ওজন স্টেশনের কারণে ‘বাণিজ্য বৈষম্য’ তৈরি হয়েছে, বলছেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা

“ওজন স্কেল নির্দিষ্ট কোনো জেলায় না করে সারা দেশেই এক সাথে করা হোক; যাতে সবার এক রকমের খরচ পড়ে।”

উত্তম সেন গুপ্তচট্টগ্রাম ব্যুরোবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Jan 2024, 04:21 PM
Updated : 18 Jan 2024, 04:21 PM

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের পর এবার ওজন স্কেলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুতে।

আগের ওজন স্কেল নিয়ে পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখেই চট্টগ্রামে দ্বিতীয় ওজন স্কেলটি চালু করা হয়েছে।

কর্ণফুলী নদীর ওপরে শাহ আমানত সেতুটি চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাশাপাশি কক্সবাজার, বান্দরবান জেলার সংযোগপ্রান্ত। সেতুর দক্ষিণ প্রান্তে ইতোমধ্যে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কক্ষ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ভারি গাড়িগুলোর ওজন পরিমাপ করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সারাদেশের মহাসড়কগুলোতে ওজন স্কেল না থাকলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক দশকের বেশি সময় ধরে ‘ওজন স্কেলের’ কার্যক্রম চালু আছে। এতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মহাসড়কের মান ঠিক রাখতেই এসব ওজন স্কেল স্থাপন করা হচ্ছে। সারাদেশে মোট ২১টি পয়েন্টে ২৮টি ওজন স্কেল স্থাপন করা হচ্ছে।

অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচলের কারণে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০১২ সালের জুন মাসে ‘মোটরযানের এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালনা সংক্রান্ত নীতিমালা’ প্রণয়ন করে সরকার।

মহাসড়কে চলাচলকারী মালামালবাহী যানবাহনের দুই এক্সেল বিশিষ্ট ছয় চাকার গাড়ির ওজন সীমা ২২ টন, তিন এক্সেল বিশিষ্ট ১০ চাকার সীমা ৩০ টন, চার এক্সেল বিশিষ্ট ১৪ চাকার সীমা ৪০ টন, পাঁচ এক্সেল বিশিষ্ট ১৮ চাকার সীমা ৪৭ টন, ছয় এক্সেল বিশিষ্ট ২২ চাকার সীমা ৪৯ টন, সাত এক্সেল বিশিষ্ট ২৬ চাকার সীমা ৫২ টন।

এর বেশি ওজনের জন্য টনপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা হারে জরিমানা গুনতে হয়।

২০১৩ সালের জুনে সীতাকুণ্ড উপজেলার বড় দারোগারহাট এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের উদ্বোধন করা হয়। এর আগে একই সড়কের কুমিল্লা দাউদকান্দি এলাকায়ও এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন চালু করা হয়।

এক্সেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন দুইটি চালুর পর থেকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সম্পৃক্তরা ওজন স্কেল স্থাপন নিয়ে বিরোধিতা করে আসছিলেন।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দাউদকান্দি ও বড় দারোগাহাটে দুইটি ওজন স্কেল চালু করা হয়েছে। অথচ দেশের অন্য কোথাও মহাসড়কে তা করা হয়নি। আগে প্রতি গাড়িতে ২০ থেকে ৩০ টন পণ্য আনা-নেওয়া করা হলেও চট্টগ্রামের বড় দারোগাহাট এলাকায় ওজন স্কেল চালুর পর এখন ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না।

এতে করে চট্টগ্রামে মালামাল আনা নেওয়ায় দ্বিমুখী পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং খরচ বেশি পড়ায় চট্টগ্রামের পণ্য বাজারজাত করতে পাইকাররা আগ্রহ হারাচ্ছেন।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সারা দেশে যত মহাসড়ক আছে সবগুলোতে ওজন স্কেল বসানো দরকার। এক জেলায় বসানো হবে, আরেক জেলায় হবে না এটাতে করে আমরা বাণিজ্যিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।

“ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওজন স্কেলগুলোর আমাদের কাছে বিষ ফোঁড়া হয়ে উঠেছে। এগুলোর কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে কেজিতে চার থেকে পাঁচ টাকা করে। এগুলো নিয়ে প্রতিবাদ করতে করতে আমরা এখন ক্লান্ত।”

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে ২১টি স্থানে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

Also Read: মহাসড়কে ২১ স্থানে বসছে ‘ওজন স্কেল’

