অর্ধ কোটি টাকা মেরে পালিয়ে থেকেও যেভাবে ধরা

চট্টগ্রাম থেকে সপরিবারে পালিয়ে রাজশাহীতে গিয়ে উঠেছিলেন এই ব্যক্তি,ধরা পড়েন ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 23 Jan 2023, 02:58 PM
Updated : 23 Jan 2023, 02:58 PM

সিগারেট বিক্রির নামে অগ্রিম অর্ধ কোটি টাকা হাতিয়ে পরিবার নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে বসতি গেঁড়েছিলেন রাজশাহীতে। বিচ্ছিন্ন করেছিলেন সব ধরনের যোগাযোগ। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, বাইক কেনার পর ট্রাফিক আইনে হওয়া মামলার সূত্রে ধরা পড়েছেন সেই বিক্রয় প্রতিনিধি।

মাস তিনেক আগে সিগারেট বিক্রির কথা বলে ৫৪ লাখ টাকা হাতিয়ে পালিয়ে যাওয়া এই ব্যক্তিকে রোববার রাজশাহী থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পিবিআই।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক ইখতিয়ার উদ্দিন জানিয়েছেন, সোমবার বিকালে হাসিব শেখ চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মেহনাজ রহমানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন।

হাসিবের (২৭) প্রতারণায় সহযোগিতার অভিযোগে পুলিশ তার বাবা হেদায়েত শেখ ও মা নুরজাহান বেগমকেও গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার নাঈমা সুলতানা জানিয়েছেন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর চট্টগ্রামের পরিবেশক এমএস জাওয়াদ এন্টারপ্রাইজের বিক্রয় প্রতিনিধিদের সুপারভাইজার ছিলেন হাসিব।

“বিশেষ অফারে সিগারেট বিক্রি করার কথা বলে এক দোকানদারের কাছ থেকে নগদে ও ব্যাংকের মাধ্যমে ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়ে গত বছরের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে রাজশাহী চলে যায় সে।”

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের ইপিজেড থানায় হওয়া মামলার তদন্তভার পেয়ে পিবিআই কাজ শুরু করে। মোটর সাইকেলের জন্য ট্রাফিক আইনের মামলার সূত্র ধরে রোববার রাজশাহী মহানগরীর চন্দ্রিমা থানা এলাকা থেকে হাসিবকে তার বাবা-মাসহ গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান পুলিশ সুপার নাঈমা সুলতানা।

এ সময় তার কাছ থেকে আত্মসাৎ করা ৩৭ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয় বলে জানান তিনি।

পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো প্রধান নাঈমা সুলতানা বলেন, “হাসিব শেখ চট্টগ্রামের একটি কলেজের ভূগোল বিভাগের স্মাতক সম্মান শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। পাশাপাশি বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন।

“তার এক সহকর্মী একবার টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ধরা না পরায় সেও আত্মসাতের বিষয়ে সাহস করে। পাশাপাশি ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে আত্মসাৎ ও আত্মগোপনে থাকাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ধারণা সংগ্রহ করে বলে জানিয়েছে।”

পুলিশ সুপার নাঈমা জানান, হাসিব যে দোকানদারের টাকা আত্মসাৎ করেছিল, তাকে একসাথে সব টাকা পরিশোধের জন্য বলেছিলেন। যার কারণে ওই দোকানি তাকে নগদে এবং দুইটি ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে। ব্যাংক থেকে চেকের টাকা হাসিব নিজে না করে তার অধীনে থাকা অপর দুই বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে উত্তোলন করে।

গতবছরের ১০ অক্টোবর টাকাগুলো একসাথে সংগ্রহ করেই হাসিব তার বাবা-মাকে নিয়ে চট্টগ্রামের বাসায় সকল মালামাল রেখে, একটি ব্যাগে করে টাকা নিয়ে বাবা-মাসহ সরাসরি রাজশাহী চলে যান বলে জানান পিবিআই কর্মকর্তা নাঈমা।

