Published : 01 Dec 2025, 07:09 PM
আগে ‘সুবিধাজনক পদ’ হিসেবে উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক হতে কর্মকর্তারা তদবির করলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ দায়িত্বে কেউ আসতে চাচ্ছেন না বলে তুলে ধরেছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
একই সঙ্গে উন্নয়ন কাজের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের আগ্রহও কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বলেও সোমবার একনেক সভার শেষে মন্তব্য করেন তিনি।
চলতি অর্থবছরের প্রায় মাঝামাঝি এসেও সরকারের নানা তাগাদার পরও এডিপি বাস্তবায়ন ‘গতিশীল’ করতে না পারার হতাশা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, “এটার পেছনে আগের সে সমস্যাগুলো তো রয়েই গেছে। প্রকল্পগুলোর যেই... কি বলে এদেরকে... প্রকল্প পরিচালকদের সমস্যা রয়েই গেছে।
“মুশকিল হল যে এখন কেউ প্রকল্প পরিচালক হতে চাচ্ছেন না। আর ঠিকাদাররাও এখন বেশি উৎসাহী হচ্ছে না।”
এদিন শেরে বাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হয়।
পরে পরিকল্পনা কমিশন চত্বরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে আসেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
ঠিকাদারদের অনাগ্রহের মূলে সরকারি ক্রয় নীতিমালার পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছেন তিনি। বলেন, “কারণ নতুন সরকারি ক্রয় নীতিমালা হয়েছে। সেটা অনেক স্বচ্ছ এবং সেখানে এতদিন ধরে যারা একচেটিয়াভাবে এসব ঠিকাদারি করে আসছিল, বড় বড়। পুরো দেশের যে মহাসড়ক, রেলওয়ে... এগুলোতো তিন-চারটা প্রতিষ্ঠান কব্জা করে রেখেছিল। এমনভাবে মূল্যায়নটা করা হত যাতে করে যারা আগে করেছে তারাই পেত।
“এটাতে (সরকারি ক্রয় নীতি ২০০৫) খুব বড় ধরনের একটা সংস্কার হয়েছে। এবং এখানে একচেটিয়া কেউ নিতে পারবে না। বেনামে কেউ নিতে পারবে না। একজনে নিয়ে... প্রভাবশালী একজন নিয়ে- আসলে নিজে কাজ না করে অন্যকে দেওয়া, সেটার সুযোগ নাই। যাদেরকে দেওয়া হবে তাদের পূর্ণ তথ্য থাকতে হবে। তাদের ব্যবসা বাণিজ্য, তাদের কর পরিশোধ সবকিছু উন্মুক্ত থাকতে হবে। তাদের সাথে সম্পর্কিত অন্য ব্যবসা থাকলে সেগুলোরও সব তথ্য দিতে হবে। কাজেই সহজে কেউ তো এগিয়ে আসবে না।”
উপদেষ্টার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল- কত শতাংশ উন্নয়ন প্রকল্পে এখন পরিচালক পাওয়া যাচ্ছে না।
এর জবাবে তিনি বলেন, “আমার কাছে সংখ্যা নেই। সংখ্যা বাহির করার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তো... কিন্তু এটুকু জানি যে অস্থায়ীভাবে কাউকে রাখা হয়েছে। শুধু প্রজেক্ট ডিরেক্টর কেন? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বা সব মন্ত্রণালয়ে যেমন অধিদপ্তরগুলোতে, বহু অধিদপ্তর আছে বেশ কয়েক মাস ধরে যেখানে অস্থায়ীভাবে…, প্রতিষ্ঠানপ্রধানই নেই।
“অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে, যাদের কারণে গতিশীল হচ্ছে না। এগুলো তো প্রশাসনের প্রশাসনিক সমস্যা যেটা নিয়ে আমরা প্রথম থেকেই যুদ্ধ করে যাচ্ছি। প্রশাসন সমস্যা, সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের জন্য হয়েছে। কাকে রেখে কাকে পদোন্নতি দেওয়া হবে? কে কোন দিকের? কে স্বৈরশাসনের দোসর? কে বঞ্চিত হয়েছে? কার যোগ্যতা বেশি? কে দুর্নীতি করে? কে করে না? এগুলোর এত তথ্য আমাদের কাছে কি করে আসবে?”
