Published : 20 Jul 2026, 05:31 PM
চট্টগ্রামে শিশু আবিদা সুলতানা আয়নীকে হত্যার দায়ে খুনির ফাঁসির রায়ে স্বস্তি এসেছে মায়ের মনে, কিন্তু সন্তান হারানোর বেদনা তাতে পূরণ হওয়ার নয়।
সোমবার রায় ঘোষণার পর আয়নীর মা মোছাম্মৎ বিবি ফাতেমা কাঁদতে বাঁদতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার মেয়ে তো আর ফিরবে না। এভাবে আর কোনো মেয়ের যেন মৃত্যু না হয়।”
চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমান এদিন আয়নী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। আসামি মো. রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড দেন তিনি।
আয়নী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার আব্দুল হাদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। পাহাড়তলীর আব্দুর কাজীর দীঘির পাড় এলাকায় তাদের বাসা।
তার মা ফাতেমা পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। আর বাবা কাজ করতেন ঢাকার একটি পোশাক কারখানায়।
২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকেল থেকে আয়নীর খোঁজ পাচ্ছিল না পরিবার। থানায় জিডি করেও সন্ধান না মেলায় সাত দিন পর ওই বছরের ২৮ মার্চ আদালতে গিয়ে অপহরণের মামলা করেন আয়নীর মা।
বিচারক তার আর্জি শুনে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করতে পাহাড়তলী থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
মামলায় প্রতিবেশী সবজি বিক্রেতা ৩৫ বছর বয়সি মো. রুবেলকে আসামি করা হয়। তাকে আটক করার পর পিবিআই শিশুটির লাশের খবর জানতে পারে। পরদিন আয়নীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
মামলার এজাহারে শিশুটির মা বলেন, “ঘটনার দু-তিন দিন আগে স্কুলের এক বান্ধবী বিড়াল কিনেছে জানিয়ে আমার কাছে বিড়াল ছানা কিনে দেওয়ার আবদার করে মেয়ে। তখন বলেছিলাম, বেতন পেলে বিড়াল ছানা কিনে দিব।
“তখন সে বলেছিল, রাস্তার এক তরকারি বিক্রেতা বলেছে, তার এক পরিচিত লোক আছে। সেখান থেকে আমাকে বিড়াল ছানা এনে দেবে।”
২০২৩ সালের ২০ মার্চ রাস্তায় বিড়াল ছানা ধরতে গিয়ে সবজি বিক্রেতা রুবেলের ভ্যানের সঙ্গে ধাক্কা লাগে আয়নীর। বিড়াল ছানা এনে দেবে বলে তখন শিশুটির সঙ্গে মিনিট পাঁচেক কথাও বলেছিল প্রতিবেশী রুবেল।

পরদিন ২১ মার্চ বিকেলে আবার রাস্তায় দেখা হলে শিশুটিকে বিড়াল ছানা দেবে বলে ভ্যান করে নিয়ে যায় ফাঁকা এক বাসায়।
মামলাটি তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক ইলিয়াস খান তখন জানিয়েছিলেন, শিশুটিকে কাজীর দিঘী এলাকাতেই একটি ভবনের চতুর্থ তলায় নিয়ে যায় রুবেল। যেটি তার পরিচিত এক জনের খালি বাসা।
ওই বাসায় নিয়ে গিয়ে রুবেল শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। ওই সময় শিশুটি চিৎকার করে দরজা খুলে বাসা থেকে বের হবার চেষ্টা করলে তাকে ভয়ভীতি দেখায় এবং বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য হুমকি দেয়। বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দেবে, সেই ভয় থেকে রুবেল ‘শ্বাসরোধ করে হত্যা করে’ শিশুটিকে।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রুবেল হত্যাকাণ্ডের কথা ‘স্বীকার করে’ ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি জানান, ২১ মার্চ বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে শিশুটিকে খুন করা হয়।
পুলিশ জানায়, সেদিন অন্য প্রতিবেশীদের সাথে রুবেলও শিশুটিকে খুঁজেছিলেন। এরপর রাত ৯টার দিকে লোকজন কমে গেলে, রুবেল ভ্যান নিয়ে আবার সেই বাসায় যান, যেখানে তিনি আয়নীর মরদেহ লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেখান থেকে লাশ বস্তায় ভরে আলমতারা পুকুর পাড় এলাকার ডোবায় ফেলে আসেন।
রায়ের পর এ আদালতের পিপি মাহমুদ-উল আলম চৌধুরী মারুফ বলেন, হত্যার অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায়’ আসামি রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছে আদালত।
এছাড়া অপহরণের অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা অর্থ দণ্ড এবং শিশুটিকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার পাকা জরিমানা করা হয়েছে রায়ে।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, “আদালত বলেছে, এটি সাড়ে দশ বছরের শিশু হত্যার একটি নির্মম ঘটনা। আসামির মধ্যে কোনো অনুশোচনা তিনি দেখেননি।
“যখন ভিকটিম (শিশুটির মা) থানায় গিয়েছিল, তখন যদি মামলাটি পুলিশ গ্রহণ করত, তাহলে হয়ত বাচ্চাটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হত।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন, “আয়নী একটি ছোট্ট শিশু। তার আনন্দের একটি উপাদান ছিল বিড়াল ছানা। একটি বিড়াল ছানার জন্য তার জীবনটা চলে যাওয়া, এটা কত বড় নিষ্ঠুরতা।
“একটি শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে মেরে ফেলা হয়েছে। তারপর লাশটা আটদিন যাবত মাটির নিচে পুঁতে ফেলা অবস্থায় ছিল। আদালতে শিশুটির মা মামলা নিয়ে এলে আদালত থানাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। তারপর লাশটি উদ্ধার হয়।”

আইনজীবী মুরাদ বলেন, “একটা শিশুর জীবন কতটা অনিরাপদ দেশে এটা তার একটা প্রমাণ। শিশুটির মা আট দিন পুলিশের কাছে, পিবিআইর কাছে, আদালতের বারান্দায় ঘুরেছে। শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর পর আজ বিচার পেয়েছে। সত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
“এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আর কোনো শিশু যেন ধর্ষণের বা হত্যার শিকার না হয়।”
রায় ঘোষণার পর আয়নীর মা ফাতেমা বলেন, “থানা পুলিশকে বলব, কোনো অভিযোগ নিয়ে কোনো ভুক্তোভোগী যদি থানায় যায়, তারা যেন এগুলো আমলে নেয়। এবং কিছু কিছু পুলিশ এবং পিবিআই আমাকে সহযোগিতা করেছে। পিবিআইকে এবং সিআইডিকে আমি অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই।”
আয়নীর দাদা শাহানা বেগম বলেন, “আমি দ্রুত রুবেলের ফাঁসি চাই। আমার নাতনি তো আর ফিরবে না। আমি খুনির ফাঁসি চাই। আর কিছু চাই না।”
পুরনো খবর
চট্টগ্রামে শিশু আয়নী হত্যা মামলায় আসামি রুবেলের মৃত্যুদণ্ড
চট্টগ্রামে শিশু আয়নী হত্যা মামলার রায় সোমবার
বিড়াল ছানার টানই কাল হলো শিশুটির