রাজ-পরীর শাবকেরা সাদা কেন?
ঠিক কী কারণে সাদা বাঘের জন্ম হচ্ছে তা জানতে জিনগত পরীক্ষার প্রয়োজন, বলছেন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ।
সাড়ে পাঁচ বছরে বাঘ রাজ ও বাঘিনী পরী জুটির চার দফায় জন্ম দেওয়া ১১টি সন্তানের মধ্যে ছয়টিই সাদা, যার মধ্যে একটি মারা গেছে। কিন্তু কমলা-কালো দম্পতির সাদা বাঘ জন্ম দেওয়ার কারণ কী?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিনগত কারণে এটা হতে পারে। পূর্ব পুরুষ থেকে পাওয়া জিনগত (রেসেসিভ) বৈশিষ্ট্য প্রকট হলে সাদা বাঘের জন্ম হচ্ছে; আর এই বৈশিষ্ট্য প্রচ্ছন্ন থাকলে জন্ম হচ্ছে কমলা-কালো বাঘের।
তাছাড়া বাঘের শরীরে রঞ্জক পদার্থ মেলানিন কমে গেলেও এমনটা হতে পারে। অথবা ইনব্রিডিং’য়ের (পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রজনন) কারণেও সাদা বাঘের জন্ম হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঠিক কোন কারণে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় একের পর এক পৃথিবীর অন্যতম বিরল সাদা বাঘ জন্ম নিচ্ছে তা জানতে গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজ-পরীর ঘরে ১১ বাঘ
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বেঙ্গল টাইগার প্রজাতির ১১ মাস বয়সী রাজ এবং ৯ মাস বয়সী পরীকে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় আনা হয় ২০১৬ সালের ৯ ডিসেম্বর।
চিড়িয়াখানায় পশু সরবরাহকারী ঠিকাদার কোম্পানি ফ্যালকন ট্রেডার্সের মাধ্যমে ৩৩ লাখ টাকায় বাঘ দুটি কেনা হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ার ক্যাপটিভ ব্রিডিং কোম্পানি ‘মেফুয়ানে গেইম রিসোর্ট’ থেকে।
২০১৮ সালের ১৯ জুলাই রাজ-পরীর ঘরে প্রথমবারের মত তিনটি শাবকের জন্ম হয়। তার মধ্যে দুটি ছিল সাদা এবং একটি কমলা-কালো ডোরার, নাম জয়া। সাদা দুই শাবকের মধ্যে একটি একদিন পরই মারা যায়।
আর বেঁচে থাকা সাদা শাবকটির নাম দেওয়া হয় ‘শুভ্রা’। গত সপ্তাহ পর্যন্ত সেটিই ছিল চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার একমাত্র সাদা বাঘ।
রাজ-পরী যুগলের ঘরে ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর আরও দুটি শাবকের জন্ম হয়। তার মধ্যে একটি মারা যায় পরদিন; অন্যটি কমলা-কালো বাঘিনী, মহামারীর শুরুতে জন্ম বলে নাম রাখা হয় ‘করোনা’।
এরপর ২০২০ সালে রাজ-পরীর সংসারে আরও তিন সন্তান আসে। এর মধ্যে দুটি বাঘ, একটি বাঘিনী; সবগুলোই কমলা-কালো ডোরার।
সবশেষ ৩০ জুলাই রাজ-পরী জন্ম দেয় চারটি শাবকের, যার সব গুলোই সাদা। কমলা-কালো বেঙ্গল টাইগারের মত এই সাদা বাঘগুলোও Panthera tigris tigris।
চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় জন্ম নেওয়া বাঘিনী জয়া তিনটি (দুইটি বাঘিনী ও একটি বাঘ) এবং শুভ্রা একটি বাঘিনীর জন্ম দিয়েছে। তাদের ক্ষেত্রেও প্রজনন সঙ্গী ছিল রাজ। চারটি শাবকই হয়েছে কমলা-কালো।
সব মিলিয়ে চিড়িয়াখানায় চারটি বাঘ ও আটটি বাঘিনী আছে এখন। নতুন জন্ম নেওয়া চারটি সাদা বাঘের লিঙ্গ এখনও নির্ধারণ হয়নি।
সাদা কেন?
একের পর এক সাদা বাঘের জন্মের কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি কিউরেটর ও চিকিৎসক ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রথমবার সাদা বাঘ জন্মানোর পর আমরা বুঝতে পারি রাজ-পরী যুগল থেকে আরও সাদা বাঘ পাওয়া যেতে পারে।
“তাই আমরা এই জুটিকে কনটিনিউ ব্রিডিং করতে দিই। এরমধ্যে ২০১৯ ও ২০২০ সালে দুবার মোট ৫টি শাবকের জন্ম দিলেও সেগুলো ছিল কমলা। এবার একসাথে চারটিই সাদা।”
ডা. শুভ বলেন, “একসাথে চারটি সাদা বাঘ পাওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। চারটি শাবকই যদি বড় হয়ে- একসাথে পাঁচটি সাদা বাঘের বিচরণ হবে পৃথিবীতে বিরল দৃশ্যের একটি।
“বিশ্বের আর কোথাও একসাথে চারটি সাদা বাঘের জন্ম হয়েছে কি না, আমার জানা নেই।”
১৯৫১ সালে ভারতে মহারাজা শ্রী মরতাঁদ সিং বন থেকে সর্বশেষ একটি সাদা বাঘ ধরেন। সেটির নাম দেওয়া হয় ‘মোহন’। তার বংশধররাই ভারতের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় আছে।
বিশ্বে এখন যত সাদা বাঘ আছে, তার সবই ‘ক্যাপটিভ’, অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জন্ম নেওয়া। এর সংখ্যা দুইশর মত। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার পাঁচটিসহ বর্তমানে বাংলাদেশেই সাদা বাঘ আছে ছয়টি।
সাদা শাবক কেন জন্মায়, এ প্রশ্নের উত্তরে ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, “পূর্ব পুরুষের মধ্যে কোনোটি সাদা বাঘ হলে, তাদের সন্তানদের মাধ্যমে সাদা শাবকের জন্ম হতে পারে।
“যেহেতু রাজ-পরীকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছে, তাই তাদের পিতা-মাতার বিষয়ে আমরা জানি না।”
তিনি বলেন, আরেকটি কারণ হতে পারে ইনব্রিডিং। অর্থাৎ, রাজ-পরী যদি একই পরিবারের সদস্য হয়। তবে সে বিষয়েও তারা নিশ্চিত নন।
“ইনব্রিডিংয়ের ক্ষেত্রে যে সাদা বাঘের জন্ম হয় সেগুলো তুলণামূলক দুর্বল প্রকৃতির হয়। কিন্তু শুভ্রার শক্তি অন্য বাঘগুলোর চেয়ে বেশি। এমনকি শারীরিক বৃদ্ধিও বেশি। শুভ্রার আচরণও আক্রমণাত্মক।”
ডা. শুভ বলেন, “সাদা বাঘ জন্মানোর একটি কারণ হতে পারে রেসেসিভ জিন। সম্ভবত রাজ ও পরীর মধ্যে এই জিন প্রকট হয়ে ওঠার কারণেই সাদা শাবক জন্ম দিচ্ছে। যখন এই জিন প্রচ্ছন্ন থাকে তখন তারা কমলা-কালো ডোরা বাঘের জন্ম দেয়।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ আহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ত্বকে মেলানিনের তারতম্যের কারণেও এমনটা হয়।
“যেমন চিতাবাঘ কালো, সিংহ সাদা ও বাঘ সাদা হয়। মেলানিন কম থাকলে বাঘ কমলা রঙের না হয়ে সাদা রঙের হতে পারে।”
বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকার বেঙ্গল টাইগার প্রজাতি ভারত-বাংলাদেশের বেঙ্গল টাইগার প্রজাতির উত্তর পুরুষ। এগুলো সেখানে ব্রিডিং করা হয় বাণিজ্যিকভাবে এবং বিক্রির জন্য। বারবার ইনব্রিডিংয়ের কারণেও অনেক সময় সাদা বাঘের জন্ম হতে পারে বলে জানান অধ্যাপক ফরিদ হাসান।
“আবার রেসেসিভ জিনের কারণেও হতে পারে। রাজ-পরীর পূর্ব পুরুষে এ ধরনের কোনো বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যেটা রাজ-পরীর বেলায় প্রচ্ছন্ন ছিল; কিন্তু তাদের সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে প্রকট হচ্ছে। ফলে সাদা বাঘের জন্ম হতে পারে। রাজ-পরীর মা-বাবা কী রকম ছিল সেটা আমাদের জানা নেই।”
ঠিক কী কারণে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় সাদা বাঘের জন্ম হচ্ছে, তা জানতে জিনগত পরীক্ষার প্রয়োজন বলে মনে করেন ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ।
তিনি বলেন, “এখনও পর্যন্ত সেরকম কিছু যেহেতু করা হয়নি, তাই সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না কোন কারণে বাঘগুলো সাদা হচ্ছে।”
ইনব্রিডিংয়ের বিপদ
রাজ-পরীর সন্তান প্রথমবারের তিন সন্তানের একটি শুভ্রা। সেই শুভ্রার সঙ্গে জুটি বেঁধে রাজ ২০২১ সালে জন্ম দেয় একটি বাঘিনীর।
সেই বাঘিনীর একটি পায়ে সমস্যা আছে, পায়ের পাতা এবং নখেও আছে খুঁত।
ডা. শুভ বলেন, “পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রজননের (ইনব্রিডিং) ফলে অনেক সময় নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে শাবকের। এই বাঘিনীর ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। এটি ক্লাবড ফিট (clubbed feet); অর্থাৎ হাঁটুর প্যাটেলা (গোলাকার অংশ) বাঁকানো। ফলে একটি পা বাঁকা। এছাড়া দুটি পায়ের পাতা লাগানো। একটি থাবায় নখ একটি কম।”
এ কারণে আপতত শুভ্রা, জয়াসহ ছয়টি বাঘিনীর কোনো ব্রিডিং করানো হচ্ছে না জানিয়ে ডা. শুভ বলেন, “ক্রস ব্রিডিং (পরিবারের সদস্য নয় এমন বাঘের মাধ্যমে প্রজনন) করতে পারলে সুস্থ বাঘ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। তাই আমাদের প্রয়োজন রাজ-পরী পরিবারের সদস্য নয়- এমন একটি বাঘ।
“দেশের কোনো চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্ক থেকে বিনিময়ের মাধ্যমে বাঘ আনা সম্ভব হলে এই সংকট আর থাকবে না।”
