Published : 10 Apr 2026, 10:20 PM
আরব সাগরে মিসাইল হামলার পর একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে লাইফবোটে উত্তাল সাগরে নেমে জীবন বাঁচিয়েছেন চার নাবিক, যাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশিও রয়েছেন।
পাকিস্তানি নৌবাহিনীর একটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে। পরে ক্ষতিগ্রস্ত ওই জাহাজ থেকে চার বাংলাদেশিসহ আরো ১৪ জনকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার পাওয়া ওই পাঁচ বাংলাদেশি নাবিক এখন করাচির একটি হোটেলে আছেন। আগুন নেভায় জাহাজে রয়ে গেছেন ক্যাপ্টেনসহ চারজন, তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশিও রয়েছেন।
মিসাইল হামলায় পাসপোর্ট ও সিডিসিসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হারিয়ে এখন দেশে ফেরা নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন পাকিস্তানে থাকা বাংলাদেশি নাবিকরা। তারা দ্রুত দেশে ফিরতে চান।
চীনের সাংহাই থেকে ওমানের সোহার বন্দরে যেতে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল পানামার পতাকাবাহী ‘এমভি গোল্ড অটাম’। যুদ্ধবিরতির আগের দিন মঙ্গলবার দুপুরে সেই জাহাজে মিসাইল হামলা হয়।
জাহাজটির ২২ জন নাবিকের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি, ১১ জন চীনা, তিনজন ইন্দোনেশিয়ার এবং একজন করে নাবিক ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারের।

মিসাইল হামলায় বিভিন্ন অংশে আগুন ধরে যাওয়ার পর জাহাজটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ক্যাপ্টেন। তারপর সেই জাহাজ থেকে প্রাণ বাঁচানোর রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশি নাবিক এহসান সাবরি রিহাদ।
টেলিফোনে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জীবন রক্ষার সেই দুঃসাহসিক সময়ের বর্ণনা দেন।
রিহাদের বাড়ি কক্সবাজার সদরে। গত বছরের জুনে এমভি গোল্ড অটাম জাহাজে ক্যাডেট (অয়েলার) হিসেবে যোগ দেন তিনি। এই জাহাজে করেই গত ১০ মাসে চীন, ভারত ও ইরানের বিভিন্ন বন্দরে একাধিকবার গেছেন।
রিহাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মঙ্গলবার দুপুরে জাহাজে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। এসময় হঠাৎ বিকট শব্দে জাহাজ কেঁপে উঠে। তখন আমাদের জাহাজ আরব সাগরে। পরপর তিনটা মিসাইল হামলা হয় জাহাজে।
“প্রথম মিসাইলটা আঘাত করে জাহাজের পিছনের অংশে। এরপর আমরা সবাই জাহাজের অ্যাকমোডেশন রুমে ছুটে যাই। সেখা থেকে আরো বিস্ফোরণের শব্দ শুনি। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর যাই ইঞ্জিন রুমে। কিন্তু ততক্ষণে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। চেষ্টা করেও আর ইঞ্জিন চালু করা সম্ভব হয়নি।”

