২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩

পূর্ণাঙ্গ রায়: জাতীয়করণ করা শিক্ষকদের চাকরিকালের যে ব্যাখ্যা দিল আপিল বিভাগ

জাতীয়করণের সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Oct 2026, 12:41 AM

Updated : 26 Oct 2026, 12:41 AM

জাতীয়করণ করা প্রাথমিক শিক্ষকদের আগের চাকরিকালের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে।

রোববার ২৯ পৃষ্ঠার এ পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়েছে।

জাতীয়করণ করা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকের নিচে রাখার রায় এসেছিল গত ২ জুলাই। 

রায়ে বলা হয়, ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি বা তার পরে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের চেয়ে জ্যেষ্ঠতায় এগিয়ে থাকবেন জাতীয়করণকৃত শিক্ষকরা।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ হাই কোর্টের রায় বাতিল করে ওই রায় দেয়।

বেঞ্চের অপর বিচারকরা হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।

এ রায়ের ফলে দেশের প্রায় ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগে আর কোনো আইনি বাধা থাকল না বলে সে দিন জানিয়েছিলেন আইনজীবীরা।

জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ যেভাবে

জাতীয়করণের সময় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

রায়ে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের বিধিমালার ৯(১) বিধি অনুযায়ী, কার্যকর চাকরিকালের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা গণনা করা হলেও জাতীয়করণের অব্যবহিত আগে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সর্বশেষ শিক্ষকের নিচে জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান নির্ধারিত হবে।

বিধিমালার ৯(২) বিধির আলোকে আপিল বিভাগ বলেছে, জাতীয়করণের আগের চাকরিকালের অর্ধেক গণনার সুবিধা কেবল জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেক্ষেত্রে কার্যকর চাকরিকাল সমান হলে শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের বছর এবং প্রয়োজনে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হবে।

তবে এই সুবিধা ব্যবহার করে আগে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া সরকারি শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা অতিক্রম করার সুযোগ নেই, বলা হয়েছে রায়ে।

জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিধিমালার ৯(১) বিধি নিয়ে হাই কোর্টের ব্যাখ্যা ভুল ছিল বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলেছে আপিল বিভাগ।

বিধিটিকে অযৌক্তিক ও সাংঘর্ষিক ঘোষণা করার সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্য নয় বলেছে সর্বোচ্চ আদালত।

আদালত বলেছে, জাতীয়করণের আগের চাকরিকাল গণনার সুবিধা সরকার নীতিগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দিয়েছে, যার আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা, সরকারের অতিরিক্ত আর্থিক দায় এবং সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত শিক্ষাসংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় নীতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এ সিদ্ধান্ত নেয়।

বিধিমালার ১০ বিধি অনুযায়ী, পেনশনযোগ্য চাকরিকাল নির্ধারণের ক্ষেত্রেও জাতীয়করণের আগের চাকরির মেয়াদের অর্ধেক কার্যকর চাকরিকাল হিসেবে গণনার বিধান রয়েছে।

প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদমর্যাদার দাবিও খারিজ

জাতীয়করণের আগে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের দাবি তুলে কয়েকজন শিক্ষক ওই পদমর্যাদা চেয়ে আবেদন করেছিলেন। 

তাদের দাবি ছিল, প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য তারা এমপিওভুক্ত বেতনের বাইরে মাসে অতিরিক্ত ৫০ টাকা পেতেন এবং তাদের পদোন্নতির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।

আপিল বিভাগ বলেছে, ২০০৮ সালের ১৪ জুলাইয়ের পরিপত্র অনুযায়ী প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।

কিন্তু আবেদনকারীরা সেই অনুমোদনের প্রমাণ দিতে পারেননি। শুধু অতিরিক্ত ৫০ টাকা পাওয়ার বিষয়টি কিংবা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে থাকা তথ্য বা সুপারিশ তাদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদমর্যাদা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

রায়ে বলা হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ১০ নভেম্বরের আদেশে আবেদনকারীদের ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। তারা ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করেননি।

একইভাবে, জ্যেষ্ঠতার আবেদন নাকচ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির আদেশ এবং পেনশনযোগ্য চাকরিকাল নিয়ে অর্থ বিভাগের ওই বছরের ১২ অগাস্টের আদেশও তারা চ্যালেঞ্জ করেননি।

