Published : 29 Mar 2026, 01:45 AM
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া সবচেয়ে বড় প্রকল্পের কাজ রয়েছে শেষ পর্যায়ে; এখন এর পরিচালনা আর নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে ৯৫ শতাংশ শেষ হয়েছে।
নগরবাসীও বলছেন, জলাবদ্ধতা আগের তুলনায় কমেছে। অতীতের মত দীর্ঘ সময় ধরে এখন আর পানি জমে থাকে না। কমে এসেছে জলাবদ্ধ এলাকার সংখ্যাও।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর ৩৬টি খাল আর স্লুইস গেইটসহ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। কিন্তু এ খাতে তাদের বরাদ্দ নেই। নেই স্লুইস গেইট পরিচালনার মত জনবলও।
দীর্ঘমেয়াদে জলাবদ্ধতা দূর করতে নগরীর বাকি ২১টি খাল ঘিরে প্রকল্প গ্রহণ, কর্ণফুলী নদীর একাংশ ড্রেজিং করা, পুকুর খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন প্রকল্প এবং নতুন কিছু ড্রেন নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে গেলে চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
“বাকি ২১টি খালের সংস্কারে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করা হচ্ছে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যে একাধিক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। কোরিয়া, জাপান ও যুক্তরাজ্যের একাধিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করছি।”
৯৫ শতাংশ কাজ শেষ
নগরীর ৫৭টি খালের মধ্যে ৩৬টি নিয়ে ২০১৭ সালের ৯ অগাস্ট একনেকে জলাবদ্ধতা নিরসনের মেগা প্রকল্প অনুমোদন হয়। পরের বছর ২৮ এপ্রিল নগরীর চশমা খালের আবর্জনা অপসারণের মধ্যে দিয়ে এটির কাজ শুরু করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। প্রকল্পটির পূর্ত কাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৫,৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্প সমাপ্তের সময় ধরা হয়েছিল ২০২৩ সালের জুন। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে সংশোধন শেষে প্রকল্প ব্যয় আরো ৩ হাজার ১০ কোটি টাকা বেড়ে হয় মোট ৮,৬২৬ কোটি টাকা। মেয়াদ ঠিক করা হয় ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ১৬৩ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ, ১১৫টি সেতু ও কালভার্ট, ২৭টি সিল্ট ট্র্যাপ, ছয়টি রেগুলেটর নির্মাণ, ২৩ দশমিক ২০ কিলোমিটর নতুন নালা, ৩৬ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার খালের পাশে সড়ক নির্মাণ এবং ৯০ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নালা সম্প্রসারণ।

চলতি মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ। এর মধ্যে ২৬টি খাল শতভাগ এবং ৭টি খালের ৮৭-৯৭ শতাংশ কাজ শেষ। বাকি তিনটির মধ্যে রামপুর খালের কাজও ৭৫ শতাংশ শেষ।
খালের চিত্র
নগরীর অন্যতম প্রধান খাল হচ্ছে চাক্তাই খাল। কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি নগরীতে নৌ বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম ছিল অতীতে।
দুই দফায় চাক্তাই খালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, খালে জোয়ারের সময় পানি প্রবাহ স্বাভাবিক আছে। কর্ণফুলী সংলগ্ন অংশে কিছু নৌকা চলাচল করে। তবে ভাটার সময় খালের বিভিন্ন অংশে পানি কমে গেলে দুই পাশে তলার মাটি দেখা যাচ্ছে। খালটির নানা অংশে পাড়ের মানুষজনকে ময়লা আবর্জনা ফেলতেও দেখা গেছে।
চাক্তাই খালের তীরবর্তী খাতুনগঞ্জ হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০২৫ সালে ও তার আগের বছর চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ-আছাদগঞ্জে জলাবদ্ধতা হয়নি। তবে বর্ষায় দুয়েকদিন স্লুইস গেইট সময়মত বন্ধ না করায় পানি উঠেছে। যদিও তাতে আড়তের ক্ষতি হয়নি।
“২০০৩-০৪ সালের দিকে তলা পাকা করার পর থেকে চাক্তাই খালে মালবাহী বড় নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নদীর কাছাকাছি অংশে কিছু ছোট-মাঝারি নৌকা চলত। এখন স্লুইস গেইটের কারণে সেটা আরো কমেছে।”

