞ্চয় স্থিতি আছে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা। আর ঋণস্থিতি ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ‘খাতবান্ধব নয়’: এনজিও খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের উদ্বেগ