Published : 17 Feb 2026, 10:53 PM
ব্র্যাড হুইলের ফুল লেংথ ডেলিভারি চমৎকার শটে ডিপ মিডউইকেটে খেললেন গুলশান ঝা। জর্জ মানজি ডাইভ দিয়ে বল থামালেও তার পা ছুঁয়ে ফেলল সীমানা দড়ি। তৃতীয় আম্পায়ার পরীক্ষা করে দেখার পর বাউন্ডারির সংকেত দিলেন মাঠের আম্পায়ার। ডাগআউটে তখন হাসিমুখে করমর্দনে ব্যস্ত নেপালের ক্রিকেটার ও সাপোর্ট স্টাফরা। উচ্ছ্বাসের ঢেউ বেশি ছড়িয়ে পড়ল যেন নেপালি সমর্থকে ঠাসা ওয়াংখেড়ের গ্যালারিতে। এমনটি অনুমিতই। অবশেষে ফুরাল যে তাদের যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষা!
দিপেন্দ্রা সিং আইরির শেষের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে স্মরণীয় এক জয় পেল নেপাল। মুম্বাইয়ে মঙ্গলবার স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জিতল তারা ৭ উইকেটে।
এই মাঠেই সপ্তাহ খানেক আগে ঐতিহাসিক এক জয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল নেপাল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ৪ রানে হেরে হৃদয় ভেঙেছিল তাদের। সেখানেই এবার তাদের দীর্ঘ এক অপেক্ষার অবসান হলো স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে। প্রায় ১২ বছর পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জয়ের স্বাদ পেল এশিয়ার এই উঠতি ক্রিকেট শক্তি।
বিশ্বকাপে নেপালের সবশেষ জয়টি ছিল সেই ২০১৪ সালের মার্চে। সেবারই প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে তিন ম্যাচের দুটিতে তারা জিতেছিল হংকং ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে। ২০২৪ আসরে চার ম্যাচের তিনটি তারা হেরেছিল, পরিত্যক্ত হয়েছিল অন্যটি।

এবারের আসরে প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বেদনাদায়ক হারের পর, ইতালি ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পাত্তা পায়নি নেপাল। শেষটা স্মরণীয় করে রাখল রোহিত পাউডেলের দল।
বিশ্বকাপ থেকে এই দুই দলের বিদায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল আগেই। এ দিন ২০ ওভারে স্কটল্যান্ড করে ১৭০ রান। সেই রান নেপাল ছুঁয়ে ফেলে ৪ বল বাকি থাকতে।
শেষ পাঁচ ওভারে নেপালের প্রয়োজন ছিল ৫৯ রান। দুরূহ সেই পথ পাড়ি দিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখে নেপালের নায়ক দিপেন্দ্রা। চার নম্বরে নেমে তিনটি ছক্কা ও চারটি চারে ২৩ বলে ৫০ রানের ইনিংসে দলের জয় নিয়ে ফেরেন তিনি। ম্যাচ-সেরার পুরস্কার ওঠে তার হাতেই।
বল হাতে বড় অবদান রাখেন সম্পাল কামি। তার কারণেই স্কটল্যান্ডের সংগ্রহটা আরও বড় হতে পারেনি। এক ওভারে জোড়া উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। চার ওভারে ২৫ রানে ৩ উইকেট শিকার করেন ৩০ বছর বয়সী পেস বোলিং অলরাউন্ডার। বিশ্বকাপে নেপালের তিন জয়ের ম্যাচেই খেলা একমাত্র ক্রিকেটার তিনিই।
স্কটল্যান্ডের উদ্বোধনী জুটি ছিল ৮০ রানের। ১৫ ওভারে ১ উইকেটে ১৩১ রানের শক্ত অবস্থানে ছিল তারা। এরপরই কামির জোড়া আঘাত। শেষ পাঁচ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে স্কটিশরা তুলতে পারে কেবল ৩৯ রান।