এসপি নাঈমা জানান জানান, হাসিব চট্টগ্রাম ছেড়ে ধরা পড়ার ভয়ে নিজের বাড়ি পিরোজপুরে যাননি। এমনকি চট্টগ্রামে থাকা তার দুই বোনের সাথেও কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখেননি তিনি ও তার বাবা-মা। রাজশাহীতে গিয়ে তিন মাসে তারা তিনবার বাসা বদল করেন।

“সিগারেটের বিক্রয় প্রতিনিধির কাজ করার আগে হাসিব একেটি মোবাইল কোম্পানিতেও চাকরি করেছিলেন। যার কারণে মোবাইল ট্র্যাকিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার ধারণা ছিল। সে তার মোবাইল বন্ধ করে ফেলে এবং আত্মীয়-স্বজনদের সাথেও যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এজন্য তার অবস্থান শনাক্ত করাটা দুরূহ হয়ে পড়েছিল।”

গত ২৮ ডিসেম্বর মামলাটি পিবিআই অধিগ্রহণ করে এবং অনুসন্ধান চালিয়ে হাসিবের অবস্থান শনাক্ত করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পরিদর্শক ইখতিয়ার উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা জেনেছিলাম মোটর সাইকেল চালানো তার শখ। সে ধারণা থেকে আমাদের মনে হয়েছিল আত্মসাৎ করা টাকায় হাসিব মোটর সাইকেল কিনতে পারে। সেজন্য আমরা বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে ট্রাফিক আইনে মামলায় নজরে রাখছিলাম।“

পরিদর্শক ইখতিয়ার বলেন, “গত ২০ জানুয়ারি অনলাইনে দেখতে পাই, রাজশাহী মহানগরীতে হাসিব নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইনে একটি মামলা হয়েছে। সেটা ধরে আমরা রাজশাহী গিয়ে ‘কেইস স্লিপে’ একটি মোবাইল নম্বর পাই। সেই মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে হাসিবের সন্ধান পাওয়া যায়।”

পিবিআই জানায়, আত্মসাৎ করা টাকায় হাসিব রাজশাহীতে তার ঘরের জন্য কিছু ফার্নিচার, নিজের জন্য একটি মোটর সাইকেল এবং ভাড়ায় চালানোর জন্য দুইটি টমটম কিনেছিল।

দোকান মালিক মাসুদ রানা জানান, সিগারেট কোম্পানিগুলো বিভিন্ন সময়ে কিছু বিশেষ অফার দেয়। ওই অফারে কম দামে তারা সিগারেট বিক্রি করে। দীর্ঘদিন ধরে হাসিব দোকানে সিগারেট দেওয়ায় তার সাথে সু-সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

গত বছরের এপ্রিল মাসেও তিনি ‘বিশেষ অফারে’ ৩৬ লাখ টাকার সিগারেট কিনেছিল জানিয়ে মাসুদ রানা বলেন, “ওই কারণে গত ৯ অক্টোবর হাসিব দোকানে আসায় তাকে বিশেষ অফার থাকলে তাকে জানাতে বলি। ওই দিন রাতেই সে (হাসিব) ফোন করে বিশেষ অফারের কথা জানায়। এ জন্য কিছু টাকা নগদে পরিশোধ করার কথা বলে।”

মাসুদ রানা জানান, হাসিবের কথা শুনে তিনি মোট ৫৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকার ডারবি, বেনসন, গোল্ডলিফ ও গোল্ডলিফ সুইস সিগারেট অর্ডার করেছিলেন। পরদিন সকালে আরও দুই বিক্রয় প্রতিনিধিসহ হাসিব দোকানে এসে নগদ ২০ লাখ এবং পূবালী ব্যাংকের ১০ লাখ এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকার দুইটি চেক নিয়ে যায়।

টাকা নেওয়ার পরে হাসিবের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করেন মাসুদ রানা। সেখানে কোনো টাকা পরিশোধ না হওয়ার কথা জানতে পেরে গত ১৭ অক্টোবর হাসিবের বিরুদ্ধে ইপিজেড থানায় মামলা করেন মাসুদ রানা।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক