০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

পাইলট থেকে ক্রিকেটার, অনেক অপেক্ষার পর অভিষেকের দুয়ারে নাকভি

জন্ম বেলজিয়ামে, বেড়ে উঠেছেন অস্ট্রেলিয়ায়, পরিবারের শিকড় ভারত ও পাকিস্তানে, সেই ক্রিকেটার জিম্বাবুয়ের ঘরোয়া ক্রিকেটে ইতিহাস গড়ে এখন টেস্ট অভিষেকের অপেক্ষায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 10:29 AM

Updated : 05 Nov 2026, 10:29 AM

“অভিষেকের সামনে নাকভি”-গত দুই বছরে অন্তত দুইবার এমন শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু সেই অভিষেক আর হয়নি। আরও একবার সেই অভিষেকের ঘণ্টা বাজছে তার। এবার কি হবে? জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটের বিবৃতি বলছে, এবার সব বাধা কেটে গেছে। যে ছেলেটি এক সময় বিমান ওড়ানোর স্বপ্ন দেখেছে, সেই স্বপ্নের পথে হেঁটে বাণিজ্যিক বিমান চালনার সার্টিফিকেটও অর্জন করেছে, সেই আন্তুম আমির নাকভি এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আকাশে ডানা মেলার অপেক্ষায়।

অপেক্ষা যেমন নাকভির ছিল, তেমনি ছিল জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটেরও। ঘরোয়া ক্রিকেটে ইতিহাস গড়ে আলোড়ন তোলা ক্রিকেটারকে জাতীয় দলে খেলাতে পারছিল না তারা জাতীয়তা সংক্রান্ত কাগজপত্রের ঝামেলায়। অবশেষে জিম্বাবুয়ের হয়ে খেলার জন্য আইসিসির যোগ্যতার মানদণ্ড তিনি পূরণ করেছেন বলে জানিয়েছে বোর্ড। আফগানিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের জিম্বাবুয়ে স্কোয়াডে নেওয়া হয়েছে ২৭ বছর বয়সী অলরাউন্ডারকে।

জিম্বাবুয়ে দলে তিনি প্রথম ডাক পান ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য। সেই সময় তিনি জিম্বাবুয়ের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। পাসপোর্ট না পাওয়ায় সেবার খেলতে পারেননি। পরে গত বছরের অক্টোবরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের দলের আবার ডাকা হয় তাকে। সেবারও খেলতে পারেননি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ায়।

গত জুন মাসেও জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট জানিয়েছিল, তারা এখনও নাকভির কাগজপত্র নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় আছে। অবশেষে বুধবার তারা জানায়, চূড়ান্ত অনুমতি এবার মিলেছে। শারজাহতে বৃহস্পতিবার টেস্ট অভিষেক হচ্ছে নাকভির।

নাকভিকে নিয়ে এত শোরগোলের কারণ তার পরিসংখ্যানে তাকালেই বোঝা যায়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তার ব্যাটিং গড় ৬০.৩৫। ২৪ ম্যাচে সেঞ্চুরি ৬টি, ফিফটি ৮টি। প্রথম সাড়া জাগান তিনি ২০২৪ সালের জুনে, ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির একটি ম্যাচে ট্রিপল সেঞ্চুরি করে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তো বটেই, জিম্বাবুয়ের প্রতিনিধিত্বমূলক যেকোনো ক্রিকেটে প্রথম তিনশ রানের ইনিংস ছিল সেটি।

এরপর তিনি পারফর্ম করে গেছেন। রান করার পাশাপাশি অফ স্পিনে উইকেট নিয়েছেন ৬২টি। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও তার রেকর্ড দারুণ। ২৮ ম্যাচে সেঞ্চুরি ও ফিফটি করেছেন ৬টি করে। ব্যাটিং গড় ৫৩.৪০, স্ট্রাইক রেট প্রায় ১০৫। উইকেট নিয়েছেন ৩৪টি। টি-টোয়েন্টিতে ২০ ম্যাচে তার গড় ৩২.৩৫, স্ট্রাইক রেট প্রায় ১৩৭। ওভারপ্রতি সাতের কম রান দিয়ে উইকেট নিয়েছে ২০টি।

এমন রেকর্ডের একজন ক্রিকেটারকে জাতীয় দলে পেতে কে না চাইবে!

