Published : 02 Mar 2026, 02:33 AM
চার মেরে দলকে জিতিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন সাঞ্জু স্যামসন। ব্যাট ও হেলমেট ছুড়ে ফেললেন। দুই হাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা জানালেন সৃষ্টিকর্তার প্রতি। উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করলেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে। মাঠ ছাড়ার সময় টুপি খুলে তাকে কুর্নিশ করলেন অধিনায়ক সুরিয়াকুমার ইয়াদাভ। চলতেই থাকল অভিনন্দনের পালা। বড় রান তাড়ার কঠিন চ্যালেঞ্জে ৫০ বলে অপরাজিত ৯৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে তিনিই যে ভারতকে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে তোলার নায়ক।
সপ্তাহ খানেক আগেও এমন কিছু হয়তো স্যামসনের কল্পনাতেও ছিল না! বিশ্বকাপে যে সেভাবে খেলার সুযোগই তিনি পাচ্ছিলেন না।
২০২৪ সালের শেষ দিকে টি-টোয়েন্টিতে ভারতের হয়ে স্যামসন তিনটি সেঞ্চুরি করেছিলেন পাঁচ ম্যাচের মধ্যে। কিন্তু গত বছরটা তার খুব একটা ভালো কাটেনি। ১১ ইনিংসে পঞ্চাশ ছুঁতে পারেন কেবল একবার। তারপরও এবারের বিশ্বকাপে আভিশেক শার্মার সঙ্গে তিনি ব্যাটিং ওপেন করবেন, বিশ্বকাপের ঠিক আগের সিরিজটির আগেও এটিই ছিল সবচেয়ে অনুমিত।
কিন্তু ঘরের মাঠে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ওই সিরিজেই ওলটপালট হয়ে যায় সবকিছু। সিরিজের পাঁচ ম্যাচের সবকটি খেলে একটিতেও স্যামসন ভালো করতে পারেননি। সর্বোচ্চ ইনিংস ছিল ২৪। আর ওই সিরিজ দিয়েই দুই বছরের বেশি সময় পর ভারতের হয়ে এই সংস্করণে ফিরে দুর্দান্ত পারফর্ম করেন ইশান কিষান। ম্যাচ খেলেন তিনি চারটি। সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে রান তাড়ায় করেন ৩২ বলে ৭৬, শেষটিতে আগে ব্যাটিংয়ে নেমে ৪৩ বলে ১০৩।
নিজে ফর্ম হারিয়ে আর কিষানের দারুণ ফর্ম মিলিয়ে একাদশে জায়গা হারিয়ে ফেলেন স্যামসন। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আভিশেকের সঙ্গে ওপেন করার সুযোগ পেয়ে যান কিষান। পেটের সংক্রমণে আভিশেক খেলতে পারেননি দ্বিতীয় ম্যাচে। ওই ম্যাচে নামিবিয়ার বিপক্ষে সুযোগ পেয়ে ৮ বলে ২২ রান করে আউট হয়ে যান স্যামসন। পরের ম্যাচে আভিশেক ফেরায় আবার তাকে চলে যেতে হয় একাদশের বাইরে।
আভিশেক টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট হওয়ার পরও সুযোগ পাননি স্যামসন। আসরে হয়তো আর খেলাই হতো না তার। কিন্তু সুপার এইটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচের দুই দিন আগে জরুরি পারিবারিক কারণে বাড়ি ফিরে যান রিঙ্কু সিং।

তখন পর্যন্ত দলের প্রতিটি ম্যাচেই খেলা রিঙ্কুর বাড়ি যাওয়াটা একরকম সৌভাগ্য বয়ে আনে স্যামসনের জন্য। ম্যাচের আগে রিঙ্কু ফিরলেও, একাদশে সুযোগ পান স্যামসন। সুপার এইটের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হেরে যাওয়ায়, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি ভারতের জন্য হয়ে ওঠে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আড়াইশ ছাড়ানো পুঁজি গড়ে তারা ম্যাচটি অনায়াসে জিতলেও, বড় ইনিংস খেলতে পারেননি স্যামসন (১৫ বলে ২৪)।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়ের পর বাবা হারানোর দুঃসংবাদ পেয়ে আবার বাড়ি ছুটে যান রিঙ্কু। কলকাতায় রোববার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অবশ্য দলের সঙ্গে যোগ দেন তিনি। তবে স্যামসন জায়গা ধরে রাখেন একাদশে।
সুপার এইটের এই শেষ ম্যাচটি কার্যত রূপ নেয় কোয়ার্টার-ফাইনালে, যারা জিতবে তারাই খেলবে সেমি-ফাইনালে। ইডেন গার্ডেন্সে ১৯৬ রানের বড় লক্ষ্য ছুড়ে দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এমন চাপের ম্যাচে ভারতের জন্য কাজটা তাই মোটেও সহজ ছিল না। সেই কাজটা আরও কঠিন হয়ে যায়, যখন প্রথম পাঁচ ওভারের মধ্যেই বিদায় নেন আভিশেক ও তিনে নামা কিষান।
