মৌলভীবাজারের যে স্কুলে সন্তানদের সঙ্গে ক্লাস করেন অভিভাবকরাও
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলের ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যায় এগিয়ে এ বিদ্যালয়।
শুক্রবার-শনিবারও বন্ধ নেই। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে বিশেষ ক্লাস। এরপর নিয়মিত ক্লাস শুরু হয় বেলা ১২টায়; শেষ হয় বিকাল ৪টায়। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বিশেষ ক্লাসে মাঝে মাঝে বসতে হয় তাদের অভিভাবকদেরও।
অভিভাবকেরা শ্রেণিকক্ষে বসে দেখেন শিক্ষক কীভাবে পড়াচ্ছেন। পরে বাড়িতে সন্তানকে সেই অনুযায়ী পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন।
এভাবেই ব্যতিক্রমী নানা উদ্যোগের মধ্য দিয়ে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছে মৌলভীবাজারের ‘শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
শ্রীমঙ্গল শহরে অবস্থিত এ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭২২ জন। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলের ১৩৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে শিক্ষার্থী সংখ্যায় এগিয়ে এ বিদ্যালয়।
স্থানীয়দের কাছে বিদ্যালয়টি শুধু পরীক্ষার ফলাফলের জন্য নয়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কাব স্কাউটের সাফল্যের জন্যও পরিচিত। ২০২১ সালের ‘শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ (বাংলাদেশ স্কাউটসের কাব স্কাউট শাখায় (৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশু) অর্জিত সর্বোচ্চ সম্মাননা ও অ্যাওয়ার্ড) পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির ১২ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে সাতজন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা তারা ধরে রেখেছেন।
কোনো বছর সাতজন, কোনো বছর আটজন, আবার কোনো বছর নয়জন শিক্ষার্থী শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে।
২০২৫ সালে বিদ্যালয়টির সাতজন শিক্ষার্থী এ অ্যাওয়ার্ড অর্জন করে। গত ১০ বছরে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের ঝুলিতে জমেছে ১০০টিরও বেশি শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড।
ক্লাসে অভিভাবকরাও
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পঞ্চম শ্রেণির জন্য বিশেষ ক্লাস এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দেন।
বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শুক্রবার ও শনিবারও অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হয়। কোনো কোনো দিন সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত চলা এ ক্লাসে প্রধান শিক্ষক নিজেই পড়ান।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকদের ক্লাসে বসানোর উদ্দেশ্যও আলাদা। শিক্ষক কীভাবে একটি বিষয় বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তা অভিভাবকেরা নিজেরা দেখেন। পরে বাড়িতে সন্তানকে পড়াশোনায় সহযোগিতা করেন।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেবার্ঘ দেবের মা দেবদ্রুতি পাল চৌধুরী বলেন, “সকাল ৯টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাসের পর আবার ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস হয়। মাঝেমধ্যে আমাদেরও সন্তানের সঙ্গে ক্লাসে বসতে হয়। স্যার কীভাবে বুঝিয়ে পড়ান, আমরা সেটা দেখি এবং পরে বাসায় সহযোগিতা করি।”
তার ভাষায়, অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীদের কোনো বাড়তি টাকা দিতে হয় না।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদিবা হুসেনের বাবা শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক লোকমান হোসেনও বিদ্যালয়টির পড়ানোর পদ্ধতিকে অন্যরকম বলে মনে করেন।
তিনি বলেন, “এটি আর দশটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো নয়। এখানে শিক্ষার মান ভালো। আমার মেয়ের বেসিক অনেক ভালো হয়েছে। বিদ্যালয়ের নিয়ম ও পড়ানোর পদ্ধতি শিক্ষার্থীরা ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারলে পিছিয়ে পড়ার সুযোগ কম।”
শুধু পড়াশোনা নয়
বিদ্যালয়ে শুধু পাঠ্যবইনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয় না। শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে গুরুজনে মাথানত করার নৈতিক শিক্ষা তারা দেন।
এর বাহিরে নৃত্য, আবৃত্তি, সংগীত ও একক অভিনয়ের জন্য রয়েছে আলাদা কার্যক্রম।
স্কুলের সহকারী শিক্ষক প্রণবেশ চৌধুরী অন্তু বলেন, “আমাদের এখানে শুধু লেখাপড়া নয়, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত করা হয়। আবৃত্তি, নৃত্য ও সংগীতের আলাদা বিভাগ রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষককে এসব বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, গত এক দশকে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা শতাধিক ‘শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে বলে তাদের হিসাব রয়েছে। সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সাফল্য পেয়েছে।
১৩ শতাংশ জমিতে ৭২২ শিক্ষার্থী, বাড়তি জায়গার দাবি
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মহামায়া শর্মা বন্যা বলেন, “মাত্র ১৩ শতাংশ জমিতে আমাদের বিদ্যালয় অবস্থিত। অথচ এখানে শিক্ষার্থী ৭২২ জন। বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিভাবকেরা সন্তানকে ভর্তি করাতে আসেন।”
তার ভাষ্য, “জায়গার সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হয় না। আরও জায়গা থাকলে এবং আগের মতো দুই শিফটে ক্লাস চালু করা গেলে আরও শিক্ষার্থীকে ভর্তি করা সম্ভব হতো।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এমন সাফল্যের পেছনে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সহযোগিতাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন শিক্ষকরা।
শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা
প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, “কোনো পরিশ্রমের ফল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না। প্রয়োজন সময় ও ধৈর্য। আমাদের অতিরিক্ত পরিশ্রম তখনই সার্থক মনে হয়, যখন দেখি দেশের সবচেয়ে বেশি শাপলা কাব পাওয়ার গৌরব অর্জন করেছি কিংবা বৃত্তির ফলাফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান সেরা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “একুশ শতকের সুনাগরিক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতেই আমাদের এ প্রয়াস। শুধু ভালো ফলাফল নয়, নৈতিকতা, সংস্কৃতি, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বের গুণাবলিও তাদের মধ্যে তৈরি করতে চাই।”
সহকারী শিক্ষক লাভলী দত্ত বলেন, “আমি এ বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দেখছি, প্রধান শিক্ষক পঞ্চম শ্রেণির জন্য আলাদা ক্লাস করান। শুক্রবার-শনিবারও তিনি সময় দেন। এর সুফল আমরা পাই। এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে যাওয়া শিক্ষার্থীরা ভালো মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে।”
‘আমরা অন্য বিদ্যালয়েও উদাহরণ দিই’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি তাদের কাছে কিছুটা ব্যতিক্রম।
“বিদ্যালয়ের জায়গা কম, কিন্তু শিক্ষার্থী অনেক বেশি। শিক্ষকরা বিশেষ করে প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি পরিশ্রম করেন। আমরা বিভিন্ন সভা ও আলোচনায় এ বিদ্যালয়ের উদাহরণ দিই। এতে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও উৎসাহিত হচ্ছেন।”
তার মতে, বিদ্যালয়টির ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষকদের পরিশ্রমের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা, বিদ্যালয়ের অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থাও ভূমিকা রাখছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও শ্রীমঙ্গলের ৪৫টি সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২৯ জন প্রাথমিক বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছিল ৩৪ জন।
ওই অনুষ্ঠানে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও ছিল; যা দর্শকদের মন কাড়ে।
প্রশংসায় এমপি
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুনামের কথা তিনি শুনেছেন এবং বিদ্যালয়টির সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও দেখেছেন।
তিনি বলেন, “আমি বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাব। তবে অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও বলব, আপনারাও নিজ নিজ জায়গা থেকে ভালো কাজ করে সুনাম অর্জন করুন।”
