বিকাল থেকে পানি বাড়লেও শুরুতে গুরুত্ব দেননি, রাতেই খাট সমান পানি উঠে যায়, আটকা পড়েন সুনীল মজুমদাররা।
Published : 25 Aug 2024, 12:53 AM
শতবর্ষী মা ঋতুবালা মজুমদারকে নিয়ে নিজ বাড়িতে আটকা পড়েছিলেন স্কুল শিক্ষক সুনীল মজুমদার, তাদের উদ্ধারে গিয়ে আটকা পড়েন জামাতা রাজীব বড়ুয়াও; খাবার সংকট আর যোগাযোগবিহীন দুইদিন পর অবশেষে তারা উদ্ধার হন।
সুনীল মজুমদারের বাড়ি ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত ফেনীর সদর উপজেলার ফাজিলপুর গ্রামে। বানের পানিতে নিজ বাড়িতে আটকা পড়লে পরে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। তারাসহ সেই বাড়ির মোট নয়জনকে শুক্রবার উদ্ধার করেন স্বেচ্ছাসেবীরা।
রাজীব বড়ুয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফাজিলপুর ইউনিয়নের আলিয়ারা দীঘির পাশের বাড়িতে আমার শ্বশুর ও দাদি শাশুড়ি একটি টিনশেড ঘরে ছিলেন। বুধবার রাত থেকে টানা বৃষ্টি ও ঢলের কারণে সেখানে পানি বাড়তে শুরু করে।
“বিকাল থেকে একটু একটু করে পানি বাড়ির উঠান পর্যন্ত ওঠে। বিষয়টিকে তারা শুরুতে গুরুত্ব দেননি। কারণ, এর আগে অতি বৃষ্টিতে বাড়ির উঠোন পর্যন্ত পানি উঠলেও তার বেশি হয়নি।”
রাজীব বলেন, বুধবার রাতে বৃষ্টি বাড়ার পর গভীর রাতে পানি ঘরের খাট ছুঁই ছুঁই হয়। পরদিন ভোরে খাট ডুবে গেলে তার শ্বশুর ও দাদি শাশুড়ি পাশের একতলা পাকা বাড়ির সিড়িঘরে অবস্থান নেন।
পরে রাজীব তার শাশুড়ি চট্টগ্রাম থেকে ফেনীর সেই বাড়িতে পৌঁছালে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তারাও একপর্যায়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
“বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় আমরা কারও কাছে সাহায্যও চাইতে পারছিলাম না। আমার স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাহায্য চাইলেও উদ্ধারকারী স্বেচ্ছাসেবকরা তীব্র স্রোতের কারণে সেখানে পৌঁছাতে পারছিলেন না। আমরা চারজন এবং সেই একতলা বাড়িটির শিশুসহ মোট নয়জন সিড়িঁঘরে আটকে ছিলাম,” বলেন তিনি।
রাজীব জানান, তার স্ত্রী যোগাযোগ করতে না পেরে দুই বন্ধুকে নিয়ে ফেনী সদরের খাইয়ারা এলাকায় গেলেও সেই বাড়ি পৌঁছাতে পারছিলেন না। ত্রাণ নিয়ে আসা একটি দল সহায়তা করতে এলেও স্থানীয়দের সহায়তা না পাওয়ায় তারাও ফিরে যায়।
পরে শুক্রবার সকাল ১০টার পরে শিক্ষক সুনীলের এক ছাত্রের সহযোগিতায় ইঞ্জিননচালিত নৌকায় করে ওই বাড়ির নয়জনকে উদ্ধার করে ফেনীর খাইয়ারায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে দুই দফায় গাড়ি বদল করে শুক্রবার রাতে তাদের চট্টগ্রাম শহরের বাসায় নেওয়া হয়।
নিজের জীবদ্দশায় এমন বন্যা দেখেননি সুনীল মজুমদার। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অতীতে বন্যার পানি কখনও বাড়ির উঠোন পার হয়নি। বৃদ্ধা মাকে নিয়ে একপ্রকার আতংক নিয়ে দুই দিনের বেশি সময় ঘরে আটকে ছিলাম।
“যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে গেছি…; বিদ্যুৎ, মোবাইলবিহীন অবস্থায় কতক্ষণ টিকব সে শঙ্কা বারবার মনে উঁকি দিচ্ছিল। তারপরও মেয়ে, মেয়েজামাই এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় মাকে নিয়ে জীবিত ফিরতে পেরেছি, সেটাই বড় কথা। আমার জীবদ্দশাতে এত পানি কখনও দেখিনি।”
রাজীব বড়ুয়ার ভাষ্য, “ওই একতলা বাড়ির সিঁড়িঘরে দুইদিন আটকে থাকার স্মৃতি কখনও ভোলা যাবে না।”
উজানের ঢল ও ভারি বর্ষণে গত কয়েকদিন ধরে ভাসছে ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার। এর মধ্যে ফেনীতে সবথেকে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।