১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আসামির পক্ষে ওকালতনামা দেওয়ায় চট্টগ্রামের আদালতে তুলকালাম

অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর নেজাম উদ্দিনের নামে আদালতে দুই আসামি দেলোয়ার হোসেন ও মো. নুরুর পক্ষে ওকালতনামা জমা দেওয়া হয়।

আসামির পক্ষে ওকালতনামা দেওয়ায় চট্টগ্রামের আদালতে তুলকালাম
আদালতে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের বিক্ষোভ

চট্টগ্রাম ব্যুরো

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 03 Dec 2024, 01:46 AM

Updated : 26 Aug 2026, 11:02 AM

চট্টগ্রামে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় করা এক মামলায় দুই আসামির পক্ষে জামিন আবেদন করে ওকালতনামা জমা দেওয়ার পর এ নিয়ে তুলকালাম হয়েছে।

সোমবার বিকেলে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় দুই আসামি দেলোয়ার হোসেন ও মো. নুরুর পক্ষে অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর নেজাম উদ্দিনের নামে আদালতে ওকালতনামা জমা দেওয়র পর এ ঘটনা ঘটে।

বিষয়টি জানতে পেরে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা ওকালতনামা দেওয়া আইনজীবী নেজাম উদ্দিনকে ঘেরাও করেন এবং সরকারি কৌসুলির পদ থেকে পদত্যাগ দাবি করে বিক্ষোভ করেন। 

পরে তার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে পদত্যাগের কথা লিখিয়ে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। যদিও আইনজীবী সমিতির সভাপতি বলছেন, এভাবে লিখিয়ে নিলে পদত্যাগ হয় না।

বিক্ষুদ্ধ আইনজীবীদের প্রতিবাদের মুখে সেই ওকালতনামা আবার প্রত্যাহার করা হয়। 

বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য নেজাম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলছেন, ওকালতনামা জমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। ওই দুই আসামি যুবদল কর্মী হওয়ায় তার একজন জুনিয়র না বুঝে ওকালতনামা জমা দিয়েছেন।

একই মামলায় আরো আট আসামিকে এদিন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। তবে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। 

গত ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীরকে জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়ার পর আদালত চত্বরে প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।

আদালতে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের বিক্ষোভ

আদালতে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীদের বিক্ষোভ

সংঘর্ষের মধ্যে আদালতের প্রবেশপথের অদূরে রঙ্গম কনভেশন হলের পাশের গলিতে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

সেদিনের ঘটনায় তিন স্থানে পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে আরো তিনটি মামলা করে পুলিশ। ওই তিন মামলায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো মোট ১৪০০ জনকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত ৩৯ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এর মধ্যে রঙ্গম কনভেনশন হলের সামনের রাস্তায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ যে মামলাটি করা হয়েছে, তাতে ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত পরিচয় আরো ৪০০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলার এজাহারে দেলোয়ার হোসেন ও মো. নুরুর নাম উল্লেখ আছে। তারা দুজনই নগরীর বাকলিয়া থানার মাস্টারপোল বউ বাজার এলাকার বাসিন্দা। 

তাদের নামে আদালতে জমা দেওয়া ওকালতনামায় আইনজীবী মো. নেজাম উদ্দিনের নামে ওকালতনামা স্টিকার ব্যবহার করা হয়। আর স্বাক্ষর করেন সানজিদা গফুর নামের আরেক আইনজীবী।  

আদালতে ওকালতনামা জমা দেওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে বেলা আড়াইটার দিকে আদালত ভবনের তৃতীয় তলায় মহানগর পিপি মফিজুল হক ভুঁইয়ার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা। 

তারা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর মফিজুল হক ভুঁইয়া ও অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর নেজাম উদ্দিনের পদত্যাগ দাবি করেন। প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীরা জানান, এসময় নেজাম উদ্দিনকে শারীরিকভাবেও লাঞ্চিত করা হয়। 

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সমিতির পক্ষ থেকে আমরা আগেই অনুরোধ করেছি আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ড ও এই সংক্রান্ত অন্য মামলাগুলোতে যেন কোনো আইনজীবী আসামিদের পক্ষে না দাঁড়ান। 

শুনানি শেষে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আসামিদের

শুনানি শেষে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আসামিদের

“সেটা না শুনে আজ একজন অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর হয়েও আসামির পক্ষে ওকালতনামা জমা দিয়েছেন নেজাম উদ্দিন। পরে বিক্ষুব্ধ আইনজীবীরা তার কাছ থেকে পদত্যাগের বিষয়ে একটি কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু ওভাবে পদত্যাগ হয় না। পরে ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা জেলা প্রশাসক বরাবর অ্যাডিশনাল প্রসিকিউটর নেজাম উদ্দিনকে প্রত্যাহারের দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছেন।” 

নাজিম উদ্দিন বলেন, “সমিতির অনুরোধের পরেও ওই অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটরের এ কাজে সমিতি ক্ষুব্ধ। তিনি মহাগর পাবালিক প্রসিকিউটরের জুনিয়র। তার এ কাজ করা ঠিক হয়নি।” 

জানতে চাইলে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর মফিজুল হক ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নেজাম উদ্দিন আগে আমার জুনিয়র ছিলেন। এখন তার নিজস্ব চেম্বার আছে। তিনি কোথায় ওকালতনামা দিয়েছেন, সেটা তার দায়িত্ব। আমার এতে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।” 

ওকালতনামা দেওয়ার বিষয়ে অতিরিক্ত পিপি নেজাম উদ্দিন বলেন, “ওকালতনামাটি আমার চেম্বার থেকে ২৮ নভেম্বর নেওয়া হয়। দেখেন সেখানে আমার স্বাক্ষর নেই। 

“আমার জুনিয়র একজন আইনজীবী সেটা দিয়েছেন। যে দুজন আসামির জন্য ওকালতনামা দেওয়া হয়েছে তারা যুবদলের কর্মী। আগেও দলের লোকজনের জন্য আমরা মামলা ফেইস করেছি। তাই দলীয় কারো অনুরোধে হয়ত আমার জুনিয়র না বুঝে ওকালতনামা দিয়েছেন।” 

নেজাম উদ্দিন বলেন, “যাদের জন্য ওকালতনামা দেওয়া হয়েছে তারা মুসলিম। যদি আসামিরা হিন্দু হত, তাহলে একটা বিষয় ছিল। কিন্তু কয়েকজন আইনজীবী আমার কোনো কথা না শুনেই এরকম আচরণ করেছেন। 

“তাৎক্ষণিক প্রচার করে দিয়েছে, আমি মামলার আসামিদের পক্ষে ওকালতনামা দিয়েছি। বিষয়টি ব্যাখ্যা করার সুযোগও কেউ দেয়নি। আমি অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর হওয়ায় কেউ কেউ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। আমি নিজেই আইনজীবী আলিফ হত্যার প্রতিবাদে সব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি।” 

এ বিষয়ে জানতে আইনজীবী সানজিদা গফুরের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। 

আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডের চারদিন পর তার বাবা জামাল উদ্দিন ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরো ১৫/১৬ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

আলিফের ভাই খানে আলম বাদী হয়ে ভাঙচুর, বিস্ফোরণ ও জনসাধারণের উপর হামলার অভিযোগে আরেকটি মামলা করেছেন। 

আলিফ হত্যার প্রতিবাদে বুধ ও বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম আদালতে বর্জন ও কর্ম বিরতি পালন করে আইনজীবীরা। বৃহস্পতিবার ও রোববার প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এ সংক্রান্ত মামলায় আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়াতে আহ্বান জানানো হয় আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে। 

আলিফের ভাই খানে আলমের করা মামলায় ৭০ জন হিন্দু আইনজীবীকে আসামি করা হয়েছে দাবি করে রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোট অভিযোগ করে, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ‘জামিন শুনানি ঠেকাতেই’ এই কাজ করা হয়েছে। 

যে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে চিন্ময় কৃষ্ণ বর্তমানে কারাগারে আছেন, সেই মামলায় মঙ্গলবার জামিন শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগে সোমবার আদালতে তুলকালাম হল।

হত্যা মামলায় নয় জন গ্রেপ্তার

আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যার ঘটনায় তার বাবার করা হত্যা মামলায় নয় আসামিকে সোমবার আদালতে হাজির করা হয়। 

তারা হলেন- আমান দাস, সুমিত দাশ, নয়ন দাশ, গগন দাস, বিশাল দাস, রাজীব ভট্টাচার্য্য, সনু মেথর, রুমিত দাস ও দুর্লভ দাস। 

আসামিদের চট্টগ্রামের ষষ্ঠ মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। শুনানির পর বিচারক কাজী শরিফুল ইসলাম তাদের গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন। 

আসামিদের আদালতে হাজির করার ও শুনানি শেষে নিয়ে যাওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয় আদালত এলাকায়। 

শুনানি শেষে আসামিদের নিয়ে যাওয়ার সময় আসামিদের উদ্দেশ্য উপস্থিত আইনজীবীদের একাংশ ক্ষোভ জানাতে থাকে এবং বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। 

পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে করা আরেক মামলায় ৮ আসামিকে চট্টগ্রামের প্রথম মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ।

এই আসামিরা হলেন- পার্থ চক্রবর্তী, অপূর্ব শীল, উজ্জল দাস ওরফে জনি দাস, অপু চন্দ্র সাহা, নিলয় দাস, ধ্রুব দাস, মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. নুরু। 

আদালতের বিচারক আবু বক্কর সিদ্দিক শুনানির পর তাদের সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন নয় আসামিকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও আট আসামির রিমান্ড মঞ্জুরের সত্যতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিশ্চিত করেছেন।