Published : 06 Feb 2026, 03:03 PM
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ঝঙ্কার মোড়ে এক চায়ের দোকানে আড্ডায় দিচ্ছিলেন স্থানীয় শফিকুল আলম, তৈয়বুল ইসলাম, ইউসুফ হোসেনসহ কয়েকজন, যেখানে নির্বাচনি কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই বিএনপি প্রার্থীকে নিয়ে একের পর এক সিদ্ধান্ত আসছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে এক আড্ডার একজন পূর্ব ফরহাদাবাদের বাসিন্দা শফিকুল আলম যে প্রসঙ্গ টেনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নির্বাচনের প্রচার শুরুর পর থেকেই সবখানে ভোট নিয়ে আলোচনার প্রধান বিষয়-বিএনপি প্রার্থী ভোটে থাকছেন কিনা, সেটাই। একবার এক রকম সিদ্ধান্ত আসছে। আদালতের বারান্দায় ছুটতে ছুটতে বিএনপি প্রার্থীর অনেক সময় চলে গেছে।

“আদালত বলেছেন, তিনি ভোট করতে পারবেন। কিন্তু ফলাফল প্রকাশ হবে পরে। আমরা সাধারণ মানুষ আইনের বিষয়ে অত বেশি বুঝি না। তাই ভোটারদের মধ্যে এখনো এই বিষয়ে একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আছে।”
চট্টগ্রাম-২ সংসদীয় আসন ফটিকছড়িতে বিএনপি প্রার্থী ভোটে অংশ নিতে পারবেন, এই সিদ্ধান্ত এসেছে মঙ্গলবার। তার পরেই মূলত ভোটের মাঠ গরম হয়ে উঠেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ফটিকছড়ি আসনে ধানের শীষের সারোয়ার আলমগীরের সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার মুহাম্মদ নুরুল আমিন ও একতারা প্রতীকের বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী পাল্লা দেবেন বলে মনে করছেন ভোটাররা।
এই তিনজন ছাড়াও এখানে অন্য প্রার্থীরা হলেন- গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিম, ইসলামী আন্দোলনের মো. জুলফিকার আলী মান্নান, জনতার দলের মো. গোলাম নওশের আলী, স্বতন্ত্র প্রার্থী আহমেদ কবির ও জিন্নাত আকতার।
সেখানে ভোটারদের চাওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, ধুরুং খালের সংস্কার ও গ্যাস সরবারহের মত বিভিন্ন বিষয়।
এই আসনের মোট ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪৬৫ জন ভোটর ১৪০টি ভোট কেন্দ্রে ভোট দেবেন।

ভোট হলেও ফল ‘মিলবে না’
বিএনপি প্রার্থীর সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিত নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও আদালত থেকে ১৭ দিনে তিন দফা সিদ্ধান্ত এসেছে। বৃহস্পতিবারও এই বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী।
২৯ ডিসেম্বর রিটার্নিং অফিসার চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বাছাইয়ে বিএনপির সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন।
কিন্তু ঋণ খেলাপের অভিযোগ এনে তার প্রার্থিতার বিরোধিতা করে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন।
এ বিষয়ে শুনানি শেষে ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন আপিল মঞ্জুর করে সারোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা বাতিল করে।
প্রার্থীতা ফিরে পেতে সারোয়ার আলমগীর ১৯ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশনের এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
এরপর গত ২৭ জানুয়ারি হাইকোর্ট সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসির দেওয়া সিদ্ধান্ত স্থগিত করে। একই সঙ্গে তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ও ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

তারপর হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমিন। মঙ্গলবার আপিল বিভাগ তার লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে।
এই সিদ্ধান্তের পর সারোয়ার আলমগীরের আইনজীবী আহসানুল করিম জানান, সারোয়ার আলমগীর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। লিভ টু আপিল মঞ্জুর হওয়ায় আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা যাবে না।
জানতে চাইলে জামায়াতের প্রার্থী নুরুল আমিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপি প্রার্থী একজন ঋণ খেলাপি। আদালত মঙ্গলবার একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন। আদালত লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে ২৮ এপ্রিল শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
“আদালত বলেছেন, বিএনপি প্রার্থী যদি নির্বাচিত হন তাহলে গেজেট হবে ২৮ এপ্রিলের শুনানির সিদ্ধান্তের পরে। আর যদি অন্য কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হন তাহলে ফলাফলের গেজেট প্রকাশে কোনো বাধা নেই।”
বিএনপি প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই মুহূর্তে শুধু এটুকু বলব, আদালতের মাধ্যমে যারা এমপি হতে চায় ফটিকছড়ির ভোটাররা তাদের প্রত্যাখান করবে।”
ভোটারদের প্রত্যাশা
চট্টগ্রাম উত্তরের ফটিকছড়ি উপজেলাটি পাহাড় ঘেরা। আর উপজেলার মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে হালদা নদী। স্থানীয়দের কাছে ফটিকছড়ির দুঃখ হিসেবে পরিচিত ধুরুং খাল।
এখানকার ভোটারদের প্রত্যাশা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি আর শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেবা বৃদ্ধি। পাশাপাশি গ্যাস সংযোগও চান স্থানীয়রা।

এ আসনের নাজিরহাট পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মনির আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিভিন্ন প্রার্থীর পক্ষে তাদের দলের নেতাকর্মীরা বাড়ি বাড়ি এসে ভোট চাইছেন। আমাদের এলাকায় কিছু রাস্তা খুব খারাপ। সেগুলো সংস্কার করা দরকার।
“আর ধুরুং খাল আমাদের দুঃখ। গত বছর নামকা ওয়াস্তে খাল সংস্কার হয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ অংশ এখনো ভরাট হয়ে আছে। খালটা আগাগোড়া ভালোভাবে সংস্কার করা দরকার। এখনো পর্যন্ত পরিবেশ শান্তিপূর্ণ আছে। আমরা চাই সুষ্ঠুভাবে ভোট হোক।”
ফটিকছড়ির স্থানীয় এক সংবাদকর্মী বলেন, “গত দেড় বছরে ফটিকছড়িতে প্রায় ২০টির মত খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে রাজনৈতিক কারণে এবং বালু মহাল-দখল-চাঁদাবাজির জেরে ৭-৮টি খুন হয়। বাকিগুলো হয়েছে ব্যক্তিগত বিরোধসহ নানা কারণে।
“ফটিকছড়িবাসী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি চায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নাঙ্গলমোড়া, সুয়াবিল ও নাজিরহাট বাজারে তিনটি সেতুর খুব প্রয়োজন।”
ফটিকছড়ি উপজেলায় আছে ১৮টি চা বাগান এবং তিনটি রাবার বাগান। এই উপজেলায় বনাঞ্চলের পরিমাণ ৭৩ হাজার একর।
উপজেলার হারুয়ালছড়ির রাঙাপানি চা বাগানের ব্যবস্থাপক উৎপল বিশ্বাস বলেন, “বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চা শিল্পের উৎপাদন প্রায়ই ব্যাহত হয়। এতে জ্বালানি খরচ অনেক বেড়ে যায়। চা জাতীয় সম্পদ। এই শিল্পে গ্যাস লাইনের সংযোগ পাওয়া গেলে আমাদের সংকট অনেক কমে যাবে।”
রেজাউল করিম নামের একজন ভোটার বলেন, “আমাদের উপজেলায় সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের বিস্তারের সুযোগ থাকলেও ইতিপূর্বে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সেমুতাং ফিল্ডের গ্যাস পাইপলাইন ফটিকছড়ির উপর দিয়ে গেলেও এখানে গ্যাস সংযোগ নেই।
“এছাড়া ফটিকছড়ির উত্তর অংশ পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের দাবি দীর্ঘদিনের। আশা করি, ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার এসব চাহিদা পূরণে কাজ করবে।”
উপজেলার জাফতনগর জাহানারা মমতাজ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পল্লবী খাস্তগীর বলেন, “উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলো বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট প্রকট। ভালো প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব আছে। প্রান্তিক এলাকাগুলোতে শিক্ষক চাহিদা পূরণ করা গেলে শিক্ষার্থীরা খুব উপকৃত হবে।”
শেষ মুহূর্তে জমছে প্রচার
স্থানীয়রা বলছেন, আইনি জটিলতায় বিএনপির প্রার্থী প্রচার মাঠে বেশি সক্রিয় হতে পারেননি। তবে বুধবার থেকে তিনি পুরোদমে মাঠে আছেন।
বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর বলেন, “আমরা প্রচার বিলম্বিত হয়েছে, এটা সঠিক। তবে দলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটররা উজ্জীবিত। নির্বাচিত হলে একটি সমৃদ্ধশালী ও সন্ত্রাসমুক্ত ফটিকছড়ি গড়ে তুলব।
“ভোটারদের কাছে যাচ্ছি, তারা নিজেদের প্রত্যাশার কথা আমাকে বলছেন। সেসব বিষয়ে শুনছি। ফটিকছড়িতে শিল্পায়নের সুযোগ আছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীদের এনে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব। ফটিকছড়িকে চা নগরী হিসেবে গড়ে তুলব। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করব।”
বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ফটিকছড়ি কৌটের পাড় বৌদ্ধ ত্রিরত্নাংকুর বিহার সংঘদান অনুষ্ঠানে গিয়ে বিএনপির প্রার্থী বলেন, “যার যার ধর্ম সে পালন করব। আমি আগেও আপনাদের সাথে ছিলাম। এখনো আছি, ভবিষ্যতেও থাকব।”

