অর্থনীতির নোবেল, আস্থার সংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
কাজের চেয়ে কথা বেশি যেখানে, সেখানে কাঙ্ক্ষিত আস্থার পরিবেশ মিলবে কীভাবে? নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ডের তত্ত্বের নিরিখে আমাদের জবাবদিহিহীন শাসনব্যবস্থা ও ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা।
এবারের অর্থনীতির নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই হল ও মাইকেল উডফোর্ডের গবেষণা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, অর্থনীতি শুধু টাকা-পয়সার হিসাব নয়; এর বড় চালিকাশক্তি মানুষের আস্থা। মানুষ আগামীকালকে কীভাবে দেখছেন, তার ওপর নির্ভর করে আজ তিনি খরচ করবেন, সঞ্চয় করবেন, বিনিয়োগ করবেন, নাকি সব সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখবেন। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে: এই আস্থা মিলবে কোথা থেকে? মানুষ কাকে বিশ্বাস করবেন? বাজারকে, সরকারকে, নীতিনির্ধারকদের, নাকি প্রতিদিন বদলে যাওয়া রাজনৈতিক আশ্বাসকে? আস্থা তৈরির দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদদেরই। অথচ এই জায়গাতেই আমাদের রাজনীতি শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ। ফলে নোবেলজয়ীদের তত্ত্ব বাংলাদেশের বাস্তবতায় এসে যেন খেই হারিয়ে ফেলে।
অর্থনীতিকে আমরা সাধারণত আয়-ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে মাপি। এসব অবশ্যই জরুরি। কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে থাকে মানুষের মনোজগৎ—আশা, ভয়, অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা। একজন শ্রমিক যদি ভাবেন, আগামী মাসে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাহলে আজ বেতন হাতে পেয়েও তিনি কেনাকাটা কমাবেন। কোনো ব্যবসায়ী যদি আশঙ্কা করেন, ডলারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাবে কিংবা সরকারের নীতি আবার বদলে যাবে, তাহলে লাভের সম্ভাবনা থাকলেও নতুন বিনিয়োগে যাবেন না। অর্থাৎ অর্থনীতির চাকা চালাতে শুধু জ্বালানি নয়, চালকের সামনে রাস্তা আছে—এই বিশ্বাসও প্রয়োজন।
একটি সাধারণ পরিবারের কথা ভাবা যাক। পরিবারের মাসিক আয় ত্রিশ হাজার টাকা। বাড়িভাড়া, খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ মেটাতেই প্রায় সব টাকা চলে যায়। পরিবারের উপার্জনকারী যদি শোনেন, কর্মস্থলে ছাঁটাই হতে পারে, তাহলে নতুন পোশাক কেনা, বেড়াতে যাওয়া কিংবা ঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার পরিকল্পনা বাতিল করবেন। তার আয় এখনো কমেনি, কিন্তু ভবিষ্যতের ভয় বর্তমানের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে। বিপরীতে চাকরি থাকবে, বেতন নিয়মিত মিলবে এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে—এমন নিশ্চয়তা থাকলে তিনি কিছু খরচ করতে সাহস পাবেন।
বাংলাদেশে এই সম্পর্কের প্রভাব প্রতিদিন দেখা যায়। কোনো কারখানা বন্ধ হওয়ার গুজব ছড়ালে শুধু শ্রমিকেরাই উদ্বিগ্ন হন না; আশপাশের খাবারের দোকান, মুদি ব্যবসায়ী, পরিবহনচালক, বাড়িওয়ালা—সবার আয় কমে যেতে পারে। শ্রমিকেরা খরচ কমান, দোকানদার কম পণ্য তোলেন, পাইকারের বিক্রি পড়ে যায়। এক প্রতিষ্ঠানের অনিশ্চয়তা ক্রমে একটি এলাকার অর্থনীতিকে সংকুচিত করে।
বাজারদরের ক্ষেত্রেও প্রত্যাশা গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি মনে করেন, আগামী সপ্তাহে চাল, ডাল, তেল বা পেঁয়াজের দাম আরও বাড়বে, কেউ কেউ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনে মজুত করতে পারেন। ব্যবসায়ীরাও ভবিষ্যতে বেশি দামে পণ্য কিনতে হবে ভেবে আগেই দাম বাড়াতে পারেন। এতে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়ে। উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানির খরচ, পরিবহন সমস্যা ও সরবরাহের ঘাটতিও দাম বাড়াতে পারে।
