০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

ভাঙচুর, দখল: ভাবমূর্তি ও জনআস্থার সংকট

সাম্প্রতিক ভাঙচুর-দখল কি বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি ডিসেম্বরের রাজনৈতিক উত্তেজনা সামনে রেখে বড় অস্থিরতার আলামত?

ভাঙচুর, দখল: ভাবমূর্তি ও জনআস্থার সংকট

২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটে।

শুভ কিবরিয়া শুভ কিবরিয়া

Published : 01 Oct 2026, 08:18 PM

Updated : 01 Oct 2026, 08:18 PM

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত কয়েক দিনে সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে যেসব খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেগুলো স্বস্তিদায়ক নয়। তবে উদ্বেগের জায়গাটি শুধু প্রকাশিত খবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষ তার নিজের চারপাশের পরিস্থিতি থেকেও দেশের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পায়। রাস্তায়, পাড়া-মহল্লায়, কর্মক্ষেত্রে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যা ঘটে, সেসব অভিজ্ঞতাও নাগরিকের নিরাপত্তাবোধকে প্রভাবিত করে।

তাই মানুষ এখন শুধু ভাবছে না দেশে কী ঘটছে, তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও ক্রমে বড় হয়ে উঠছে, সামনে কী ঘটতে পারে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতাও কি বাড়বে? সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কি বিচ্ছিন্ন কিছু, নাকি এর মধ্যে আরও বড় কোনো অস্থিরতার পূর্বাভাস আছে? সামনে ডিসেম্বর। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি ও আইনগত প্রক্রিয়ায় কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

তবে এই প্রেক্ষাপটে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে, সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সংঘাত মোকাবিলায় রাষ্ট্র কি যথেষ্ট প্রস্তুত? রাজনৈতিক মতবিরোধ যদি রাস্তায় সংঘাত, ভাঙচুর ও দখলে রূপ নেয়, তাহলে তা নিয়ন্ত্রণ করার মতো আইনশৃঙ্খলা সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা কি যথেষ্ট আছে?

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু বর্তমানের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্ন নয়, এগুলো ভবিষ্যৎ নিয়েও মানুষের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এগুলো কি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি সামনে আরও বড় কোনো অস্থিরতার আলামত, এই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্নটি উপেক্ষা করারও সুযোগ নেই।

গত কয়েক দিনে ঢাকায় ভাঙচুর, লুটপাট, জবরদখলের চেষ্টা ও হামলার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটে। পরদিন মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান হাউজিং এলাকায় একটি সম্পত্তি দখলের চেষ্টা এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ে একটি ভবনে হামলার অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা ও ভাঙচুরের খবর আসে। কয়েকটি ঘটনায় পুলিশ গ্রেপ্তারও করেছে।

ঘটনাগুলো আলাদা। এগুলোর পেছনের কারণও এক নয়। কোথাও সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, কোথাও দখলের অভিযোগ, কোথাও হামলা ও ভাঙচুর। ফলে সব ঘটনাকে একই সূত্রে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। কিন্তু এসব ঘটনার একটি সাধারণ দিক উপেক্ষা করা যায় না, আইনানুগ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দলবদ্ধ শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ।

উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। এসব ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কার কী ধরনের ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া উচিত। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে। অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের আগেই যে প্রশ্নটি সামনে আসে, সেটি হলো, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কীভাবে এত বড় দল নিয়ে কোনো সম্পত্তি বা প্রতিষ্ঠানে হামলা কিংবা দখলের চেষ্টা করার সাহস পায়? কোথাও কোথাও পুলিশের উপস্থিতিতেই এমন ঘটনা ঘটেছে। সেটি শুধু আতঙ্কের নয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

কোনো সমাজে অপরাধ ঘটতেই পারে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের একটি অংশ হলো অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুত তদন্ত করা, অপরাধী শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা। কিন্তু কোনো অপরাধ যদি প্রকাশ্যভাবে, দীর্ঘ সময় ধরে এবং অনেক মানুষের উপস্থিতিতে ঘটে, তখন প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। তখন শুধু অপরাধীর পরিচয় নয়, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাস্থলে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পরে এ বিষয়ে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পুলিশের দায়িত্বে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়; পাশাপাশি এ হামলার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে রাজনৈতিক অঙ্গনেও তোলপাড় শুরু হয়, যেখানে একাধিক দলীয় কমিটি বিলুপ্ত ও নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের পাশাপাশি ঘটনার তদন্তের মুখে এমনকি সংরক্ষিত আসনের এক সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশ পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। অবশেষে সেই সংসদ সদস্য পদত্যাগও করেছেন।

