Published : 11 Oct 2025, 10:25 PM
চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে গেলে তা জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য ‘হুমকি হয়ে দাঁড়াবে’ বলে মন্তব্য করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
বন্দর এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, জনগণের প্রতিবাদ বন্ধ করে সরকার এই এক মাসের মধ্যেই বন্দর নিয়ে ‘বিদেশিদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করতে চাইছে’।
শনিবার বিকালে চট্টগ্রাম নগরীর জিয়া স্মৃতি যাদুঘর সেমিনার হলে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান আলোচকের হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বক্তব্য রাখছিলেন।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় সম্পদকে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর না করে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা ছাড়া কোনো দেশ বিশ্বে স্বাধীন মর্যাদা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে দাঁড়াতে পারে না।
“চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে গেলে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এ চক্রান্ত চট্টগ্রামসহ সারাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।”
গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি সামনে আসে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল-এনসিটির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন বিদেশিদের বন্দর ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করে নানা কর্মসূচি পালন করে।
দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম এনসিটি পরিচালনা করে আসছিল বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। গেল জুলাই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বেসরকারি অপারেটরটির সাথে চুক্তির মেয়াদ আর বাড়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। তারা বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ কন্টেইনার টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগের কথা জানায়। আর সেই কাজে দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম উঠে আসে। কিন্তু অন্তবর্তী সময়ের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এনসিটি পরিচালনার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
৭ জুলাই টার্মিনালটি আগামী ছয়মাস পরিচালনার জন্য দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয় নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে।
বৃহস্পতিবার রাতে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের আশেপাশের এলাকায় আগামী এক মাসের জন্য সব ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ও পথসভা নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ।
আনু মুহাম্মদ বলেন, “বন্দরের পরিচালনা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার একগুয়ে আচরণ করছে। প্রধান উপদেষ্টা এর বিরোধিতাকারীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন, এখন চট্টগ্রাম পুলিশ প্রশাসন একমাসের জন্য বন্দর এলাকায় যেকোনো সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
“দেখা যাচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের পরও বর্তমান সরকার সেই হাসিনার স্বৈরাচারী ভাষাতেই কথা বলছেন। অর্থাৎ জনগণের প্রতিবাদ বন্ধ করে সরকার এই একমাসের মধ্যেই বন্দর নিয়ে বিদেশিদের সাথে চুক্তি সম্পন্ন করতে চাইছে। বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে এ চক্রান্ত প্রতিহত করা হবে।”

আনু মুহাম্মদ বলেন, “সংবিধান সংস্কার কমিটি বিদেশের সাথে যেকোনো চুক্তি করার আগে বিভিন্ন ফোরামে পর্যাপ্ত আলোচনা করার সুপারিশ করেছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার তার নিজের গঠিত কমিশনের সুপারিশই মানছেন না। কোনো আলোচনা ছাড়া এমনকি বিনা দরপত্রে বিদেশি কোম্পানির সাথে বন্দর ইজারার চুক্তি করতে যাচ্ছে।”
ডিপি ওয়ার্ল্ড আবুধাবির কোম্পানি হলেও, বাস্তবে এটি ‘মার্কিন স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান’, এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এ অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক-সামরিক গুরুত্বের জন্য আমেরিকা বাংলাদেশের উপর নজর দিয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় নিরাপত্তার সাথে যুক্ত একটা জাতীয় সম্পদ কোনোভাবেই বিদেশিদের হাতে দেওয়া চলবে না।
এই অধিকারকর্মী বলেন, “রামপাল, রূপপুরের মতো বড় ধরনের প্রকল্পের বিষয় কথা বলতে গেলে আগের সরকারের তল্পিবাহক লোকজনেরা বলতেন, তিনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তাকে দিয়ে এই দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। তাই প্রশ্ন দরকার নেই, দরপত্র দরকার নেই, স্বচ্ছতার দরকার নেই। শেখ হাসিনা আছেন, তিনি সবকিছু দেখবেন।
“একটা পর্যায়ে তো শেখ হাসিনা চলেই গেলেন। মুহাম্মদ ইউনূস এলেন। এখন তার তল্পিবাহক যারা, তারাও বলছেন, উনি আছেন, কোনো অসুবিধা হবে না। এখনো কিন্তু ওই কথাটা আসছে, এই যে দরপত্র লাগবে না- মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বিশ্বব্যাংক বলেছে। এখনো কিন্তু দরপত্র ছাড়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে (বন্দর) দেওয়া হোক বলা হচ্ছে।”
নগরীর জিয়া স্মৃতি যাদুঘর সেমিনার হলে যৌথভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন আয়োজিত “জাতীয় সক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তা-চট্টগ্রাম বন্দর ও বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গ’ শীর্ষক এই সভা হয়।
সেখানে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, “বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দিলে দেশ উন্নত হবে, ইত্যাদি প্রচার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার এক্তিয়ারবহির্ভূতভাবে বন্দর ইজারার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।”
সাংবাদিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, “বর্তমান সরকার বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালটি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার ব্যাপারে ‘দৃঢ় প্রত্যয়’ ব্যক্ত করার পর, ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার আমলে চট্টগ্রাম বন্দর মার্কিন এসএসএ কোম্পানির হাতে ১৯৮ বছরের ইজারা দেওয়ার অসম চুক্তির কথাই মনে পড়ে।
“তখন বামপন্থীদের বন্দর রক্ষা কমিটি, তৎকালীন মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ চট্টগ্রামের সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলনের মুখে চুক্তিটি (সরকার) বাতিল করতে বাধ্য হয়। পূর্ব আফ্রিকার দেশ জিবুতি তাদের বন্দর পরিচালনার ভার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএআই) প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিয়ে কি রকম গ্যাঁড়াকলে পড়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাতিল করেও যে তাদের জাল থেকে এখনো বেরোতে পারেনি, তা দেখছি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এসব তথ্য-উপাত্ত ও সতর্কবার্তা কানে তুলতে নারাজ। বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ম্যান্ডেট বর্তমান সরকারকেকে দিয়েছে?"
শ্রমিক নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা চিন্তা না করে ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। তারা এই এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আন্দোলনরত কর্মচারীদের ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের করে যাওয়া ২০১৮, ২০১৯ শ্রমিক আন্দোলনবিরোধী কালো আইন প্রয়োগ করে শোকজ, সাময়িক বরখাস্ত করেছে এবং চাকরি হতে বরখাস্তের হুমকি দিচ্ছে।
“ইতিমধ্যে বন্দর এলাকায় বন্দরের অভ্যন্তরে ও বাইরে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের পক্ষ হতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে সভা সমাবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যা ২০২৪ সালের পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের চেতনা ও আকাঙ্ক্ষা বিরোধী।”
গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলন এর চট্টগ্রামের সংগঠক আসমা আক্তারের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য ফেরদৌস আরা রুমি, বন্দর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হালিমা খাতুন, বন্দর শাখা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খোকন, প্রকৌশলী সিঞ্চন ভৌমিক ও শ্রমিকনেতা রাহাতউল্লাহ জাহিদ।