এখানেই সরকারের দায়িত্ব। সরকার যদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়, অথচ বাজারে নিত্যপণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়ে, তাহলে ঘোষণার ওপর আস্থা থাকবে কীভাবে? মন্ত্রী যদি বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে আছে, আর ক্রেতা বাজারে গিয়ে দেখেন আগের টাকায় অর্ধেক ব্যাগও ভরছে না, তাহলে সরকারি বক্তব্য তার কাছে কৌতুক হয়ে দাঁড়ায়। পরিসংখ্যানের ভাষা আর রান্নাঘরের অভিজ্ঞতার মধ্যে যখন এত ব্যবধান, তখন মানুষের বিশ্বাস ক্ষয়ে যায়। বিশ্বাস ফেরাতে বক্তৃতার চেয়ে ফলাফল জরুরি। আস্থা কথায় নয়, কাজে অর্জিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিও আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। সুদের হার, ঋণপ্রবাহ এবং মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তের কারণ পরিষ্কারভাবে জানালে ব্যবসায়ী ও পরিবার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন। কিন্তু আগাম বার্তা তখনই কার্যকর, যখন কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকে। আজ এক নীতি ঘোষণা করে কাল ব্যাখ্যা ছাড়াই উল্টো পথে হাঁটলে বাজার বিভ্রান্ত হয়। নীতির ধারাবাহিকতা মানে একই সিদ্ধান্ত আঁকড়ে থাকা নয়; পরিস্থিতি বদলালে পরিবর্তন করা যায়, তবে তার যুক্তি স্বচ্ছ হতে হবে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ীর সামনে অনিশ্চয়তার তালিকা দীর্ঘ। ডলারের দাম কত হবে, আমদানির ঋণপত্র খোলা যাবে কি না, বিদ্যুৎ-গ্যাস নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, করনীতি বদলাবে কি না, ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যাবে কি না—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর না থাকলে বিনিয়োগ থমকে যায়। বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান ও পরিবারের আয়ও বাড়ে না।
রাজনীতিবিদদের বড় ব্যর্থতা এখানেই: তারা আস্থা চান, কিন্তু আস্থা অর্জনের আচরণ দেখান না। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতির বন্যা, ক্ষমতায় গিয়ে ব্যাখ্যার সংকট; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য, অথচ অনিয়মের অভিযোগে নীরবতা; আইনের শাসনের ঘোষণা, কিন্তু দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ভিন্ন আচরণ—এসব মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করে। মানুষ যদি মনে করেন, নিয়ম সবার জন্য সমান নয়, তাহলে তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর ভরসা হারান। আর প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও দৈনন্দিন লেনদেনের ঝুঁকি বাড়ে। রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা তাই কেবল নৈতিক গুণ নয়, অর্থনৈতিক সম্পদও।
আস্থা গড়ে ওঠে জবাবদিহি থেকে। সরকারি সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশ করতে হবে, ভুল হলে স্বীকার করতে হবে, দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে এবং আইন প্রয়োগে দল-মত না দেখতে হবে। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে শুধু ছোট দোকানদারকে ধমক দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না; সরবরাহশৃঙ্খল, আমদানি, মজুত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান, আবার ভোক্তাকেও যেন অসহনীয় মূল্য দিতে না হয়, সেই ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।
