Published : 24 Apr 2026, 09:17 AM
চট্টগ্রামে হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর থেকে চলতি সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
এছাড়া চলতি মাসে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে; সঙ্গে যোগ হয়েছে শিশুদের মৌসুমি জ্বর।
জেলায় শনাক্ত হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ জনে।
হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ‘হাম কর্নার’ স্থানান্তর করা হয়েছে মেডিসিন ইউনিটের ১ নম্বর ওয়ার্ডে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, শুরুতে আক্রান্তদের মাধ্যমে যারা সংক্রমিত হয়েছে, তারা এখন চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছে। টিকা কার্যক্রম চলমান থাকায় ধীরে ধীরে হাম আক্রান্তের সংখ্যা কমবে।
হামের সংক্রমণ ঠেকাতে টিকা দেওয়ার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। পাশাপাশি নিউমোনিয়া থেকে শিশুদের রক্ষা করতে অতিরিক্ত রোদে না যাওয়া, ঠান্ডা কিছু না খাওয়া এবং জ্বর ও সর্দি হলে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

হাসপাতালে রোগী বাড়ছে
মার্চের চতুর্থ সপ্তাহ থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৩দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৩৩ শিশু চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়।
এরমধ্যে গত রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাঁচদিনে মোট ১৭০ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে।
তার আগে ১২ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত সাতদিনে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছিল ১২৭ জন।
জানতে চাইলে বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ আমাদের এখানে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি আছে ৮৮ জন। এরমধ্যে যাদের শ্বাসকষ্ট আছে, তাদের আইসিইউতে রাখতে হয়। এখন ১৩ জনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
“দিন দিন রোগী বাড়ছে। হাম কর্নার প্রথম যেখানে শুরু করেছিলাম সেখানে শয্যা সংখ্যা কম। আগে যেখানে ডেঙ্গু ওয়ার্ড করেছিলাম, সেখানে আজ হাম কর্নারের রোগীদের সরিয়ে নিয়েছি। এখানে শয্যা ৫০টির মত।”
শুরুতে চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের দুটি ব্লকের ১৬টি শয্যা নিয়ে ‘হাম কর্নার’ করা হয়েছিল।
বৃহস্পতিবার বিকালে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় মেডিসিন বিভাগের ‘অ্যাকিউট মেডিসিন ইউনিট’ (এএমইউ) নামের ১ নম্বর ওয়ার্ডে হাম আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের নিয়ে আসা হয়েছে।
এখানে চিকিৎসাধীন শিশু মো. আনাসের (১) স্বজনরা জানান, তারা চকবাজার থেকে তিন দিন আগে হাম কর্নারে আসেন। সেখানে এক বিছানায় তিন-চারজন করে রোগী ছিল। গরমও ছিল খুব বেশি। স্থানান্তর হওয়ায় তারা কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করেন।
সীতাকুণ্ড উপজেলা থেকে আসা শিশু মুমতাহা (২) বুধবার রাতে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হয়। তার ছোট্ট হাতে স্যালাইনের নল লাগানো। শিশুটি মায়ের কাঁধে মাথা রেখে শুয়েছিল।
বৃহস্পতিবার তুলনামূলক বড় পরিসরে এলেও সেখানকার বেশির ভাগ শয্যায় দুজন করে রোগী দেখা গেছে।
চমেক হাসপাতালে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে জানিয়ে হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বলেন, “তাদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৩৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
“যত শিশু এসেছে তাদের মধ্যে কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার রোগীর সংখ্যা বেশি।”

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী বাড়তে থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হামের লক্ষণ, যেমন জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে এলে সেখানে ভর্তি করানো হচ্ছে। কারণ হামের উপসর্গও এসবই। তাতে রোগী বেড়েছে মনে হচ্ছে।
“আর শুরুতে যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের সংস্পর্শে এসেছে, এমন শিশুরা এখন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছে। যেহেতু টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে সংক্রমণও কমে আসবে।”
জেলার ১৫টি উপজেলায় সোমবার থেকে শুরু হওয়া হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচির আওতায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি টিকা দেয়া হয়েছে বলে জানায় জেলা সিভিল সার্জনের দপ্তর। লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৭ লাখ।
এদিকে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে প্রায় ৩ লাখ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কর্মসূচি শুরুর প্রথম চারদিনে ৬০ হাজার টিকা দেওয়া হয়েছে।
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমাদের টিকা ও সিরিঞ্জের সংকট নেই। ১০ মে পর্যন্ত ক্যাম্পেইন চলবে।”

নিউমোনিয়ার প্রকোপ
হামের কারণ মিজলস ভাইরাস শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে ফুসফুস সহজে সংক্রমিত হয়ে নিউমোনিয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
চিকিৎসকরা বলছেন, গ্রীষ্মে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলেও নিউমোনিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ে। হামজনিত এবং আবহাওয়াজনিত প্রভাব— দুই কারণেই এখন নিউমোনিয়া হচ্ছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মুছা মিঞা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন নিউমোনিয়ার ‘সিজন’। আমাদের বিভাগে বিভিন্ন রোগ নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৫০-৪০০ শিশু ভর্তি থাকে। এছাড়া প্রতিদিন একশ জনের মতো রিলিজ নিয়ে যায়। আবার এক থেকে দেড়শ শিশু ভর্তি হচ্ছে। এখন যারা আছে, তাদের মধ্যে শ’খানেকের নিউমোনিয়া বা শ্বাসকষ্ট আছে।
“চলতি মাসে নিউমোনিয়ায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। যারা মারা গেছে, তাদের মধ্যে কারো কারো হামের উপসর্গ ছিল। তবে বছরের অন্য সময়েও নিউমোনিয়ায় দিনে এক থেকে দু’জন মারা যায়।”
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিনেরও দাবি, নিউমোনিয়া নিয়ে সারা বছরই শিশুরা হাসপাতালে ভর্তি হয়। তবে এখন গরম বাড়ায় রোগী বেড়েছে। এছাড়া বেড়েছে ‘সিজনাল জ্বর’ আক্রান্তের সংখ্যাও।
নগরীর কোতোয়ালী এলাকার বাসিন্দা তৃষা মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার ক্লাস টুতে পড়ুয়া মেয়ে ১৫-২০ দিন ধরে জ্বর আর কাশিতে ভুগেছে। দুইদিন আগে টেস্ট করিয়ে ডাক্তার জানালেন, ওর নিউমোনিয়া হয়েছে। এখন হামের সংক্রমণের ভয়ে হাসপাতালে না নিয়ে বাসায় রেখে চিকিৎসা করাচ্ছি।”
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “তাপমাত্রা বাড়লে নিউমোনিয়া বাড়ে। এখন গরম বেশি পড়ছে। কড়া রোদে যাওয়া, গরমে ঘেমে যাওয়া এবং গরম থেকে স্বস্তি পেতে ঠান্ডা পানীয় বা খাবার খাওয়ার প্রবণতার কারণে জ্বর ও নিউমোনিয়া হচ্ছে।
শিশুরা যাতে বেশি রোদে না যায় এবং রোদ থেকে এসে ঘাম গায়ে শুকিয়ে না ফেলে। এছাড়া গরম কমাতে ঠান্ডা খাবার না খায় এবং গরম থেকে এসে সঙ্গে সঙ্গে এসির অতিরিক্ত ঠান্ডা তাপমাত্রায় প্রবেশ না করে, এমনটাই পরামর্শ তার।
আরো পড়ুন
হাম: একদিনে ৫ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৮৪৭ জন
চট্টগ্রাম নগরীতে হামের টিকা পাবে ৩ লাখ শিশু: মেয়র
হাম ঠেকানোর সব কিছুতেই 'ঘাটতি'
হামের লক্ষণ নিয়ে এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি ১২ শিশু