Published : 17 Jun 2026, 05:41 PM
শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন কেবল শিশুর অধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং ‘সমাজের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত’ বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে চট্টগ্রামের একটি আদালত।
চট্টগ্রাম মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফছা ঝুমা বুধবার বাকলিয়ায় সাড়ে তিন বছরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় দিতে গিয়ে এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
মামলার রায়ে আসামি মনির হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন বিচারক।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, “শিশু ধর্ষণ একটি ঘৃণ্য অভিযোগ। মানবতার বিরুদ্ধে এক জঘন্যতম অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ শুধু শারীরিক ক্ষতি করে না, শিশুর মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকেও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে।
“শিশু সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও সুরক্ষার আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব। কোনো ব্যক্তি যখন একটি শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়, তখন সে শুধু একটি শিশুর অধিকার লঙ্ঘন করে না, বরং সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও আঘাত করে।”
বিচারক বলেন, “আসামি সমাজের কলঙ্ক। আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি স্বরূপ।”
তারপরও তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে কেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল, সেই ব্যাখ্যায় বিচারক বলেন, “তার পূর্ব কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। এটি তার প্রথম অপরাধ। মামলার সাক্ষ্য, প্রমাণ ও সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হল।”
রায় পড়ার আগে বিচারক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ভিকটিম শিশুটির দেওয়া জবানবন্দি, আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য, ভিকটিমের মেডিকেল রিপোর্ট এবং আসামির দোষ স্বীকার করে দেওয়া জবানবন্দির বিস্তারিত তুলে ধরেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এর ৯ (১) ধারা, উপধারা ও ২ (ঞ) ধারা এবং পেনাল কোডের ৩৭৫ ধারা তুলে ধরে বিচারক বলেন, “মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামি ভিকটিম শিশুর লজ্জাস্থানে আঙ্গুল প্রবিষ্ট করিয়েছে।
“আইন অনুসারে যোনিপথে পুরুষাঙ্গ বা অন্য যে কোনো অঙ্গ বা যে কোনো বন্তু প্রবিষ্টকরণ মানে হল ধর্ষণ। সাক্ষ্য প্রমাণে ধর্ষণ প্রমাণিত হয়েছে।”
আসামি মনির হোসেনের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী জে এম জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট। আইনে দুটি অপশন থাকলেও সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করে আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।”
তবে শিশুটির পরিবার এই রায়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। শিশুটির নানি, মা-বাবাসহ স্বজনরা রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
শিশুটির নানি রায় ঘোষণার পর কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমরা সরকারের কাছে ফাঁসি চেয়েছিলাম।”
মোট ৫ কার্যদিবসে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। ঘটনার ২৮ দিনের মধ্যে মামলার রায় দিল আদালত।
মামলার আসামি ৩২ বছর বয়সি মনিরের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার ঘারঘাটা এলাকায়। চট্টগ্রামে তিনি থাকতেন নগরীর বাকলিয়া এলাকার মিয়াখান নগরে। চেয়ারম্যান ঘাটা এলাকার একটি ডেকোরেটরের দোকানে চাকরি করতেন তিনি।
২১ মে বিকেলে সেখানে সাড়ে তিন বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে মনিরের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাকে আটক করে।
পুলিশ মনিরকে থানায় নেওয়ার চেষ্টা করলে এলাকাবাসী বাধা দেয়। তারা বলে, তারাই ওই যুবকের ‘শাস্তি’ নিশ্চিত করতে চায়।
দুই ঘণ্টা চেষ্টা করেও মনিরকে থানায় নিয়ে যেতে না পেরে পুলিশ সন্ধ্যায় টিয়ার শেল ছোড়ে। এক পর্যায়ে স্থানীয়রা জড়ো হয়ে পুলিশের গাড়ি ঘিরে ফেলে। দফায় দফায় সংঘর্ষে বাকলিয়া এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের একটি বড় ট্রাকে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এসময় সাংবাদিকসহ অন্তত ৪০ জন আহত হন।
সেদিন শিশুটিকে উদ্ধারের পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। শিশুটির বাবা বাকলিয়া থানায় মামলা দায়ের করেন।
সেই মামলায় ২২ মে বিকেলে মনির হোসেনকে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বক্কর সিদ্দিকের আদালতে হাজির করার হলে তিনি ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দেন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) হোসাইন মো. কবির ভূঁইয়া সে সময় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছিলেন, “ঘটনার দিন ওই শিশুটির বাবা ঢাকায় ছিলেন এবং মা ছিলেন গার্মেন্টেস কারখানায়। সেসময় শিশুটি তার নানির সাথে ছিল। এ সুযোগে মনির কৌশলে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা বা ধর্ষণ করে।”
দুই সপ্তাহ তদন্তের পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ গত ৪ জুন আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। মামলায় মোট ২২ জনকে সাক্ষী করা হয় ।
চট্টগ্রাম মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক সৈয়দা হাফছা ঝুমা ৯ জুন আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন। পরদিন শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ।
তিন কার্য দিবসে মোট ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে রোববার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। সোমবার আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে আসামি মনির হোসেন নিজেকে 'নির্দোষ' দাবি করেন। তবে তার পক্ষে কোনো সাফাই সাক্ষী উপস্থাপন করা হয়নি।
সবশেষ মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষে যুক্তি তর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে।
পুরনো খবর
বাকলিয়ার 'শিশু ধর্ষণ' মামলার রায় বুধবার
বাকলিয়ার শিশু 'ধর্ষণ' মামলা: যুক্তি-তর্ক শুনানি শুরু
বাকলিয়ায় 'শিশু ধর্ষণ' মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ
বাকলিয়ায় 'শিশু ধর্ষণ': দ্বিতীয় দিনে মাসহ ছয়জনের সাক্ষ্যগ্রহণ
বাকলিয়ায় সেই 'শিশু ধর্ষণ' মামলায় ৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ
বাকলিয়ায় 'শিশু ধর্ষণ': বাবা, নানা, নানি, খালার জবানবন্দিতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু
বাকলিয়ায় 'শিশু ধর্ষণ': আসামি মনিরের বিচার শুরু
বাকলিয়ায় 'শিশু ধর্ষণ': অভিযোগপত্র আমলে নিল আদালত
বাকলিয়ায় 'শিশু ধর্ষণ': আদালতে অভিযোগপত্র দিল পুলিশ
বাকলিয়ার ঘটনায় ধর্ষণের মামলা পরিবারের, হামলার মামলা করবে পুলিশ
বাকলিয়ায় সেই 'শিশু ধর্ষণ' মামলায় ৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ
চট্টগ্রামে শিশু 'ধর্ষণের' সন্দেহভাজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা, ঘেরা