Published : 16 Dec 2025, 12:19 AM
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য শামীম উদ্দিন খানের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে প্রশাসনিক ভবন আটঘণ্টা তালাবন্ধ রাখার পর বিজয় দিবসের কারণে অবস্থান কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
সোমবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, অবস্থান কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও তাদের আন্দোলন চলবে।
“এই বিশ্ববিদ্যালয় রাজাকারের টাকায় চলে না। প্রো-ভিসিকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “গত ১৪ তারিখ বুদ্ধিজীবী দিবসের অনুষ্ঠানে উপ উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) শামীম উদ্দিন খানের একটি মন্তব্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে, তাদের মূল্যায়ন হিসেবে আমরা বিষয়টিকে স্বাধীনতার বিপক্ষে হিসেবে ধরে নিয়েছি।
“তারা সকাল থেকেই আন্দোলন করছে আন্দোলন করার সময় তারা প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়েছে, কিছুটা ভোগান্তির শিকার হলেও পরবর্তীতে তারা আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছে। আগামীকাল বিজয় দিবস উদযাপন করার জন্য তারা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছে। তাদের সাথে যে আলোচনা হয়েছে তাতে দুপক্ষ সম্মত হয়ে অন্তত আগামীকালের জন্য তারা তাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছে।”
রোববার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলয় প্রশাসন আয়োজিত ‘মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধ এবং একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অধ্যাপক শামীর বক্তব্য ঘিরে এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক শামীম বলেন, “যে সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা আমাদের দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করছে, সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে; আমি মনে করি এটি রীতিমত অবান্তর। কারণ, ওই সময় তারা তাদের জীবন শঙ্কায় ছিলেন।”
তার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে রাতেই ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে তার সমালোচনা শুরু হয়।
পরে সোমবার সকালে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের’ ব্যানারে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সব ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে শামীম উদ্দিন খানকে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করতে বলেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, নারী অঙ্গনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের এ প্রতিবাদে অংশ নিতে দেখা যায়।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জিরো পয়েন্টের মেইন গেটে তালা দেওয়া হয়। তালা দেওয়ার পরপরই গেটের সামনে অবস্থান নেন স্থানীয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাঈদ বিন কামাল চৌধুরী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেই তালা দেওয়া হয়েছে, যাতে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পারে। এখানে এতজনের জমায়েত হয়েছে, তা আমরা আগে জানতাম না। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানো হচ্ছে।”
সন্ধ্যার পর প্রশাসনিক ভবনের কাছে ছাত্রশিবির এবং ছাত্রদল ও বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর কর্মীদের কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থান নিয়ে পাল্টাপাল্টি স্লোগান দিতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের মাঝখানে অবস্থান নেন বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা কর্মীরা।
পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে চাকসুর ভিপি ইব্রাহীম হোসেন রনি সেখানে গিয়ে বলেন, “প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়ার যে সংস্কৃতি আগে ছিল, তা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তালার কারণে সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছে। যাদের কোনো দাবি বা সমস্যা আছে, তারা আমাদের জানান। আমরা সেগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরব।”
পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুরোধে বিজয় দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের বিবৃতি
অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
সোমবার ইংরেজি, অর্থনীতি ও আইন বিভাগসহ বেশ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা পৃথক বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানান।
একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার ইতিহাস বিভাগের নবীনবরণ ও প্রবীণ বিদায় অনুষ্ঠানে অতিথি তালিকায় থাকা উপ–উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের উপস্থিতি বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন বিদায়ী শিক্ষার্থীরা।
সকাল ১০টায় অনুষ্ঠানের সূচি থাকলেও দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিদায়ী শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেননি। আগের রাতেই বিদায়ী শিক্ষার্থীদের ব্যাচ ‘হৃদয়ে উদ্দীপ্ত–৫৫’ সিদ্ধান্ত নেয়, উপ–উপাচার্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে তারা অনুষ্ঠান বর্জন করবে।
একপর্যায়ে বিভাগ থেকে জানানো হয়, উপ–উপাচার্য ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না। এরপর দুপুরের দিকে বিদায়ী শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং কার্যক্রম শুরু হয়।
ইতিহাস বিভাগের ২০২২–২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. অমিত হাসান বলেন, “ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা কোনো ধরনের ইতিহাস বিকৃতি মেনে নিতে পারি না। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিষয়ে উপ–উপাচার্য মোহাম্মদ শামীম স্যারের মন্তব্যের পর আমাদের মনে হয়েছে, তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে আমরা সেখানে ইতিহাসের শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থিত থাকতে পারি না।
“সে কারণে আমরা অনুষ্ঠান বর্জনের সিদ্ধান্ত নিই। পরে বিভাগ থেকে জানানো হলে যে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন না, তখন আমরা অনুষ্ঠানে যোগ দিই।”
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিবৃতিতে বলা হয়, “একজন শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং উচ্চ প্রশাসনিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছ থেকে যে নৈতিক দৃঢ়তা, মানবিক সংবেদনশীলতা ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা প্রত্যাশিত, ওই বক্তব্য তা উপেক্ষা করেছে। এ ধরনের মন্তব্য শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগকে খাটো করে এবং হত্যাকারীদের বয়ানকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে, যা বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নৈতিকতার পরিপন্থি।”
ইংরেজি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রিওন আল ফাহাদ বলেন, “ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নতুন প্রজন্মকে ভুল পথে নিতে পারে। তাই আমরা এ ধরনের মন্তব্যের বিরোধিতা করছি।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিবৃতিতে বলা হয়, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দার সঙ্গে জানাচ্ছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ–উপাচার্য শামীম উদ্দিন খান বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মত একটি জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ও ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা দায়িত্বজ্ঞানহীন ও নিন্দনীয়।”
এ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের আল সিয়াম বলেন, “শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মত গুরুত্বপূর্ণ দিনে দেওয়া বক্তব্য আমাদের কষ্ট দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে এমন মন্তব্য কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।”
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিবৃতিতে বলা হয়, “গতকাল ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামীম উদ্দিন খান কর্তৃক প্রদত্ত বক্তব্য আমাদেরকে গভীরভাবে বিস্মিত, ক্ষুব্ধ ও আহত করেছে।”
এ বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষার্থী মাহিম চৌধুরী বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড আমাদের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য। এ বিষয়ে দায়িত্বশীল একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এমন বক্তব্য আমরা প্রত্যাশা করি না। এই মন্তব্যে আমরা মর্মাহত ও হতাশ।”