Published : 21 Dec 2024, 01:40 AM
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নেওয়া বে-টামিনাল প্রকল্প ‘গতিহীন’ হয়ে পড়েছে।
এমনিতেই দীর্ঘসূত্রতায় পড়া প্রকল্পটি চূড়ান্ত হতে সময় লেগে যায় ১০ বছর। তবে চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকার পতনের ধাক্কায় প্রায় সাড়ে চার মাস ধরে থমকে আছে কাজ।
দেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানের বন্দরের কথা মাথায় রেখে ১০ বছর আগে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। এর তিন বছর পর প্রকল্পের সমীক্ষা যাচাই হলেও মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় গত বছরের নভেম্বরে।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বেশ কিছুকে ‘বিলাসী’ আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করছে।
এর মধ্যে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলেও নৌ পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ‘এটি চলমান থাকবে’।
প্রকল্পে বাস্তবায়নে জড়িত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে একটি পর্যালোচনা সভায় দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনেই এ প্রকল্প চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছনের অংশ থেকে রাণী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত প্রায় সোয়া ৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে হওয়ার কথা এ বে-টার্মিনাল প্রকল্প। এজন্য প্রয়োজনীয় জমির বেশিরভাগ বরাদ্দও মিলেছে, প্রকল্পের ‘ব্রেক ওয়াটার’ তৈরির জন্য বিশ্ব ব্যাংক ঋণ অনুমোদন করলেও নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি।
সেই কর্মকর্তা বলেন, “গত চারমাসে এ প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি বলতে কিছু হয়নি। বিশ্ব ব্যাংক ঋণ চূড়ান্ত করলেও সেটার চুক্তিও হয়নি।”
তিনি জানান, টার্মিনাল নির্মাণের জন্য মূল জায়গা পাওয়া গেলেও বন বিভাগের ৫১ একর জায়গা নিয়ে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছে।
কয়েক বছর আগেও চট্টগ্রাম বন্দরে নানা কারণে জাহাজজট এবং অপেক্ষমাণ সময় বেশি ছিল। বন্দরের বিদ্যমান টার্মিনালগুলোতে ১০ মিটারের বেশি ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) জাহাজ প্রবেশ করতে পারত না।
বেশি ড্রাফটের বড় জাহাজ (মাদার ভ্যাসেল) ভেড়ানো, চলমান বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে বন্দর সম্প্রসারণের বিষয়টি মাথায় রেখে ২০১৪ সালে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় ‘বে-টার্মিনাল’ প্রকল্প করার কাজ হাতে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

২০১৭ সালে বিদেশি একটি কোম্পানি এ প্রকল্পের কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমীক্ষা করে মহাপরিকল্পনা তৈরি করে। গত বছরের নভেম্বরে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১ হাজার ২২৫ মিটার দীর্ঘ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, ১ হাজার ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনালসহ মোট তিনটি টার্মিনাল তৈরির কথা রয়েছে।
৪ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি টার্মিনালের ১১টি জেটি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। যেখানে ১২ মিটার ড্রাফটের (জাহাজের পানির নিচের অংশের গভীরতা) এবং ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ ভেড়ানো সম্ভব হবে।
এর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় বিদেশি দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দুটি টার্মিনাল নির্মাণের চুক্তি হয়েছে ইতোমধ্যে।
৮৭০ একর জমিতে এ প্রকল্পের কথা চিন্তা করা হলেও এখন পর্যন্ত ৫৬৮ একর জায়গা বুঝে পেয়েছে বন্দর। চলতি বছরের মে মাসে এসব জমি বরাদ্দ হয়।
স্রোত থেকে বে টার্মিনালকে রক্ষার জন্য বাঁধ বা ‘ব্রেক ওয়াটার’ তৈরি ও খননকাজের জন্য বিশ্ব ব্যাংক জুন মাসে ৬৫ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে।
চট্টগ্রাম বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পেপার ওয়ার্কের মধ্যেই কাজ সীমাবদ্ধ থাকায় অনেক ক্ষেত্রে তা বোঝা যায় না।”
তিনি জানান, নভেম্বরের মাঝামাঝিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে এক সভায় বে টার্মিনালের অগ্রগতি নিয়ে কথা হয়। সেখানে নৌপরিবহন উপদেষ্টার উপস্থিতিতে এর প্রয়োজনীয়তাসহ বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে একটি বিশেষ সভা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সভায় প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতির পাশাপাশি ‘ব্রেক ওয়াটার’ নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে আলাপ হয়। বন্দর চেয়ারম্যান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা এটা নিয়ে আলাপ করেছি এবং এ প্রকল্পটি চলমান থাকবে।”

বে টার্মিনাল কী সুবিধা দেবে
চট্টগ্রাম বন্দরে গত বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ প্রবেশ করতে পারে। সেগুলো ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০টি একক কনটেইনার নিয়ে আসে।
বে-টার্মিনাল নির্মাণ হলে আরও বড় আকারের জাহাজ ভিড়তে পারবে আরও বেশি কনটেইনার নিয়ে। চার হাজার একক কনটেইনার বহনকারী জাহাজ ভিড়তে পারবে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভবিষ্যৎ বাণিজ্য বৃদ্ধির সাথে বন্দরের সক্ষমতার বিষয়টি মাথায় রেখে এ প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্মাণ কাজ দ্রুত শুরু করা দরকার।”
এই ধরনের টার্মিনাল না থাকায় কী সমস্যা হচ্ছে- তার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “এখন বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে খোলা পণ্য ছোট জাহাজের (লাইটার) মাধ্যমে পরিবহন করতে হয়। এছাড়া রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর বা কলম্বো বন্দরে ছোট জাহাজে নিয়ে বড় জাহাজে তুলে দিতে হয়।
“বে-টার্মিনাল হলে বেশি ড্রাফটের জাহাজ বেশি সংখ্যক কনটেইনার নিয়ে সরাসরি আসতে পারবে এবং মাঝখানে অন্য কোনো বন্দর ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে না। তাতে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতি আসবে।”
চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান জেএফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াও বলেন, “এই টার্মিনাল হলে বড় বড় জাহাজ সরাসরি বন্দরে আসবে, এতে সব অংশীজনরা লাভবান হবেন, বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে।”
প্রকল্পটি পুনর্মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “পর্যালোচনা করে নতুনভাবে ব্যয় নির্ধারণ করা দরকার, এতে খরচ কমলে দেশ উপকৃত হবে।”
পুরনো খবর...
বে টার্মিনালে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের প্রত্যাশা চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের
চট্টগ্রাম মাল্টিপারপাস টার্মিনাল: আবুধাবি পোর্টস গ্রুপের সঙ্গে এমওইউ
চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল নির্মাণে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই