‘স্থায়ী ঠিকানা’ নেই, তাই নিয়োগপত্র পেলেন না ক্লীন্টন
“সরকারি অন্যান্য চাকরিতেও আবেদন করেছি। কিন্তু পরীক্ষা দিয়ে কী হবে, স্থায়ী ঠিকানার জটিলতায় তো চাকরি পাব না।”
নদী ভাঙনের পর অল্প যেটুকু পারিবারিক জমি ছিল, সেটা বিক্রি করে ২১ বছর আগে চট্টগ্রাম নগরীর ভাড়া বাসায় ঠাঁই নেয় পরিবারটি। পরিবারের একমাত্র ছেলেটির দিকেই তাকিয়ে বৃদ্ধ মা-বাবা ও ছোট বোন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডবলমুরিং থানার মেধাক্রমে দ্বিতীয় হয়েছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন নিয়োগের জন্য সুপারিশও।
কিন্তু চূড়ান্ত যাচাইয়ের সময় স্থায়ী ঠিকানা নিয়ে জটিলতার কারণে নিয়োগ হয়নি।
২১ বছর ধরে নগরীর ডবলমুরিং থানার মোগলটুলি এলাকার প্রফেসর গলিতে বসবাস করা ক্লীন্টন সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ডবলমুরিংয়ে ১২ জন নিয়োগের জন্য মনোনীত হন। এরমধ্যে এ বছর মার্চে ৫ জন এবং দ্বিতীয় দফায় গত মাসে আরো ছয়জন নিয়োগপত্র পান। শুধু আমিই নিয়োগপত্র পাইনি।
“আবেদনে এখন যে বাসায় আছি, আবেদনে সেটির ঠিকানা স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করেছিলাম। পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছিলেন, এটা যেহেতু আমার নিজের বাড়ি না, তাই নেগেটিভ রিপোর্ট হবে। উনারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, বিকল্প একটা স্থায়ী ঠিকানা দিতে। পরে আমি সন্দ্বীপের মামা বাড়ির ঠিকানা দিই। কিন্তু তারপরও আমি নিয়োগ পাইনি।”
পরে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন জানিয়ে ক্লীন্টন সাহা বলেন, “উনারা বলেছেন, এটা শিক্ষা থানাভিত্তিক চাকরি। এখানে স্থায়ী ঠিকানা না হলে নিয়োগ হবে না।”
ক্লীন্টন সাহা জানান, তার দাদার বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়ায়। কয়েকবার নদীভাঙনের কারণে তাদের বাড়ি ও দোকান বিলীন হয়ে গেছে। পরে পারিবারিক বসত ভিটার বাকি জমিও বিক্রি হয়ে যায়। এরপর ২১ বছর আগে তার বাবা নারায়ন সাহা স্ত্রী, তিন মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন।
সেই থেকে পরিবারটি সেখানেই ভাড়া বাসায় থাকছে।
ক্লীন্টন সাহা বলেন, “যেহেতু আদি বাড়িতে ভিটা ও ঘর নেই, তাই এখন পর্যন্ত যত চাকরির আবেদন করেছি, সেগুলোতে এই বাসার ঠিকানাই দিয়েছি।
“আমি মেধার ভিত্তিতে চাকরির জন্য চূড়ান্তভাবে মনোননীত হয়েছি। শুধু স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় নিয়োগপত্র পাইনি। আমার চাকরিটা পরিবারের জন্য খুব প্রয়োজন।”
তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ক্লীন্টন সাহা। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোনও লেখাপড়া শেষ করেছেন। বৃদ্ধ মা-বাবা ও এক বোন নিয়ে এখন ক্লীন্টনের সংসার চলছে ভাই-বোনের টিউশনের আয়ে।
তিনি বলেন, “বাবার অনেক বয়স হয়েছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চাকরি পেলে আমার সংসারটা চলবে। বোনটার বিয়ে দিতে পারব।”
ক্লীন্টন সাহা ২০১৪ সালে নগরীর পাঠানটুলী সিটি করপোরেশন বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং দেওয়ানহাট সিটি করপোরেশন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য মনোনীত ৫৫১ জনের মধ্যে থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দেওয়ায় ২৪ জনকে বাদ দেওয়া হয়। বাকি ৫২৭ জনের মধ্যে ৫২৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সহকারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য আমাদের এখানে মোট ৫২৭ জন জন মনোনীত হয়। তারমধ্যে ৫২৫ জনকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে।
“ক্লীন্টন সাহা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে নিয়োগের সুপারিশপত্র পেয়েছিল। উনিসহ দুজন কেন নিয়োগপত্র পাননি সেটা প্রতিবেদন আকারে আমরা অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। এর বাইরে কিছু বলা যাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে জানতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদায়ন বিষয়ক জেলা পদায়ন কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উনি (ক্লীন্টন সাহা) আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আপনাদের কাছ থেকে আজ শুনলাম। যোগাযোগ করলে উনার বার্তাটি মন্ত্রণালয়ে জানাতে পারব।”
ক্লীন্টন সাহা বলেন, “একটি লিখিত আবেদন নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়েছিলাম পরশু। উনারা বলেছেন, ঢাকায় যোগাযোগ করতে। সেখানে কার কাছে যাব আমি জানি না। মেধার ভিত্তিতে পাওয়া চাকরিটা আমার পরিবারের জন্য খুব প্রয়োজন।
“সরকারি অন্যান্য পদেও চাকরির আবেদন করেছি। কিন্তু এখন আর পরীক্ষা দিয়ে কী হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তো স্থায়ী ঠিকানার এই জটিলতায় চাকরি পাব না।”
