Published : 14 Oct 2023, 11:03 PM
হাজার কোটি টাকা খরচের পরও চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ ঝেড়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।
শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ ও স্থানীর সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সমন্বয় সভায় তিনি এই ক্ষোভ ঝাড়েন।
মন্ত্রী বলেন, "এত টাকা ব্যয় করার পরেও কেন জলাবদ্ধতা হবে? বিষয়টি আমাকে যন্ত্রণা দেয়। বারবার দগ্ধ করে। প্রকল্পের কাজ ঠিকভাবে না হলে কষ্ট পাই। কাজের মান গুণগত না হলে, মানুষের কল্যাণে না হলে কষ্ট পাব।”
জলাবদ্ধতা নিয়ে অতীতে বিভিন্ন সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়েও জানতে চান মন্ত্রী। তখন নগর কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তা তাকে এ বিষয়ে জানান।
সব শুনে মন্ত্রী বলেন, "জলাবদ্ধতা নিরসনে কী কাজ হয়েছে তার আউটপুট চাই। শুধু মিটিং আর রেজুলেশনের কথা শুনতে চাই না। এগুলো শুনতে শুনতে বিরক্ত।"
এরপর তিনি সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের কাছে জানতে চান, জলাবদ্ধতা নিয়ে কোনো সমীক্ষা আছে কি না।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা জানান, এ বিষয়ে ওয়াসার একটি মহাপরিকল্পনা আছে।

তখন ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, "২০১৬ সালে এই মহাপরিকল্পনা করা হয়। এটি সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প নিয়েছে সিডিএ। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হলে জলাবদ্ধতা অনেক কমে যাবে।"
সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, "মহাপরিকল্পনায় ৫৭টি খাল থাকলেও সিডিএ কাজ করছে ৩৬টি নিয়ে। বাকি ২১টি নিয়ে সিটি করপোরেশন প্রকল্প নিচ্ছে।"
মন্ত্রী বলেন, "ঢাকার দুই মেয়র নিজেরাই অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ করেছে জলাবদ্ধতা নিয়ে। অনেকগুলো খাল খনন করেছেন। এখন আর সাত আট দিন পানি জমে থাকে না। দুই তিন ঘণ্টা পর নেমে যায়।
"দুই মেয়রকে কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে দুই মেয়র কাজ করেছেন। আর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাজস্ব আদায় করে। এই টাকা কোথায় ব্যয় করে?"
‘সবাই প্রকল্পের অপেক্ষায়’
সভার বিশেষ অতিথি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, "সিটি করপোরেশন আগে খালগুলো নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণ করত। নিজস্ব অর্থ ও জনবল দিয়ে খালগুলো নিয়মিত খনন করা হত। তখন কোনো প্রকল্প নেওয়া হত না।
"এখন সবাই প্রকল্প প্রিয় হয়ে গেছে। তাদের মনোভাব এমন, প্রকল্প ছাড়া কাজ হবে না। নিজস্ব আয় দিয়ে করা যেতে পারে।"

সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, "সিটি করপোরেশনের যে রাজস্ব আয় আছে, তা থেকে ৮১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ৫৬ টা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ অনেকগুলো জনসেবার প্রকল্প পরিচালনা করছে৷ এগুলো পরিচালনার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে চাপ তৈরি হচ্ছে।
"সিটি করপোরেশনের রাজস্ব দিয়ে খাল খননের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়নি। চাক্তাই খালের তলা পাকাকরণসহ খাল খননের সব কাজ করা হয়েছে প্রকল্পের মাধ্যমে। আর শুধু রাজস্ব দিয়ে নালা–নর্দমা খননের কাজ করা হয়েছে।"
মেয়র বলেন, " ঢাকায় সব বড় বড় দালান আর সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তাই সেখানে রাজস্ব আদায়ে তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু চট্টগ্রামে ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০টি থেকে গৃহকর আদায় করা যায়। বাকিগুলোর আর্থিক অবস্থা ভালো না।’
জলাবদ্ধতা বিষয়ে তিনি বলেন, " যে সব খালে তারা দেয়াল দিয়েছে, বিশেষ করে চাক্তাই খাল, মহেশ খাল, মির্জা খাল, নোয়া খাল। এসব খালে যদি মাটি উত্তোলনই করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটা দৃশ্যমান না কেন। কোনো মাটিই উত্তোলন করা হয়নি।
"মাটি উত্তোলনই যদি করা না হয়, সিটি করপোরেশন কেনই বা সেগুলো বুঝে নেবে? আমাদের মাটি উত্তোলন করে দেন। সাইড দেয়ালের দরকার নেই। মাটির কারণেই খালগুলো দিয়ে পানি যেতে পারে না।"
‘ডেঙ্গু নিয়েও কাজ নেই’
এরপর মন্ত্রী বলেন, "এইডিস মশা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নেই। করপোরেশনের তৎপরতা কী? সিটি করপোরেশন ঠিকভাবে কাজ করছে না বলে আমার কাছে অভিযোগ রয়েছে। এখনই যদি সতর্ক না হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। শুধু মশা মেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।"

তখন সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আবুল হাশেম ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের নানা উদ্যোগ তুলে ধরেন।
উদ্যানে কোনো ধরনের দোকান বসানো যাবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, "উদ্যানে যা খুশি তাই করতে পারবেন না। কোনো কিছু করতে চাইলে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করবেন। এরপর মন্ত্রণালয় যাচাই–বাছাই করে অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।"
স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মোহাম্মদ ইবরাহিম, অতিরিক্ত সচিব মলয় চৌধুরী, মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিম এ খান, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আলি আখতার হোসেন, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আনোয়ার পাশা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খালেদ মাহমুদ ও সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামসও এ সময় উপস্থিত ছিলেন।