এসব আদেশ চ্যালেঞ্জ না করে তাদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে গণ্য করার নির্দেশনা চেয়ে করা আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়, বলেছে আপিল বিভাগ।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, আবেদনকারীদের প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদমর্যাদা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্ট আইনগত ভুল করেছে।

কেন এই মামলা 

বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ১৯৭৪ সালের ‘টেকিং ওভার’ আইনের অধীনে এই স্কুলগুলোকে অধিগ্রহণ বা জাতীয়করণের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে জাতীয়করণের জন্য ২৬ হাজার ১৯৩টি বিদ্যালয় নির্বাচন করা হয়।

জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের চাকরি কীভাবে পরিচালিত হবে, তা ঠিক করে দিয়ে ২০১৩ সালে একটি সার্ভিস রুলস বা বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সংবিধানের ১৩৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই বিধিমালা চূড়ান্ত করতে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামতের প্রয়োজন ছিল।

পিএসসির ইতিবাচক মতামতের পর ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে এটি চূড়ান্ত করা হয় এবং শিক্ষকদের নিয়োগ ১ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়।

জাতীয়করণ বা অধিগ্রহণের সময় এই শিক্ষকদের বেশ কিছু বড় ছাড় ও সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সাধারণ বয়সসীমা (৩০ বা ৩২ বছর) তাদের জন্য শিথিল করা হয়। দ্বিতীয়ত, যাদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত বা পেশাগত যোগ্যতা ছিল না, তাদের যোগ্যতা অর্জনের জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হয়।

পাশাপাশি তারা বেসরকারি খাতে যে কয় বছর চাকরি করেছিলেন, তার ৫০ শতাংশ সময় এবং ভবিষ্যৎ অবসরকালীন পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও সিলেকশন গ্রেড সুবিধার ক্ষেত্রে গণনার সুযোগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কেউ যদি বেসরকারি স্কুলে ১০ বছর শিক্ষকতা করে থাকেন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে তার ৫ বছর গণনা করার বিধান রাখা হয়।

কিন্তু এরপর পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নিয়ে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্তদের সঙ্গে জাতীয়করণ হওয়া শিক্ষকদের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

‘অধিগ্রহণ করা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (চাকরির শর্তাদি নির্ধারণ) বিধিমালা, ২০১৩’ এর ৯(১) ধারায় বলা ছিল, সদ্য জাতীয়করণকৃত শিক্ষকদের অবস্থান সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত সর্বশেষ ব্যক্তির নিচে নির্ধারিত হবে।

কিন্তু অধিগ্রহণকৃত শিক্ষকরা তা মানতে চাননি। পূর্ববর্তী বেসরকারি চাকরির বিষয়টি তুলে ধরে তারা সরাসরি সরকারি নিয়োগপ্রাপ্তদের উপরে অবস্থান বা জ্যেষ্ঠতা দাবি করেন। সেই দাবিতে বিধিমালার ৯(১) ধারা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জাতীয়করণ করা বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।

শুনানি শেষে হাই কোর্ট ২০১৯ সালের ১১ মার্চ শিক্ষকদের পক্ষে রায় দেয় এবং বিধিমালার ৯(১) ধারার ওই নির্দিষ্ট অংশটিকে সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক ও অবৈধ’ ঘোষণা করে।

এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করে, যা ২০২২ সালের ২০ নভেম্বর মঞ্জুর করে আপিল বিভাগ। পাশাপাশি হাই কোর্টের ওই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয়।

লিভ টু আপিল মঞ্জুরের পর ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরাও আপিল বিভাগে আবেদন করেন।

চার বছর পর চূড়ান্ত শুনানি শেষে আপিল বিভাগ যে রায় দিল, তাতে বিধিমালার ৯(১) ধারা বহাল থাকল।

পুরনো খবর:

চার মাসেও মন্ত্রণালয়ে ‘কূল-কিনারা’ পাচ্ছেন না শিক্ষামন্ত্রী
আইনি জটিলতায় ৮৭ হাজার শিক্ষক পদে নিয়োগ-পদোন্নতি আটকা: শিক্ষামন্ত্রী
জাতীয়করণের প্রাথমিক শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতা: আপিল শুনানি শেষ, রায় ২ জুলাই
৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বাধা কাটল