অদূরে পাথরঘাটা আশরাফ আলী রোডে ভাঙা পোল অংশে কলাবাগিচা খালে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দক্ষিণ পাশের অংশে খাল পাড়ে সড়ক নির্মাণ কাজ শেষ। তবে ওই সড়কে পাশের বিভিন্ন দোকানের মালপত্র ও কিছু রিকশা ভ্যান রাখা।
খালের উত্তর অংশে দুই পাড় ঘেষেই বিভিন্ন স্থাপনা থেকে গৃহস্থালি তরল বর্জ্য খালে পড়ছে সরাসরি। পাথরঘাটার কলাবাগিচা ও শেখ পাড়া এলাকায় ওই খালের বিভিন্ন অংশে আবর্জনা জমে থাকতে দেখা গেছে।
এলাকার বাসিন্দা বেলাল বললেন, “খালের মুখ পরিষ্কার, কিন্তু ভেতরের দিকে সব জায়গায় চওড়া এক রকম না। সরু অংশে বাসাবাড়ি থেকে ফেলা ময়লা জোয়ার-ভাটায় সামনে পিছনে হয়। কিন্তু খালেই জমে থাকে।”
কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী মেরিনার্স রোড অংশে মনোহরখালী খাল ও টেকপাড়া খালের প্রবেশমুখ পরিষ্কার। সেখানে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক আছে।
বাকির খাতায় দুই
৩৬টি খালের মধ্যে শুধু হিজরা খালের পাড়ে জমি অধিগ্রহণ ও খাল দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা অপসারণ কাজ বাকি ছিল। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এই কাজ শুরু হয়েছে।
নগরীর লালখান বাজার থেকে জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, কাপাসগোলা ও শুলকবহর হয়ে চাক্তাই খাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই খাল।

সিডিএ’র সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এখন হিজরা খালের কাজ শুরু হয়েছে। এ
খালের দুই পারে সরকারি খাস জমি দখল করেও অবৈধ স্থাপনা হয়েছে। বড় বড় ভবনের অবকাঠামো ভাঙার কাজ চলছে। তবে প্রকল্প নির্ধারিত সময় আগামী জুনের মধ্যে এই খালের কাজ শেষ হবে না। আরো কিছু সময় লাগবে। বরাদ্দের সংকটও আছে।
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ আনোয়ারুল নজরুল বলেন, “সরকারি অর্থ বরাদ্দ চাইলেই সাথে সাথে পাওয়া যায় না। কিছু সময় লাগে। খালের কাজ চলছে।”
সবশেষ তথ্য অনুসারে, হিজরা খালের সংস্কার কাজের অগ্রগতি ৩২ শতাংশ।
অন্যদিকে নগরীর জামালখান খালের কাজ শেষ হয়েছে ৫৮ শতাংশ। জামালখান, রহমতগঞ্জ ও হেমসেন লেন অংশ ঘুরে খালের কাজ পুরোদমে চলতে দেখা গেছে।
পরিচালনা হবে কীভাবে?
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) সদ্য সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, জলাবদ্ধতা নিয়ে সিডিএ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষে তারা সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু খালগুলো এবং এসব অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি, জনবল এবং আর্থিক সামর্থ্য সিটি করপোরেশনের নেই। এছাড়া চট্টগ্রাম নগরীর জন্য একটি স্মার্ট সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম লাগবে।

