Published : 03 Apr 2025, 08:11 PM
চৈত্রের ষষ্ঠী তিথিতে করলডেঙ্গা সন্ন্যাসী পাহাড় সেজে উঠেছে বাসন্তী পূজার আয়োজনে; দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই আসছেন পূজার প্রসাদ গ্রহণ ও অঞ্জলি দিতে।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে করলডেঙ্গা সন্ন্যাসী পাহাড়। সেই পাহাড়ের উপরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থপীঠ দশভূজা মন্দির বা ‘চণ্ডী তীর্থ মেধস আশ্রম’, যা মেধস মুনির আশ্রম হিসেবে পরিচিত।

আঞ্চলিক জনশ্রুতি হল, চট্টগ্রামের মেধস আশ্রম থেকেই শুরু হয়েছিল দেবী দুর্গার পূজা। বসন্ত কালের এ পূজাটি বাসন্তী পূজা নামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পরিচিত। তবে বাঙালি হিন্দুর কাছে এখন শরৎকালের দুর্গাপূজাই বেশি গুরুত্ব পায়।

মেধস আশ্রমের অধ্যক্ষ বুলবুলানন্দ মহারাজ বলেন, সত্য যুগে কোলা রাজ্যের রাজা সুরথ তার রাজ্য হারিয়ে এবং স্বজন কর্তৃক বিতাড়িত হয়ে সমাধি বৈশ্য এ পাহাড়ে আসেন। এবং সেখানে ঋষি মেধসের সাক্ষাৎ পান ।

“ঋষি মেধসের নির্দেশে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য এ পাহাড়ে এ মুনির আশ্রমে মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রথম দুর্গা পূজা করেন, যা পরবর্তীতে বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত হয়।”
বুলবুলানন্দ বলেন, “এ বাসন্তী পূজাই প্রথম দুর্গা পূজা। পরবর্তীতে সীতাকে উদ্ধার করতে রামচন্দ্র দেবীর অকাল বোধন করে শরৎকালের দুর্গা পূজা করেন।”

মেধস আশ্রমের নিজস্ব প্রকাশানায় অধ্যাপক সচ্চিদানন্দ রায় চৌধুরী লিখেছেন, সপ্তসতী চণ্ডী গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে মেধা ঋষির আশ্রমের কথা আছে। কিন্তু দেবী তীর্থ মেধস আশ্রম কোথায়, কোন রাজ্যের কোন প্রদেশে সেটা কোনো পুরাণশাস্ত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বলা না থাকায় এ মন্দির কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়।
সত্যযুগের এ আদিপীঠ কালক্রমে হারিয়ে গেলেও ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দে স্বামী বেদানন্দ এ আশ্রম নতুন করে আবিস্কার করেন বলে তিনি লেখায় উল্লেখ করেছেন।
আশ্রমের অধ্যক্ষ বুলবুলানন্দ বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এ আশ্রমে বোমা পড়েছিল। চারদিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। পরে সংষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিভিন্ন মন্দির নির্মাণ করা হয়।

বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা ইউনিয়নের এ সন্ন্যাসী পাহাড়ে ৬৮ একারের বেশি জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে আশ্রম। মূল আশ্রমে প্রবেশ করতে কয়েকশ সিঁড়ি বেয়ে অন্তত পাঁচশ ফুট উঁচুতে উঠতে হয়।
নিচে আশ্রমের মূল প্রবেশ পথের শুরুতেই আছে গনেশ মন্দির। চারদিকে পাহাড়, গাছ গাছালি আর নানা ধরনের পাখির ডাক শোনা যায় এ মন্দিরের পাহাড়ে উঠতে উঠতে।
পাহাড়ের উপরে কিছুদূর উঠতেই দূর থেকে চোখে পড়বে মূল মন্দিরের ফটকে দেবী দুর্গার মুখাবয়ব। উপরে মূল মন্দির, যেটি ‘চণ্ডী মন্দির’ নামে পরিচিত। মন্দিরের পাশেই আশ্রমের ‘আবিষ্কারক’ স্বামী বেদানন্দের মূর্তিসহ সমাধিপীঠ।
এ চণ্ডী মন্দিরেই দুর্গা পূজা হয়। বৃহস্পতিবার থেকে পাঁচদিন ধরে চলবে এ বছরের বাসন্তী পূজার নানা আচার।

মূল মন্দিরের পূর্ব পাশে এক পাহাড় থেকে নেমে অপর পাহাড়ে কামাক্ষ্যা মন্দির। সেখান থেকে নেমে আরেকটি উঁচু পাহাড়ে উঠলে শিব মন্দির মিলবে। শিব মন্দির দর্শনের পর সে পাহাড় থেকে নেমে আরেকটি পাহাড়ে উঠলে দেখা যাবে তারা মন্দির।
তারা মন্দির দর্শন শেষে সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের নিচে নেমে এলে চোখে পড়বে ‘মানস সরোবর’। পাহাড়ি ঝিরির পানি এসে জমে এ সরোবরে। তার পাশেই সীতা মন্দির। যেটি মূল মন্দিরের থেকে কয়েকশ ফুট নিচে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আশ্রমের এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে পূণ্যার্থীরা একসময় মুগ্ধ হয়ে পড়তেন। চারদিকে গাছগাছালির ছায়া, সবুজ বনজঙ্গলে নানা ধরনের ফলের গাছ দেখা যেত। সেগুলোর জন্য বন্যপ্রাণীরা আশ্রমের চারপাশে আসত, কিন্তু কখনো কারো ক্ষতি করার কথা শোনা যায়নি। ইদানিং বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় সেসব প্রাণির দেখা আর মেলে না।
একসময়ে এ আশ্রমে পূণ্যার্থী সংখ্যা কম থাকলেও এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হয়ে যাওয়ায় অনেনে বাসন্তী পূজার সময় আসেন।
মেধস আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমিত কুমার মজুমদার বলেন, “মেধস আশ্রমের মূল উৎসব বাসন্তী পূজা। এ আশ্রম থেকেই বাসন্তী পূজার উৎপত্তি।”

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে শুরু হবে পূজার আনুষ্ঠানিকতা। শুক্রবার সপ্তমী তিথিতে শুরু হবে মূল পূজার কার্যক্রম। ৭ এপ্রিল বিজয়া দশমীতে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।
শারদীয়া দুর্গাপূজা আর বাসন্তীপূজার রীতি প্রায় একই রকম। অবাঙালিদের মধ্যে এখনও বাসন্তীপূজার চল আছে। তবে বাঙালিরা শারদীয় দুর্গাপূজাকেই প্রধান পার্বণ হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সাহিত্যিক রাধারমণ রায় লিখেছেন, আকবরের রাজত্বকালে ১৫৮০ সাল নাগাদ তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ বাংলাদেশে শারদীয়া দুর্গাপূজার সূচনা করেন। তার আগে বন্তে হত বাসন্তী পূজা, আর শরৎকালে হত নবপত্রিকা পূজা। নবপত্রিকাই কালক্রমে চার পুত্র-কন্যাসহ দেবী দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়।