এখানে শুধু সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। বড় প্রশ্ন হলো, পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকার পরও যদি একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র লুট ও ভাঙচুর ঠেকাতে না পারে, তাহলে সাধারণ নাগরিক তার সম্পদ ও নিরাপত্তা নিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন? রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার ভিত্তি অনেকটাই এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করে।

একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা বা দখল নিয়ে বিরোধ থাকলে তার সমাধান হবে আদালতে, প্রশাসনের কাছে কিংবা আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। কোনো পক্ষ যদি মনে করে তার দাবি ন্যায্য, তার প্রতিকার পাওয়ার পথ আইন। কিন্তু আইনকে পাশ কাটিয়ে শক্তি প্রয়োগের পথ যদি কার্যকর হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতি শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠানের হয় না, দুর্বল হয়ে পড়ে আইনের শাসনের ভিত্তি।

রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি মানুষের আস্থায়। নাগরিক যদি বিশ্বাস করেন যে বিপদে পড়লে তিনি আইনের আশ্রয় পাবেন, তার সম্পত্তি বেআইনিভাবে দখল হলে প্রতিকার পাবেন এবং অপরাধী প্রভাবশালী হলেও আইনের আওতায় আসবে, তাহলে সমাজে একটি মৌলিক নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। উল্টো পরিস্থিতিও সত্য। মানুষ যদি দেখতে পায়, সংঘবদ্ধ লোকজন প্রকাশ্যে হামলা করছে, স্থাপনা ভাঙছে, সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করছে, অথচ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হতে পারে, আইনের চেয়ে শক্তি বেশি কার্যকর।

এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়া নির্বাচিত সরকারের অধীনে পরিচালিত হওয়া কোনো রাষ্ট্রের জন্যই ভালো নয়। কারণ জনআস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ে। দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত। কোনো দেশে বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধ ঘটতেই পারে। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ্য সহিংসতা, দখল, ভাঙচুর কিংবা আইন প্রয়োগে দুর্বলতার চিত্র তৈরি হলে দেশের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠে।

আরও বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এসব ঘটনার পেছনে যারা রয়েছে, তারা যদি কোনো ধরনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রভাবের আশ্রয় পায়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও যদি রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার নৈকট্যের কারণে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে সুবিধা পায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এতে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা যেতে পারে, ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে আইনের নাগাল এড়ানো সম্ভব।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আনুকূল্যে অপরাধ বা অন্যায়ের অভিযোগ থেকে কেউ যদি ছাড় পায়, তাহলে সেটি সমাজকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেয় না। এই সব কাণ্ডকীর্তি সাধারণ মানুষকে আরও ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে।

অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের অন্তত এতটুকু শিক্ষা দেয় যে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আইনভঙ্গের সংস্কৃতি কখনো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনে না। সাময়িকভাবে কোনো গোষ্ঠী সুবিধা পেতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এতে ক্ষতি হয় রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের। ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধের দায়মুক্তি যদি স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে অপরাধ শুধু বাড়ে না, দুর্বল হয় আইনের শাসন এবং ক্ষয়ে যায় জনআস্থা।

তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিচয় নয়, জবাবদিহির পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা। অপরাধের অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই থাকুক, তদন্ত হবে; প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে; আর প্রমাণ না থাকলে কাউকে হয়রানিও করা হবে না। রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা এখানেই, কাউকে অন্যায়ভাবে রক্ষা না করা, আবার কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্তও না করা।

রাজনীতি যদি সত্যিই জনকল্যাণের মাধ্যম হয়, তাহলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখানেই, ক্ষমতাবানকে রক্ষা করা নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো।

সামনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং নাগরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জনআস্থা ফিরবে তখনই, যখন মানুষ দেখবে, আইন সবার জন্য সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আতঙ্ক নয়, শেষ পর্যন্ত মানুষ চায় নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার মধ্যে স্বাভাবিক জীবন।

শুভ কিবরিয়া: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: kibria34@gmail.com