চলতি অর্থবছরে জুলাই থেকে অক্টোবরে এডিপির অর্থ ব্যয় হয় বরাদ্দের ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।
এর আগের তিন অর্থবছরে প্রথম চার মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ১১ দশমিক ৫৪ (২০২৩-২৪), ১২ দশমিক ৬৪ (২০২২-২৩) ও ১৩ দশমিক ০৬ শতাংশ (২০২১-২২)।
এখনকার সংস্কার ‘হজম করা কঠিন হতে পারে’
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ‘উচ্চাভিলাসী’ অনেক সংস্কার করে ফেলেছে দাবি করে পরিকল্পনা বলেন, “যেগুলা নির্বাচিত সরকারের পক্ষে হজম করা বা সহ্য করা একটু কঠিন হতে পারে।”
তার ভাষ্য, “বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক সরকার বিটিভিকে বিবিসির মতো চালাতে দেবে ‘সেটা সন্দেহজনক’। হয়তো দেবে, আমি জানি না। কিন্তু আমরাতো এরকম অনেক অধ্যাদেশ রেখে যাচ্ছি। বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার একটা অধ্যাদেশ হলো না? গত কিছুদিন আগেই তো হল। সেটাতে আমার পরিকল্পনা এবং অর্থ মন্ত্রণালয় দুটোই যুক্ত ছিল।
“কারণ তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, পরিকল্পনা কমিশন থেকে কতদূর বাইপাস করতে পারবে, বেশি স্বাধীনতা আমরা দিয়ে দিয়েছি কিনা, সেগুলো আমাদের দেখতে হয়েছে। এবং যদি ভালো করে দেখা হয় তাহলে মনে করা হবে তাদেরকে হয়তো বেশি স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া হয়েছে কিনা। এগুলো নতুন সরকার এসে নিশ্চয়ই আবার দেখবে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘অস্বস্তিকর’ও মনে হতে পারে।”
এমন বহু অধ্যাদেশ জারি হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসে পাস না করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার নিজের ধারণা যে অন্তর্বর্তী সরকার ‘অনেক বেশি’ সংস্কার করে ফেলেছে এবং ‘বেশি উচ্চাভিলাসী’ সংস্কার অনেকখানি করে ফেলেছি, যেগুলা নির্বাচিত সরকারের পক্ষে হজম করা বা সহ্য করা একটু কঠিন হতে পারে।
“কিন্তু আশা করব যে পুরোটা না হলেও এর অন্তত বেশিরভাগই, অন্তত এর নির্যাসটা, যেটা অন্তর্নিহিত যেই জিনিসগুলো, সেগুলো গ্রহণ করবে। কারণ নির্বাচিত সংসদই, তারাই তো সবচেয়ে জনগণের চাহিদার সাথে মিল রাখতে পারবে।”

যেসব প্রকল্পের অনুমোদন
এদিন অন্তর্বর্তী সরকারের সপ্তদশ একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও আহতদের জন্য দুটি প্রকল্পসহ ১৭টি প্রকল্প পাস করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৩৮৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
এর মধ্যে রয়েছে- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ‘কর্মক্ষমতা হারানো জুলাই যোদ্ধা’ পরিবারের স্থায়ী বাসস্থান প্রদানের জন্য ঢাকার মিরপুর ৯ নং সেকশনে ১ হাজার ৫৬০টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
এছাড়া ওই আন্দোলনে নিহত পরিবারের স্থায়ী বাসস্থান প্রদানে ’৩৬ জুলাই’ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ; যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৬১ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
এ প্রকল্পের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ ধরা হয়েছে এমন সংবাদ প্রচারের পর জুলাই মাসের একনেক থেকে ফেরত পাঠানো হয়।
তবে এবার কোনো কাটছাঁট ছাড়াই আবার একনেকে পাস হওয়া প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, “এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে দুইটা পত্রিকার নিউজ এসেছিল এবং আমাদের উপদেষ্টা মহোদয়ের কেউ কেউ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল বলে আমরা এটাকে আবার যাচাই-বাছাই করার জন্য দিয়েছিলাম।
“কিন্তু তারা তাদের সরকারি যেসব রেট আছে, ফিক্সড আছে, সেই রেটগুলার সাথে মিলিয়ে দেখেছে যে এটা ‘আসলে ঠিক আছে’, ‘ভুল নাই’।”
এ দুই প্রকল্পই বাস্তবায়ন করবে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ।
এছাড়া অনুমোদিত অন্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে-
• কৃষি মন্ত্রণালয়ের ২৫৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয়ের “চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন” প্রকল্প;