তবে স্যামসন ছিলেন এদিন অন্য ধাঁচের এক খেলোয়াড়। কোনো কিছুই বিচলিত করতে পারেনি তাকে। নিজেকে ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি বেছে নেন কঠিন মুহূর্তটিকেই।
তৃতীয় ওভারে স্পিনার আকিল হোসেনকে চার মেরে পরের দুই বল ছক্কায় উড়িয়ে ডানা মেলে দেন ৩১ বছর বয়সী কিপার-ব্যাটসম্যান। ইডেন গার্ডেন্সের ৫০ হাজার দর্শকের সামনে দারুণ সব শটের পসরা মেলে ধরেন তিনি। একটু সময়ের জন্যও নড়বড়ে মনে হয়নি তাকে। ব্যাটিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল দুর্দান্ত।
পঞ্চাশ পূর্ণ করেন তিনি ২৬ বলে। সুরিয়াকুমার, তিলাক ভার্মারা ইনিংস টেনে নিতে না পারলেও, স্যামসন এগিয়ে যান দারুণ দৃঢ়তায়।
শেষ ওভারে ভারতের প্রয়োজন ছিল সাত রান। রোমারিও শেফার্ডের প্রথম বলেই দুর্দান্ত ফ্লিকে ছক্কা মেরে স্কোর সমান করেন স্যামসন। পরের বল মিড-অন ফিল্ডারের মাথার ওপর দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে দলকে সেমি-ফাইনালে তোলেন তিনি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে তার এই ৯৭ রানের চেয়ে বড় ইনিংস আছে কেবল একটি। সেই ২০১০ সালে তাদের একমাত্র সেঞ্চুরিটি করেছিলেন সুরেশ রায়না (১০১)।
বিশ্বকাপে রান তাড়ায় স্যামসনের ৯৭ রানই ভারতের সর্বোচ্চ। আগের সর্বোচ্চ ছিল ভিরাট কোহলির অপরাজিত ৮২; ২০১৬ সালে মোহালিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ও ২০২২ সালে মেলবোর্নে পাকিস্তানের বিপক্ষে সমান রান করেছিলেন কোহলি।
এমন ইনিংসে অনুমিতভাবে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতেন স্যামসন। যার হাত থেকে তিনি পুরস্কারটি নেন, সেই কার্লোস ব্র্যাথওয়েটেরও দারুণ এক স্মৃতি রয়েছে এই ইডেনে। এখানে ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শেষ ওভারে টানা চার ছক্কায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন তিনি।

ওই আসরে ওয়াংখেড়েতে সেমি-ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওই ম্যাচের পর এই প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দেখা হলো এই দুই দলের। যেখানে স্মরণীয় ইনিংস খেলে ভারতের শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখলেন স্যামসন।
ম্যাচ সেরার পুরস্কার নিয়ে স্যামসন বললেন এই ইনিংস তার কাছে কতটা মূল্যবান। তুলে ধরলেন মানসিক সংগ্রামের কথাও।
“আমার কাছে এই ইনিংসটির গুরুত্ব অনেক। যেদিন থেকে আমি খেলতে শুরু করেছি, দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, এমন ইনিংসের অপেক্ষাই করছিলাম। এ পর্যন্ত যাত্রাটা খুবই স্পেশাল। অনেক উত্থান-পতন ছিল। নিজেকে নিয়ে সংশয়ে পড়েছি, এমনও মনে হতো, আমি কি পারব? কিন্তু আজ আমাকে সাহায্য করার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”
একাদশের বাইরে থাকার সময়টাও কীভাবে তাকে সাহায্য করেছে, বললেন স্যামসন।
“আমি অনেক দিন ধরে এই ফরম্যাটে খেলছি। আমার মনে হয় প্রায় ১০-১২ বছর ধরে আইপিএলে খেলছি এবং ১০ বছর ধরে দেশের হয়ে খেলছি। যখন খেলিনি, তখন ডাগআউট থেকে দেখেছি, ভিরাট কোহলি, রোহিত শার্মা, এমএস ধোনির মতো গ্রেটদের কাছ থেকে শিখেছি। আমার মনে হয়, তারা কী করছে সেসব পর্যবেক্ষণ করা, দেখা এবং তা থেকে শেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা সত্যিই আমাকে সাহায্য করেছে।”
“আমি মনে হয়, ৫০-৬০টি ম্যাচ খেলেছি, কিন্তু প্রায় ১০০টি ম্যাচ দেখেছি। আমি লক্ষ্য করেছি গ্রেটরা কীভাবে খেলে এবং দেখেছি তারা কীভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাদের খেলার ধরন পরিবর্তন করে।”
আগের ম্যাচের কথাও বললেন স্যামসন। এখন তার মনে হচ্ছে, সেদিন হয়তো একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করেছিলেন তিনি।
“আগের ম্যাচে আমরা প্রথমে ব্যাট করেছিলাম, তাই আমি প্রথম বল থেকেই শট খেলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু এই ম্যাচের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন… ভাবিনি যে এই স্পেশাল ইনিংস খেলব। তবে হ্যাঁ, এটা আমার জীবনের সেরা দিনগুলোর একটি।”