সিডিএর সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্প মেয়াদ পর্যন্ত এবং এরপর আরো এক বছর আমরা সিটি করপোরেশনের জনবলকে স্লুইস গেইটসহ অন্যান্য অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষিত করব। এরপর তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
“এ কাজে কর্মচারীদের বেতন ও বিদ্যুৎ বিলসহ সিটি করপোরেশনের পরিচালনা বাজেট লাগবে। নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিং করতেও তাদের বাজেট প্রয়োজন হবে।”
এ বিষয়ে সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, খাল খনন প্রকল্প শেষ হলে এর হস্তান্তর এবং পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?
নগরীর নদী-খাল রক্ষায় সামাজিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত শাহরিয়ার খালেদ বর্তমান সিটি মেয়রের জলাবদ্ধতা নিরসন বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, “এই প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ হলে নগরীতে জলাবদ্ধতা থাকবে না। ভবিষ্যতের জলাবদ্ধতাহীন নগরীর জন্য আমরা পরিকল্পনা দেব।
“নগরীর অবশিষ্ট ২১টি খাল উদ্ধারে প্রকল্প লাগবে। বর্ষাকালে ভারি বৃষ্টির সাথে অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারের সময় স্লুইস গেইট বন্ধ রাখতে হবে। তখন খালের পানি ধারণের জন্য ‘ওয়াটার রিটেনশন পন্ড’লাগবে। কিছু নতুন ড্রেন করতে হবে। বর্ষা বাদে বছরের অন্য কোনো সময় খালের মেইনটেনেন্স কাজ করতে হবে, সেটাও ঠিক করতে হবে।”

এখন পর্যন্ত যেসব খালের কাজ হয়েছে, সেগুলোর কোনো কোনোটিতে আবার ময়লা ও মাটি পড়ে তলা ভরাট হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “কৃষ্ণখালসহ দুটি খালের স্লুইস গেটে নৌচলাচলের পথ নেই। কোথাও কোথাও খালের পাড়ে পুরোপুরি রাস্তা করা সম্ভব হয়নি। ১৫ ফুটের কম প্রশস্ত সড়ক আছে কয়েকটি স্থানে। সেসব জায়গা থেকে আবর্জনা বের করতে লংবুম মুভ করতে পারবে না। চাক্তাই খালের দুয়েকটি পয়েন্টে প্রতিরোধ দেয়ালের অবস্থা ভালো না।
“কিছু স্থানে রাস্তা ও নালা থেকে বাড়ির উচ্চতা কম। তাই বর্ষা ছাড়াও ওই এলাকায় বাড়িঘরে পানি ঢুকে যায়। আশা করি, সিটি করপোরেশন যখন বুঝে নেবে, তখন সব বিষয় ভালোভাবে দেখে খালগুলোর দায়িত্ব নেবে।”

পরিবেশবাদী সংগঠন পিপল’স ভয়েসের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্পের কাজ যত আগাচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে জলাবদ্ধতার প্রকটতা তত কমছে। কিন্তু এবারও অতি ভারি বর্ষায় কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। তাই পরিকল্পনা করতে হবে ভবিষ্যত বিবেচনায় নিয়ে।
“শহরের উন্মুক্ত জলাভূমি যেমন বিল ও নিচু জমি যেভাবে আছে, সেভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। পুকুরগুলো অক্ষত রাখতে হবে। তা না হলে শহরের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। আর পাহাড় কাটা থামাতে না পারলে খালগুলো আবার ভরে উঠবে।”
খাল-নালায় বর্জ্য ফেলা থামানোও অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি। এজন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী সংগ্রহ পদ্ধতি চালু করার পরামর্শ তার।
পাশাপাশি তিনি প্রায় বিলুপ্ত নগরীর বাকি ২১টি খাল উদ্ধারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
সিডিএ’র সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, “কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত অংশে ড্রেজিং হয়নি। সেখানে নদীর গভীরতা কমে গেছে। সেখানে ড্রেজিং না হলে নদীর ওই অংশের সংলগ্ন এলাকাগুলোতে জোয়ারের পানি আটকানো প্রবেশ আটকানো যাবে না।”
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ৭৫% নিরসন হয়েছে: সরকার
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা: প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে, 'মুক্তি' মিলবে কবে?
টানা বৃষ্টিতেও চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা না হওয়া বড় সাফল্য: ফারুক ই আজম
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা: 'প্রকল্পগুলোর প্রয়োজনীয়তা ভেবে দেখা হবে'
কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা
অতি ভারি বৃষ্টিতেও ডোবেনি চট্টগ্রাম নগরী
টানা বৃষ্টিতেও চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা না হওয়া বড় সাফল্য: ফারুক ই আজম
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার জন্য দায়ী আগের মেয়র ও সিডিএ চেয়ারম্যানরা