Also Read: ওজন স্কেল না সরালে ধর্মঘটের হুমকি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের

দেশের অন্যতম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতা ছগীর আহমদ বলেন, ওজন স্কেল চালু করা হলে দেশের সবস্থানে এক সাথে চালু করা হোক। এক জায়গায় চালু করে অন্য জায়গায় করা হবে না, সেটা যাতে না হয়।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মহাসড়কের মান ঠিক রাখতেই এসব এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ওজন স্কেল) স্থাপন করা হচ্ছে। সারাদেশে মোট ২৮টি এ ধরনের স্কেল নির্মাণ হচ্ছে।  

“বেশকিছু দিন ধরে শাহ আমানত সেতুর ওজন স্কেলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিছু দিন জরিমানা আদায় করা না হলেও সামনে থেকে অতিরিক্ত ওজনের জন্য জরিমানা আদায় করা হবে।”

চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেতুর এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে আছে সেতুর টোল আদায়কারী সংস্থা ‘সেল-ভ্যান জেভি’।

বৃহস্পতিবার সকালে শাহ আমানত সেতু এলাকায় সংস্থাটির অফিসে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, গত এক মাস ধরে ওজন স্কেলটি পরীক্ষামূলক ভাবে চালানো হয়েছিল। নির্বাচনের পর থেকে স্কেলের কার্যক্রম চালু করা হয়।

তারা জানান, পরীক্ষামূলক ব্যবহারের সময় অতিরিক্ত ওজনের গাড়িগুলোকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল। তবে গত কয়েকদিন ধরে অতিরিক্ত ওজনের গাড়িগুলোকে জরিমানা না করে মুচলেকা নেওয়া হচ্ছে। পরে এসব গাড়ি অতিরিক্ত ওজন বহন করলে সেগুলোর কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেল-ভ্যান জেভি’র এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টোল প্লাজার উভয়মুখী সড়কের ১ নম্বর লেইনটি মালবাহী গাড়ির জন্য বরাদ্দ রাখা আছে। সে দুইটি লেইনে আগে থেকেই ওজন স্কেল ছিল। ওই দুই লেইনে মালবাহী যানবাহনগুলোকে ৩-৫ কিলোমিটার গতি রাখার নির্দেশনা আছে।

“টোল প্লাজার দুই স্কেলে যেসব গাড়ির ওজন বেশি ধরা পড়ছে সেগুলোকে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের স্কেলে নেওয়া হচ্ছে।”

আন্তঃজেলা মালামাল পরিবহন সংস্থা ট্রাক ও কভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সুফিউর রহমান টিপু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সবসময় উৎসস্থলে লোড স্কেল বসানোর দাবি করে আসছি। বন্দর থেকে যখন মালামাল গাড়িতে তোলা হয় সেখানেই ওজন দিয়ে তোলা হলে চালকদের ভোগান্তি কমবে।

তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের প্রথম ওজন স্কেলটি স্থাপন করা হয়েছে সীতাকুণ্ডের বড় দারোগারহাট এলাকায়। সীতাকুণ্ডে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে। বন্দর থেকে বা চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে সেগুলোর মালামাল বোঝাই করে কারখানায় নেওয়া হচ্ছে। স্কেলের এলাকা পার হতে না হওয়ায় সেগুলো অতিরিক্ত ওজন বহন করছে।

“যদি অন্য স্থানে অতিরিক্ত ওজনের জন্য সড়কের ক্ষতি হয় তাহলে বন্দর থেকে সীতাকুণ্ড অংশেও তো সড়ক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বন্দর এলাকায় এবং মালামাল লোড-আনলোডের জায়গায় ওজন স্কেল স্থাপন করা হলেও কেউই আর অতিরিক্ত ওজন বহন করতে পারত না।”

চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ও ফ্লাডবেড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “পদ্মা, যমুনা, মেঘনা গোমতি সেতুতে ওজন স্কেল আছে। কিন্তু স্থল বন্দর আছে এমন জেলাগুলোতে ওজন স্কেল নেই। আবার চট্টগ্রামে আছে। এ কারণে চট্টগ্রামে মালামাল আনা নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি খরচ পড়ছে।

“আমরা দাবি করে আসছি ওজন স্কেল চালু হলেও নির্দিষ্ট েকানো জেলায় না করে সারা দেশেই এক সাথে করা হোক; যাতে সবার এক রকমের খরচ পড়ে।”