রেকর্ডের সুনামিতে এক ম্যাচেই তোলপাড়
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রান তাড়ায় ভারতের বিশাল জয়ে ব্যক্তিগত ও দলীয় অর্জনে ওলটপালট হয়ে গেছে রেকর্ড বইয়ের বহু পাতা।
রেকর্ড, অর্জন, মাইলফলক, কীর্তি… এক ম্যাচেই অনেক কিছুর ছড়াছড়ি। ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বুধবার এতসব সংখ্যার জন্ম হয়েছে যে, সঠিক হিসাব রাখাই কঠিন!
প্রথম ওয়ানডে হেরে সিরিজে পিছিয়ে থাকা ক্যারিবিয়ানরা ৫০ ওভারে তোলে ৪০৫ রান। সেঞ্চুরি করেন তিন ব্যাটসম্যান। সেই রান যেন স্রেফ তুড়ি বাজিয়েই পেরিয়ে যায় ভারত। ৮ উইকেটে জিতে যায় তারা ৩৯ বল বাকি রেখে। ১৩৩ বলে ২২৩ রানের রেকর্ডময় অপরাজিত ইনিংস খেলেন শুবমান গিল, সেঞ্চুরি করেন রোহিত শার্মা।
যত রেকর্ড ও অর্জন হয়েছে এই ম্যাচে, তার কিছু তুলে ধরা হলো এখানে:
পাহাড় টপকে
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৪০৫ রান টপকে জিতেছে ভারত। ওয়ানডেতে তাদের সবচেয়ে বেশি রান তাড়ায় জয়ের রেকর্ড এটি।
আগের রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৩৬০ রান তাড়ায় জয়। ২০১৩ সালে সেই ম্যচে ৯ উইকেটে জিতেছিল ভারত। অপরাজিত সেঞ্চুরি করেছিলেন রোহিত শার্মা ও ভিরাট কোহলি।
ওয়ান্ডারার্স ‘ওয়ান্ডারের’ পর
ওয়ানডেতে চারশর বেশি রান তাড়ায় জয়ের নজির আগে ছিল একটিই। জোহানেসবার্গের ওয়ান্ডারার্স স্টেডিয়ামের সেই ম্যাচ অমর হয়ে আছে ওয়ানডে ইতিহাসে। ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রান পেরিয়ে অবিশ্বাস্য জয় পেয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
চারশর চূড়ায়
ওয়ানডেদে এই নিয়ে ৯ বার চারশ রানের দেখা পেল ভারত। তারাই এখন এককভাবে শীর্ষে। ৮ বার চারশ ছুঁয়ে দুইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা।
পঞ্চবটী
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে সেঞ্চুরি করেন জন ক্যাম্পবেল, শেই হোপ ও আমির জাঙ্গু। ভারতের হয়ে তিন অঙ্কের স্বাদ পান শুবমান গিল ও রোহিত শার্মা। ৫ হাজার ২২ ম্যাচের ওয়ানডে ইতিহাসে এক ম্যাচে পাঁচ সেঞ্চুরি হলো এবারই প্রথম।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এক ম্যাচে পাঁচ সেঞ্চুরির নজির আর আছে স্রেফ একটিই। গত ডিসেম্বরে ভারতের ভিজায় হাজারে ট্রফিতে রাজকোটে বারোদার হয়ে সেঞ্চুরি করেন নিত্য পান্ডিয়া, আমিত পাসি ও ক্রুনাল পান্ডিা, হায়দরাবাদের হয়ে আভিরাথ রেড্ডি ও পোাগ্নায় রেড্ডি।
গতিময় গিল (১)
ডাবল সেঞ্চুরির পথে ৮৯ বলে দেড়শ স্পর্শ করেন শুবমান গিল। ভারতের হয়ে দ্রুততম দেড়শ এটি।
২০২২ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ডাবল সেঞ্চুরির পথে ১০৩ বলে ১৫০ রানে পৌঁছিলেন ইশান কিষান।
গতিময় গিল (২)
১১৭ বলে ২০০ ছুঁয়েছেন শুবমান গিল। ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরিয়ান এখন তিনিই। ভারতীয় অধিনায় পেরিয়ে গেছেন সতীর্থ ইশান কিষানের কীর্তি।
২০২২ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ১২৬ বলে দ্বিশতক করেছিলেন কিশান।
রান তাড়ায় রাজা
ওয়ানডে ইতিহাসে রান তাড়ায় ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস শুবমান গিলের এই অপরাজিত ২২৩। পরে ব্যাট করে আগের একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরিটি করেছিলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ২০২৩ বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২০১ রানের সেই ইনিংসটি খেলেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান।
সৌম্যকে ছাড়িয়ে
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে রান তাড়ায় সর্বোচ্চ ইনিংসটিও এখন শুবমান গিলের। এখানে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন সৌম্য সরকারকে।
২০১৯ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের বিপক্ষে আবাহনী লিমিটেডের হয়ে অপরাজিত ২০৮ রান করেছিলেন সৌম্য।
নেতৃত্বের সেরা
