জঙ্গল সলিমপুরে টানা অভিযান, বাসিন্দাদের বিক্ষোভ

কম টাকায় ‘জমি কিনে’ সেখানে বসতি স্থাপন করেছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ।

চট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 August 2022, 06:57 PM
Updated : 3 August 2022, 06:57 PM

চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা জানিয়ে এলাকাটি দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। তার প্রতিবাদ করছে সেখানকার বাসিন্দারা।

মঙ্গলবার সেখানে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পরদিন বুধবার সংলগ্ন বায়েজিদ লিংক রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ করে সেখানকার বাসিন্দারা।

এরপর বায়েজিদ লিংক রোডের ছিন্নমূল বসতি সংলগ্ন অংশে সড়ক অবরোধ করা হয় ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ ব্যানারে।

প্রায় এক ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় বিক্ষোভকারীরা উঠে গেলেও সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়।

বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মো. কামরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছিন্নমূলের সামনের সড়কে বিকালে সেখানকার বাসিন্দারা সড়ক অবরোধ করেছিল বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়ার দাবিতে। ৪৫ মিনিট পর বুঝিয়ে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক আছে।”

জানতে চাইলে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জঙ্গল সলিমপুরের আলী নগর অংশে যেসব সংযোগ অবৈধ সেগুলোই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে গত মাসে। অবৈধ সংযোগ তো রাখা যায় না।”

মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সেখানে অভিযান চালিয়ে ১৭০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে। সেদিনও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের সময় স্থানীয়রা বাধা দেয়। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখে।

গত ১ জুলাই জঙ্গল সলিমপুরে পরিদর্শনে গিয়ে সেখানে থাকা খাস জমিতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার, স্পোর্টস ভিলেজ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, আইকনিক মসজিদ, ইকো পার্কসহ বিভিন্ন স্থাপনা করার পরিকল্পনার কথা জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান।

সেদিন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, জঙ্গল সলিমপুরে বসতি স্থাপনকারী ১৫ হাজার পরিবারকে সেখানেই পুনর্বাসন করে সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।

ওই এলাকায় মোট ৩১০০ একর জমির মধ্যে ৮৮ একর অবৈধ দখলদারদের হাতে থাকার কথা সেদিন জানিয়েছিলেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

স্থানীয়দের দাবি, কম টাকায় ‘জমি কিনে’ সেখানে বসতি স্থাপন করেছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষ।

প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক সমীক্ষার অংশ হিসেবে ১৫ জুলাই বিকালে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক বদিউল আলমের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পরিদর্শনে যায়। তাদের গাড়ি বহরের শেষের দিকে থাকা ইউপি সদস্য মো. আরিফকে আটকে মারধর করে স্থানীয়রা।

ওই ঘটনায় ইউপি সদস্য আরিফ বাদী হয়ে মামলা করলে ১৮ জুলাই মো. ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ।

ইয়াসিন (৫০) সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর আলী নগর এলাকায় একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন এবং সেখানে চাঁদাবাজি, পাহাড় দখলসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের ভাষ্য।

এরপর ২২ জুলাই সলিমপুরে অভিযান চালায় প্রশাসন। সেদিন পাহাড় কাটার কাজে ২টি স্কেভেটর, ৭টি ড্রাম ট্রাকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। অভিযানে গিয়ে পাহাড় কেটে প্লট বানিয়ে বিক্রির প্রমাণ পায় অভিযান দল।

সেদিন পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর বাদি হয়ে দুটি মামলা করে।

২৪ জুলাই ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জান চৌধুরী জাবেদ জঙ্গল সলিমপুরে পরিদর্শনে গিয়ে জানান, সেখানে বসবাসকারী সকল প্রকৃত ভূমিহীনদের পুনর্বাসন করা হবে।

তিনি নির্দেশ দেন, জঙ্গল সলিমপুরের আলী নগরের শেষ প্রান্তের মসজিদ পর্যন্ত বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ রেখে অবৈধ সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করতে।

এরপর থেকে প্রশাসন অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করা শুরু করে।

সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশরাফুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশনার পরে অবৈধ সংযোগ চিহ্নিত করে বিচ্ছিন্ন করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এখন পর্যন্ত শতাধিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।”

সবশেষ মঙ্গলবার উচ্ছেদের সময় স্থানীয়দের বাধায় আহত এক শ্রমিক বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। সেদিন বিভিন্ন প্রস্তাবিত সরকারি স্থাপনার সাইনবোর্ডও স্থাপন করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সীতাকুণ্ডের ইউএনও মো. শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মঙ্গলবার ১৭০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় ৭০০ একর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে।

“সেখানে শুধু পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ হয়েছে এমন নয়। পুরো ১৫০-২০০ ফুট উচ্চতার পাহাড়ই কেটে ফেলা হয়েছে। সামনে টিন বা দেয়াল দিয়ে ঘিরে ভিতরে পাহাড় কাটা হয়। দখলে রাখার জন্য নির্মিত সেসব স্থাপনা বেশিরভাগই খালি পড়ে ছিল।”

সলিমপুরের আলীনগর অংশে প্রকৃত ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ‘খুবই কম’ জানিয়ে সহকারী কমিশনার আশরাফুল আলম বলেন, “গ্রেপ্তার ইয়াসিন ও তার দলবল পাহাড় দখলে রাখতে কম ভাড়ায় লোকজনকে ওইসব স্থাপনায় এনে বসিয়েছে। এদের ৮০-৯০ শতাংশই ভাড়াটিয়া।”

জঙ্গল সলিমপুরের বেশিরভাগ এলাকাই অবৈধ দখলদাররা দখলে রেখেছে জানিয়ে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

প্রশাসনিক কাঠামোতে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতায় হলেও সেখানে যেতে হয় নগরীর বায়েজিদ থানার বাংলাবাজার এলাকা দিয়ে।

প্রায় দুই দশক ধরে সেখানে পাহাড় কেটে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তোলে ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন।

পাঁচ বছর আগে এই সমিতির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার। সমিতির নেতারা তখন জানিয়েছিলেন, সেখানে আট হাজার পরিবারে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস করতেন। এদের অধিকাংশ রিকশাচালক, ঠেলাগাড়ি চালক, দিনমজুর, হোটেল বয় ও গার্মেন্টম শ্রমিক।

২০১৭ সালের হিসাবে- ওই এলাকার ভেতরে ১২টি মসজিদ, চারটি মাদ্রাসা, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি উচ্চ বিদ্যালয়, তিনটি কেজি স্কুল, তিনটি এতিমখানা, ছয়টি কবরস্থান, পাঁচটি মন্দির, দুটি কেয়াং, একটি গির্জা, একটি শ্মশান এবং একটি কাঁচা বাজার আছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক