আবার শান্ত হয়ে গেছে শান্তর ব্যাট

০, ৭, ৮, ০, ৯, ৪ – সবশেষ ছয় ইনিংসে নাজমুল হোসেন শান্তর রান যেন টেলিফোনের ডিজিট।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনিকলকাতা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 31 Oct 2023, 12:22 PM
Updated : 31 Oct 2023, 12:22 PM

আউট হয়ে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। হতাশা, আক্ষেপ, বিস্ময়, সব মিলিয়েই একটা অনুভূতির ছাপ ফুটে উঠল তার মুখায়বে। এরপর একটু একটু করে এগিয়ে গেলেন ড্রেসিং রুমের দিকে। বলা ভালো, শরীরটাকে টেনে নিয়ে গেলেন কোনোরকমে। মনে হচ্ছিল, ব্যাটের ভারও যেন বইতে পারছেন না তিনি।

তা অবশ্য হওয়ারই কথা। নিশ্চুপ ব্যাটের চেয়ে ভারি কিছু তো ক্রিকেটে আর নেই!

০ ৭ ৮ ০ ৯ ৪ – সংখ্যাগুলোকে দেখে টেলিফোনের ডিজিট ভাবতে পারেন। আদতে সবশেষ ছয় ইনিংসে শান্তর রানের খতিয়ান এটি। একটিতেও দুঅঙ্ক ছুঁতে পারেননি। এই ছয় ইনিংস মিলিয়ে তার রান ২৮।

অথচ বিশ্বকাপের আগে গোটা বছরে, এমনকি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ পর্যন্তও তার ব্যাটে রানের খই ফুটেছে। ওয়ানডেতে এই বছর দেশের সফলতম ব্যাটসম্যান তিনি। দলের ব্যাটিংয়ে বড় নির্ভরতাও হয়ে উঠেছিলেন। বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত ১৪ ইনিংসে তার রান ছিল প্রায় ৫০ গড়ে ৬৯৮। বাংলাদশের আর কোনো ব্যাটসম্যানের তখন ৬০০ রানও ছিল না।

ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতায় দলের বড় সম্পদ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। আত্মবিশ্বাসের বিচ্ছুরণ ছিল তার ব্যাটে, তার কথায়, তার বিচরণে। দল ও বোর্ডও তাকে সেই স্বীকৃতি দিয়েছিল। বিশ্বকাপের আগে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে একটি ম্যাচে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার সম্মান পান তিনি। বিশ্বকাপে তাকে করা হয় দলের সহ-অধিনায়ক।

বিশ্বকাপের শুরুটাও দারুণভাবে করেন তিনি। ধারামশালায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে দলের জয়ে অপরাজিত থাকেন ৫৯ রানে। বিশ্বকাপ অভিষেকেই ফিফটি।

কে জানত, স্বপ্নময় শুরুর পর হানা দেবে দুঃস্বপ্ন!

যে মাঠে ফিফটি দিয়ে তার শুরু, সেখানেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আউট হয়ে যান প্রথম বলে। রিস টপলির বলে আলগা ড্রাইভ খেলে ধরা পড়েন স্লিপে।

একটি বাজে ম্যাচ ক্রিকেটে আসতেই পারে। কিন্তু সেই এক ম্যাচ প্রবাহিত হতে থাকে ম্যাচের পর ম্যাচে। চেন্নাইয়ে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষেও আলগা শট খেলে আউট হন গ্লেন ফিলিপসের অফ স্পিনে। ভারতের বিপক্ষে ওপেনারদের দারুণ শুরুর পর নির্ভার হয়ে ক্রিজে গিয়েও পারেননি ছন্দ খুঁজে পেতে। এবার ১৭ বলের অস্বস্তিময় উপস্থিতি শেষে বিদায় রবীন্দ্র জাদেজার জোরের ওপর করা বলে এলবিডব্লিউ হয়ে।

সবচেয়ে হতাশাজনক আউট সম্ভবত পরের ম্যাচটিতে। মার্কো ইয়ানসেনের লেগ স্টাম্পের বাইরের বলে আলতো করে ব্যাট ছুঁইয়ে ধরা পড়েন কিপারের গ্লাভসে। আরও একটি গোল্ডেন ডাক!

নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ইডেন গার্ডেন্সে রানের দেখা পাননি প্রথম ৮ বলে। এরপর দারুণ একটি পুল শটে চারের দেখা পান। একটু পর বল বাউন্ডারিতে পাঠান আরেকবার। মনে হচ্ছিল, আত্মবিশ্বাস কিছুটা ফিরে পাচ্ছেন। কিন্তু আসলে তা ছিল বিভ্রান্তি। আউট হয়ে যান ৯ রানেই। স্লিপে লোগান ফন ভিকের ক্যাচটি দারুণ ছিল। কিন্তু শান্তর শটও তো ছিল বাজে।

এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে এই ইনিংস। এবারও ক্যাচটি দারুণ। তবে ড্রেসিং রুমে ফিরে আউটের ভিডিও দেখলে শান্ত নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন, বলকে শরীরের কাছে আসতে দেননি তিনি। ব্যাট চালিয়ে দিয়েছেন একটু আগেই। সোজা কথায়, আরেকটি আলগা শট বা সফট ডিসমিসাল।

নন্দনকাননে বিভীষিকা!

তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শুরুটাও ছিল বিভীষিকাময়। প্রথম ১৫ ইনিংসে ফিফটি তো বহুদূর, ৪০ ছুঁতে পারেননি একবারও। তাকে নিয়ে তুমুল সমালোচনা, সামাজিক মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত সব ট্রল, কী হয়নি!

কিন্তু তখনও টানা এতটা বাজে সময় তিনি কাটাননি। ক্যারিয়ারের প্রথম তিন ইনিংসে দু অঙ্ক ছুঁতে পারেননি। এরপর দু অঙ্ক ছুঁতে এতটা লম্বা অপেক্ষা তাকে করতে হয়নি। এবার সেখানে টানা ৬ ইনিংসে দেখলেন না ১০ রানের মুখ।

বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপের একটি ইনিংস বাদ দিলে গোটা বছরে তিন নম্বরে ব্যাট করেছেন তিনি। বিশ্বকাপে এসে তিন-চারে টানাহেঁচড়া হয়েছে তাকে নিয়ে। ব্যাটিং অর্ডারের অস্থিরতার ব্যাপারটি তুলে ধরা যায় বটে। তবে এতটাই দুর্দশা তার ব্যাটিংয়ের যে, ব্যাটিং অর্ডার বা কোনো কিছুকেই আসলে দায় দেওয়ার উপায় নেই।

দায় শুধুই তার।

বিশ্বকাপের পর নতুন অধিনায়ক হওয়ার লড়াইয়ে সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন তিনিই। এখন দলে জায়গা ধরে রাখাই কঠিন!

শান্তর বিশ্বকাপ পারফরম্যান্স যেন বাংলাদেশ দলেরই প্রতীকী। প্রত্যাশার বেলুন চুপসে গেছে পুরোপুরি।