ওয়ানডেতে অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসও গিলের এই ২২৩। তিনি পেছনে ফেলেছেন ভিরেন্দার শেবাগকে।
২০১১ সালে ইন্দোরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই ২১৯ করেছিলেন শেবাগ।
রোহিতের পর (১)
ওয়ানডে একাদিক ডাবল সেঞ্চুরি করা দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান ২০২৩ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে হায়দরাবাদে তিনি করেছিলেন ২০৮।
রোহিত অবশ্য এখনও এক ধাপ ওপরে। ওয়ানডেতে তিনটি দ্বিশতক আছে তার।
রোহিতের পর (২)
ভারতের হয়ে ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংস গিলের এই ২২৩। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০১৪ সালে কলকাতায় ২৬৪ রান করে সবার ওপরে রোহিত শার্মা। শুধু ভারতের নয়, ওয়ানডে ইতিহাসেই সর্বোচ্চ ইনিংস সেটি।
সব দল মিলিয়ে রোহিত আর গিলের ইনিংস দুটির মাঝে আছে ২০১৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মার্টিন গাপটিলের ২৩৭।
কোহলির পর রোহিত
সেঞ্চুরির পথে এ দিন ১২ হাজার রান স্পর্শ করেছেন রোহিত শার্মা। ২৮২ ইনিংস লেগেছে তার এই মাইলফল যেতে। তার চেয়ে কম ইনিংস খেলে ১২ হাজার করেছেন কেবল ভিরাট কোহলি। তার লেগেছিল ২৪২ ইনিংস। ৩০০ ইনিংসে ১২ হাজার করে তিনে সাচিন টেন্ডুলকার।
জমাট শুরু
অল্পের জন্য জুটির রেকর্ড ভাঙতে পারেননি রোহিত ও গিল। ২৫৫ রানে থেমেছে তাদের উদ্বোধনী জুটি। ভারতের হয়ে শুরুর জুটিতে রেকর্ড সাচিন টেন্ডুলকার ও সৌরভ গাঙ্গুলির। ২০০১ সালে কেনিয়ার বিপক্ষে পার্লে ২৫৮ রানের বন্ধন গড়েছিলেন তারা।
রান তাড়ায় অবশ্য যে কোনো উইকেটেই ভারতের সেরা জুটি গিল ও রোহিতের ২৫৫। আগের রেকর্ড ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই এবং এই মাঠেই ২০১৮ সালে রোহিত ও কোহলির ২৪৬।
দুইশর বন্ধন
ভারতের হয়ে উদ্বোধনী জুটিতে একাধিকবার ২০০ রান ছোঁয়া দ্বিতীয় জুটি রোহিত ও গিল। আগে ছিল কেবল টেন্ডুলকার ও সৌরভ জুটির।
গুলির বেগে তিনশ ও চারশ
২৯.১ ওভারে ৩০০ স্পর্শ করেছে ভারত। ওয়ানডে ইতিহাসে এত দ্রুততায় ৩০০ করতে পারেনি আর কোনো দল।
অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ পেরিয়ে জয়ের সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার ৩২.২ ওভারে ৩০০ ছিল আগের রেকর্ড।
ভারত এ দিন ৪০০ করেছে ৪৩ ওভারে। এটিও দ্রুততম, তবে যৌথভাবে। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪৮১ করার ম্যাচে ৪৩ ওভারে ৪০০ করেছিল ইংল্যান্ড।
রানের অট্টালিকা
দুই দল মিলিয়ে এই ম্যাচে রান হয়েছে ৮১১, ওয়ানডেতে যা এক ম্যাচে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার সেই ম্যাচে রান উঠেছিল ৮৭২। ২০০৯ সালে রাজকোটে ভারতের ৪১৪ রান তাড়ায় শ্রীলঙ্কা করেছিল ৪১১। ম্যাচে রান হয়েছিল ৪২৫।
সেঞ্চুরির বন্যা
সিরিজের দুই ম্যাচে এখনও পর্যন্ত সেঞ্চুরি হয়েছে দুই দল মিলিয়ে ৮টি। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ এটি সর্বোচ্চ, যে কোনো ওয়ানডে সিরিজে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
সিরিজে ম্যাচ বাকি আছে আরও একটি। আরও সেঞ্চুরির আশা তাই করাই যায়!
সেঞ্চুরিয়ান ত্রয়ী
এই প্রথম একই ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি করতে পারলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের তিন ব্যাটসম্যান।
সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে এক দলের তিন সেঞ্চুরির নজির হলো ছয়টি। তবে ওয়ানডে ক্রিকেটে তো বটেই, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও কোনো দলে তিন সেঞ্চুরির পরও ম্যাচ হারার প্রথম ঘটনা এটি।
বড় রানের বড় দুঃখ
ওয়ানডেতে এই প্রথম চারশ রানের সীমানা স্পর্শ করল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ম্যাচ তাদের হতাশায় শেষ হলো হেরে যাওয়ায়। তাদের আগের সর্বোচ্চ ছিল ৩৮৯। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২০১৯ সালে সেই ম্যাচেও তারা হেরেছিল।