মিসাইল হামলায় জাহাজের বিভিন্ন অংশে আগুন ধরে যায় জানিয়ে রিহাদ বলেন, “আগুন ধরে বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবং ইঞ্জিন চালু করতে না পারায় ক্যাপ্টেন জাহাজটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন।
“আমাদের জাহাজে দুটি লাইফবোট ছিল। তার মধ্যে একটি লাইফবোট মিসাইল হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। অন্য একটি লাইফবোট দিয়ে মিসাইল হামলার ৫ ঘণ্টা পর আমরা সাগরে নামি। লাইফবোটে আমরা চারজন ছিলাম।”
কিন্তু যে লাইফবোট নিয়ে আরব সাগরে নেমেছিলেন রিহাদরা, সেটির ইঞ্জিনও ছিল অচল।
রিহাদ বলেন, “তখন সাগর ছিল ভীষণ উত্তাল। ঢেউয়ে দুলছিল আমাদের লাইফবোট। অনেকক্ষণ সাগরে ভেসে থেকে আমরা কয়েক দফা বমি করি। তখন আর বাঁচার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।
“তারপর বৃষ্টি নামে। অনেক দূরে একটি জাহাজ দেখতে পেয়ে কালার ফ্লেয়ার ছুঁড়ে ওই জাহাজটির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করি। তারপর এমভি ইউনাইস নামের জাহাজটির দেখা পাই। লাইফবোটের ইঞ্জিন বিকল থাকায় বৈঠা বেয়ে ওই জাহাজের কাছে পৌঁছাই আমরা।”
এমভি ইউনাইস জাহাজে রশি বেয়ে ওঠেন লাইফবোটে থাকা চারজন। এমভি গোল্ড অটামে মিসাইল হামলার শিকার হওয়ার কথা ইউনাইসের নাবিকদের বলেন।
গোল্ড অটামের পরিচালনাকারী কোম্পানি মঙ্গলবার স্থানীয় সময় গভীর রাতে পাকিস্তানে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সাথে যোগাযোগ করে। পরে পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন এগিয়ে যায় গোল্ড অটামের নাবিকদের উদ্ধারে।
ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজে থাকা ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জনকে উদ্ধার করে পিএনএস হুনাইন। গোল্ড অটামের ক্যাপ্টেনসহ বাকি চারজন নাবিক জাহাজটি উপকূলে ভেড়ানোর জন্য থেকে যান।
ওই চারজনের মধ্যে মাজহারুল আবেদিন শাওন নামের এক বাংলাদেশি নাবিকও আছেন বলে জানান রিহাদ।

পরিত্যক্ত এমভি গোল্ড অটাম থেকে ১৪ জনকে উদ্ধারের পর এমভি ইউনাইস থেকেও চারজনকে তুলে নেয় পাকিস্তানের নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন। মোট ১৮ জনকে নিয়ে বুধবার করাচি বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি।
সেখান থেকে আনুষ্ঠানিকতা ও প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বৃহস্পতিবার রাতে ১৮ নাবিককে নিয়ে যাওয়া হয় করাচির একটি হোটেলে।
রিহাদ বলেন, হোটেলে তারা পাঁচ বাংলাদেশি নাবিক আছেন। অন্যরা হলেন তাওহিদুর রহমান, সৈকত পাল, রিয়াদ হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মারুফ।
“চীনের নাবিকদের সাথে দেখা করতে ইতোমধ্যে চীনা দূতাবাসের লোকজন হোটেলে এসেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে এখনো আমরা নিজেরা যোগাযোগ করতে পারিনি। তবে পাকিস্তান নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে শুনেছি।”
দ্রুত দেশ ফেরার অপেক্ষায় আছেন জানিয়ে এই বাংলাদেশি নাবিক বলেন, “জাহাজে মিসাইলের আগুনে আমাদের পাসপোর্ট, সিডিসিসহ কাগজপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা দেশে ফিরতে চাই। আশা করি দূতাবাস উদ্যোগ নেবে।”

গত ১৬ মার্চ চীনের সাংহাই বন্দর থেকে এমভি গোল্ড অটাম নামের বাল্ক ক্যারিয়ারটি ওমানের সোহার বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে মিসাইল হামলার সময় জাহাজটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ছিল।
জাহাজের পাঁচটি হ্যাজে (খোল) লোহার পাইপসহ বিভিন্ন পণ্য আছে। জাহাজের উপরে বিশেষায়িত কন্টেইনারে বাস ও ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন ছিল বলে জানান এহসান সাবির রিহাদ।
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি সাখাওয়াত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এমভি গোল্ড অটামের বাংলাদেশি নাবিকদের দ্রুত দেশে ফেরাতে আমরা সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং নাবিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। আশা করি দ্রুত কাগজপত্র প্রস্তুত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।”