• একই মন্ত্রণালয়ের ৪১১ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে “মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণ জোরদারকরণ (২য় সংশোধিত)” প্রকল্প। এর ব্যয় ছিল ৬৮৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। পরে সংশোধনে বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৭২৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এখন বাড়িয়ে করা হল ১ হাজার ১৩৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা;
• বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের “৩টি অনুসন্ধান কূপ (শ্রীকাইল ডিপ-১, মোবারকপুর ডিপ-১ ও ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১) খনন প্রকল্প;
• একই মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ৮৮৮ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের “সোনাগাজী ২২০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ” প্রকল্প;
• গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ের “বাংলাদেশ সচিবালয়, পরিবহনপুল, মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট ও সচিব নিবাসের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিদ্যমান বৈদ্যুতিক- যান্ত্রিক ও অগ্নিসরঞ্জামাদির আধুনিকায়ন” প্রকল্প;
• সেতু মন্ত্রণালয়ের ৭৫৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয় কমিয়ে “ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প (লাইন-৬) (৩য় সংশোধিত)” প্রকল্প। এ প্রকল্পের মূলে খরচ ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনে একই খরচ রেখে মেয়াদ বৃদ্ধির পর দ্বিতীয় সংশোধনে এসে খরচ বাড়িয়ে করা হয় ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। যা এবার কমিয়ে করা হল ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা।
• একই মন্ত্রণালয়ের ২৮৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা ব্যয়ের “সিরাজগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন সিরাজগঞ্জ-রায়গঞ্জ (চান্দাইকোনা) (জেড-৫০৪২) জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ” প্রকল্প;
• স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ৬৯৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে “নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভলপমেন্ট” প্রকল্প;
• সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৫০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে “অটিজম ও এনডিডি সেবাদান কেন্দ্র (২য় সংশোধন)” প্রকল্প । এর মূল প্রকল্পে খরচ ধরা হয়েছিল ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এবার তা বাড়িয়ে করা হল ১০৪ কোটি ১০ লাখ টাকা।
• অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ের “জাপান হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভলপমেন্ট স্কলারশিপ” প্রকল্প (২য় পর্যায়);
• তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ১৭৮ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে “ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন (১ম সংশোধন)” প্রকল্প । মূল প্রকল্প ছিল ৩৫৩ কোটি ৬ লাখ টাকার; এবার বাড়িয়ে করা হল ৫৩১ কোটি ১৮ লাখ টাকা;
• শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩৩৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ের “নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় একাডেমিক ও কেন্দ্রীয় গবেষণাগার (১০তলা ভিতে ১০ তলা) ও অন্যান্য ভবন নির্মাণ কাজ সমাপ্তকরণ” প্রকল্প;
• স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৪ হাজার ৬২ কোটি ৭ লাখ টাকা ব্যয়ের “ক্লাইমেট রেস্পন্সিভ রিপ্রোডাক্টিভ হেল্থ অ্যান্ড পপুলেশন সার্ভিসেস ইম্প্রুভমেন্ট অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেন্দেনিং প্রকল্প ফর রেজাল্ট”;
• একই মন্ত্রণালয়ের ৩৮৫ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে “এস্টাবলিশমেন্ট অব এসেনশিয়াল বায়োটেক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার মুন্সিগঞ্জ” প্রকল্প। মূল প্রকল্প ছিল ৩ হাজার ১৫ কোটি টাকার; এবার করা হল ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
• একই মন্ত্রলায়ের ২ হাজার ৯৮৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ের “স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট-সংস্থাসমূহের অত্যাবশ্যকীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন” প্রকল্প।