আট চার ও তিন ছক্কায় ৪৫ বলে ৭১ রানের ইনিংস খেলেন ওপেনার মাইকেল জোন্স।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে জোন্সের আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে ভালো শুরু পায় স্কটল্যান্ড। পাওয়ার প্লেতে তারা করে বিনা উইকেটে ৫২ রান। এর ৩৪ রান জোন্সের।
এক প্রান্তে জোন্স ঝড়ো ব্যাটিং করলেও অন্য প্রান্তে দেখেশুনে খেলে এগোন মানজি। দশম ওভারে তিনি বিদায় নেন ২৯ বলে ২৭ রান করে। থামে ৬০ বলে ৮০ রানের শুরুর জুটি।
জোন্স ফিফটি করেন ৩১ বলে। দ্বিতীয় উইকেটে তিনি আরেকটি পঞ্চাশোর্ধ জুটি গড়েন ব্র্যান্ডন ম্যাকমুলেনের সঙ্গে। কিন্তু ৫২ রানের এই জুটি ভাঙার পর পথ হারিয়ে ফেলে স্কটল্যান্ড।
ষোড়শ ওভারে তিন বলের মধ্যে দুই থিতু ব্যাটসম্যানকে বিদায় করেন কামি। জোন্সকে বোল্ড করার পর ম্যাকমুলেনকে (১৯ বলে ২৫) চমৎকার ফিরতি ক্যাচে বিদায় করেন এই পেসার।
বাকি সময়ে প্রত্যাশিত ঝড় তুলতে পারেননি কেউ।
লক্ষ্য তাড়ায় নেপালকে উড়ন্ত শুরু এনে দেন কুশাল ভুর্তেল ও আসিফ শেখ। পাওয়ার প্লেতে আসে বিনা উইকেটে ৫৬ রান।
চার ছক্কা ও এক চারে ৩৫ বলে ৪৩ রান করে বিদায় নেন ভুর্তেল। থামে ৫৫ বলে ৭৪ রানের জুটি।
ভুর্তেলকে ফেরানো মাইকেল লিস্ক নিজের পরের ওভারে বিদায় করেন আসিফকে (২৭ বলে ৩৩)। ভালো করতে পরেননি রোহিত (১৪ বলে ১৬)।
ওই তিন জনকে হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় নেপাল। তবে দিপেন্দ্রা ও ঝা দারুণ ব্যাটিংয়ে এগিয়ে নেন দলকে।
নেপালের দরকার যখন ৩১ বলে ৬৫ রান, পরের তিন বলে আসে তিনটি ছক্কা। পঞ্চদশ ওভারের শেষ বলে ছক্কা মারেন অলিভার ডেভিডসন, পরের ওভারের প্রথম দুই বলে দিপেন্দ্রা। এই ওভারে আসে ২০ রান।
সপ্তদশ ওভারে দিপেন্দ্রা মারেন দুটি চার। পরের ওভারের শেষ দুই বলে হুইলকে ছক্কা ও চার মারেন তিনি। শেষের আগের ওভারে ব্যাড কারিকে ছক্কায় ওড়ান ঝা।
শেষ ওভারে দরকার ছিল ৫ রান। প্রথম বলে এক রান নিয়ে ফিফটি পূর্ণ করেন দিপ্রেন্দ্রা। পরের বলে ঝার চারে স্মরণীয় জয় নিশ্চিত হয় নেপালের। ১৭ বলে ২৪ রানে অপরাজিত থাকেন ঝা।
নিরাপত্তা শঙ্কায় বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যেতে রাজি না হওয়ায়, তাদের জায়গায় সুযোগ দেওয়া হয়েছিল স্কটল্যান্ডকে। চার ম্যাচে এক জয় ও তিন হারে আসর শেষ করল তারা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
স্কটল্যান্ড: ২০ ওভারে ১৭০/৭ (মানজি ২৭, জোন্স ৭১, ম্যাকমুলেন ২৫, বেরিংটন ১০, ব্রুস ৫, ক্রস ৪, লিস্ক ৪, ওয়াট ১০*, ডেভিডসন ১*; দিপেন্দ্রা ৩-০-২৩-০, কামি ৪-০-২৫-৩, নান্দান ৪-০-৩৪-২, লামিছানে ৩-০-২৯-০, রোহিত ২-০-১২-১, ভুর্তেল ৪-০-৩৭-১)
নেপাল: ১৯.২ ওভারে ১৭১/৩ (ভুর্তেল ৪৩, আসিফ ৩৩, রোহিত ১৬, দিপেন্দ্রা ৫০*, ঝা ২৪*; ম্যাকমুলেন ১-০-৫-০, কারি ৪-০-৩৩-০, ওয়াট ৩-০-৩৫-০, হুইল ৩.২-০-৩৪-০, ডেভিডসন ৪-০-৩১-০, লিস্ক ৪-০-৩০-৩)
ফল: নেপাল ৭ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: দিপেন্দ্রা সিং আইরি