অথচ একসময় নাকভির স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। তার জন্ম বেলজিয়ামে। টেস্ট অভিষেক হলে বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার হবেন তিনিই। তার পরিবারের শিকড় ভারত ও পাকিস্তানে। তবে পরিবারের সঙ্গে চার বছর বয়সেই চলে যান অস্ট্রেলিয়ায়। বেড়ে উঠেছেন সেখানেই।

পড়াশোনা আর ক্রিকেট, দুটোই একসঙ্গে চালিয়ে গেছেন। মনে স্বপ্ন বুনেছেন পাইলট হওয়ার। ২০২৪ সালে বিবিসি স্পোর্ট আফ্রিকাকে সেই গল্প শুনেয়েছিলেন তিনি।

“ছেলেবেলায় বিমানের প্রতি ঝোঁক ছিল আমার। ‘টপ গান’ সিনেমা এবং বিমানের অনুষ্ঠান খুব পছন্দ করতাম এবং এয়ারবাস এ৩৮০-এর কোনো একটি এয়ারলাইন্সের ক্যাপ্টেন হতে চাইতাম। স্কুল শেষ করার পর আমি ফ্লাইং স্কুলে যাই এবং সিদ্ধান্ত নিই যে, বিমান চালনা ও ক্রিকেট—উভয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে নিজেকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করতে হবে আমরা।

“কমার্শিয়াল এয়ারলাইন লাইসেন্স পেতে প্রায় আড়াই থেকে তিন বছর সময় লেগেছিল আমার। সকালে বিমান ওড়াতাম, বিকেলে ক্রিকেটের প্রশিক্ষণ নিতাম। আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন ছিল সময় ব্যবস্থাপনা। যখন সিডনিতে ফিরে যাই, তখন ছুটির সময়ে যতটা সম্ভব উড়তে চেষ্টা করি, কিন্তু এখন আর ওড়ার জন্য তেমন সময় পাই না।”

দুটি একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। একসময় তিনি বেছে নেন ক্রিকেটকে। যদিও অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটে তেমন উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে যেতে পারছিলেন না। তখন তাকে নতুন পথের সন্ধান দেন সলোমন মিরে।

একসময় দারুণ সম্ভাবনাময় অলরাউন্ডার ছিলেন মিরে। জিম্বাবুয়ের হয়ে খেলেছেন ৫৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। তবে নানা বাস্তবতায় ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে নেন ৩০ বছর বয়সেই। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে তিনি খেলতেন অকে আগে থেকেই। অবসরের পর থিতু হন মেলবোর্নে। তার সঙ্গে নাকভির পরিচয় ছিল বেশ আগেই। মিরেই পরে নাকভিকে পরামর্শ দেন, জিম্বাবুয়েকে বেছে নেওয়ার।

২০২৩ সালে জিম্বাবুয়ের ঘরোয়া ক্রিকেটে পথচলা শুরু করেন নাকভি। সেখানে সাড়া ফেলতে সময় লাগেনি। মাঠের ভেতড়ে ঝড় তুলে বাইরের ঝাপটা সামলে এখন তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায়।

তার পথ ধরে চার বছরের ছোট ভাইও এখন জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে খেলছেন। শুরুটা খারাপ হয়নি আওয়াদ নাকভির। ১৬টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচে তার ব্যাটিং গড় ৪২.১৫। সম্প্রতি তিনি খেলেছেন পাকিস্তানের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও।

আন্তুমের স্বপ্ন পূরণের দিনটি নিশ্চয়ই আওয়াদের স্বপ্নেও নতুন রঙ ছড়াবে।