মানুষের আস্থা তৈরির আরেকটি শর্ত হলো সামাজিক নিরাপত্তা। বাংলাদেশে অসুস্থতা, চাকরি হারানো কিংবা সন্তানের শিক্ষার খরচ অনেক পরিবারকে ঋণ ও দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এমন পরিবার আয় সামান্য বাড়লেও স্বস্তি পায় না; তারা জানে, একটি দুর্ঘটনাই সঞ্চয় শেষ করে দিতে পারে। সাশ্রয়ী চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা, বেকারত্বের সময়ে সহায়তা এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হলে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারেন। তখন তারা শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যও অর্থ ব্যয় করতে পারবেন।
অবশ্য আস্থা মানে অন্ধ বিশ্বাস নয়। সরকার যা বলবে, মানুষ তা যাচাই না করে মেনে নেবেন—এমন সমাজ অর্থনীতির জন্যও স্বাস্থ্যকর নয়। দরকার যুক্তিসংগত আস্থা, যা গড়ে ওঠে প্রমাণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। নাগরিকেরা প্রশ্ন করবেন, সংবাদমাধ্যম তথ্য যাচাই করবে, বিরোধী দল নীতির সমালোচনা করবে, আর সরকার যুক্তি দিয়ে জবাব দেবে—এটাই গণতান্ত্রিক অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বাস্তব সমস্যাতেও আস্থা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে দরকার। বন্যায় ফসল নষ্ট হলে বা অতিবৃষ্টিতে সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরবরাহ কমে দাম বাড়তে পারে। সেখানে শুধু সুদের হার বাড়িয়ে সমাধান হবে না। দরকার সংরক্ষণাগার, ভালো সড়ক, দ্রুত পরিবহন, কৃষকের ন্যায্য মূল্য এবং বাজারে পণ্য পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা। একইভাবে, কোনো পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়লে আগে বুঝতে হবে ঘাটতি, আমদানি ব্যয়, পরিবহন সংকট, নাকি কৃত্রিম মজুত—কোনটি দায়ী। কারণ না বুঝে অভিযান চালালে সাময়িক প্রচার হতে পারে, স্থায়ী সমাধান হয় না।
বাংলাদেশের সামনে তাই কাজের তালিকা স্পষ্ট: কর্মসংস্থান বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বাসযোগ্য নীতি নেওয়া, ব্যাংক ও প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদদের গবেষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনীতি শুধু সংখ্যার খেলা নয়; মানুষের প্রত্যাশা ও সিদ্ধান্তও তার গতিপথ তৈরি করে। কিন্তু তত্ত্ব থেকে বাস্তবে যেতে হলে দরকার বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব। বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রম করেন, সঞ্চয় করেন, ঝুঁকি নেন, ব্যবসা গড়েন। তাঁদের ঘাটতি উদ্যোগের নয়; ঘাটতি এমন পরিবেশের, যেখানে পরিশ্রমের ফল এবং নিয়মের স্থায়িত্ব সম্পর্কে যুক্তিসংগত নিশ্চয়তা পাওয়া যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু অর্থনীতিবিদদের নয়, রাজনীতিবিদদেরও। মানুষকে আস্থা রাখতে বলার আগে তাঁদের আস্থার যোগ্য হতে হবে। বাজারে স্থিতি, বিনিয়োগে গতি এবং কর্মসংস্থানে প্রসার চাইলে প্রতিশ্রুতির বদলে দরকার সৎ শাসন, ধারাবাহিক নীতি, আইনের সমতা ও জবাবদিহি। মানুষের হাতে টাকা অর্থনীতিকে চলার শক্তি দেয়; ভবিষ্যতের ওপর আস্থা সেই শক্তিকে কাজে লাগায়। বাংলাদেশের রাজনীতি যদি এই সহজ সত্যটি বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নোবেলজয়ীদের তত্ত্ব বইয়ের পাতায় উজ্জ্বল থাকবে, আর বাস্তব অর্থনীতি আস্থার অভাবে বারবার হোঁচট খাবে।
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: chiros234@gmail.com