এই উপজেলায় মাইজভান্ডার দরবার শরীফের অবস্থান। তাই এই আসনের ভোটে মাইজভান্ডারের অনুসারীদের ভোট একটি ‘ফ্যাক্টর’। অতীতে একাধিকবার মাইজভান্ডারী পরিবারের সদস্য এই আসনে নির্বাচিত হয়েছেন।
এবারও ভোটের মাঠে আছেন সেই পরিবারের সদস্য বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারি। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ও বিএসপি এর সমন্বয়ে গঠিত ‘বৃহত্তর সুন্নি জোট’ এর নেতা।
তবে এবার ভোটের প্রচার দেরিতে শুরু করেছেন একতারা প্রতীকের এই প্রার্থী।
বৃহস্পতিবার নানুপুর, খিরাম বাজার, দৌলত মুন্সীর হাট, মোহাম্মদ তকির হাট, আবদুল্লাহপুর ও জাফতনগরে জনসংযোগ করেন তিনি। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন বৃহত্তর সুন্নি জোটের নেতারা।
দেরিতে প্রচারে নামার বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভান্ডারী বলেন, “অসুস্থ থাকায় একটু বিলম্ব হয়েছে। এতদিন আমার কর্মী সমর্থকরা মাঠে ছিল। এখন আমি পুরোদমে প্রচারে আছি।
“এবার মানুষ প্রতীক নয়, ব্যক্তি দেখে ভোট দেবে। ভোটাররা কালো টাকার মালিক, ব্যাংক লুটেরা, চাঁদাবাজদের প্রত্যাখান করবে। বাংলাদেশকে পরিবর্তন করতে হলে ভোটারদেরও মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।”
এদিন আজাদী বাজার, কোড়ের পাড় ত্রিরত্নাংকুর বিহার ও কাঞ্চননগরসহ বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মুহাম্মদ নুরুল আমীন। কানঞ্চনগরের তেমুহনী বাজারেও জনসংযোগ করেন তিনি।
কোড়ের পাড় ত্রিরত্নাকুর বিহারে সংঘদান অনুষ্ঠানে নুরুল আমিন বলেন, “ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই ফটিকছড়িবাসী। আমাদের লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন ও নিরাপদ ফটিকছড়ি গড়া। যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার নিয়ে শান্তিতে বসবাস করবে।”
নির্বাচনি প্রচার বিষয়ে জামায়াতের এই প্রার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রচারে কিছু সমস্যা হচ্ছে। কয়েকটি জায়গায় আমাদের ব্যানার কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আর জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীদের চাকরি করতে দিবে না, ঘর থেকে বের হতে দিবে না, বোরকা পড়তে বাধ্য করবে-এরকম কিছু অপপ্রচারও চালানো হচ্ছে।
“আমি মানুষের কাছে যাচ্ছি। তাদের কথা শুনছি। উন্নত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করা আমার অঙ্গীকার। নির্বাচিত হলে বৈষম্যহীনতা, ন্যায়পরায়তা ও সুবিচার নিশ্চিত করব।”