ওয়াসিম আকরামের মঞ্চে স্যাম কারানের দোলা

চোটের কারণে গত বিশ্বকাপে খেলতে না পারা পেসার এবার ফাইনালের সেরা ও টুর্নামেন্টের সেরা।

আরিফুল ইসলাম রনিআরিফুল ইসলাম রনি মেলবোর্ন থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Nov 2022, 04:04 PM
Updated : 13 Nov 2022, 04:04 PM

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড। ইংল্যান্ড-পাকিস্তান ফাইনাল। বাঁহাতি পেসারের ৩ উইকেট। ম্যান অব দা ম্যাচ। ক্রিকেটের অনুসারীমাত্রই পরেরটুকু বলে দেওয়ার কথা, ‘ওয়াসিম আকরাম!’ ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনালে পাকিস্তানি গ্রেটের সেই পারফরম্যান্স স্মরণীয় হয়ে আছে ক্রিকেটে। তবে এতদিন উত্তর স্রেফ অতটুকু থাকলেও তবে এখন আর একজনের নাম বললেই চলবে না। আরেক বাঁহাতি পেসারও যে এই মঞ্চেই একইভাবে ম্যাচ সেরা! প্রেক্ষাপটগুলো এভাবে সাজালে এখন আকরাম ও স্যাম কারানের নাম রাখতে হবে পাশাপাশিই। 

ফাইনাল শেষে জস বাটলারের সংবাদ সম্মেলনে দুজনের নাম পাশাপাশি উঠেও এলো। আকরামের সেই পারফরম্যান্সের সঙ্গে মিলিয়ে প্রশ্ন হলো কারানকে নিয়ে। শুনে বাটলার হাসলেন। সংবাদ সম্মেলন কক্ষেই এক প্রান্তে বসেছিলেন কারান। তার পাশে আদিল রশিদ ও মইন আলি। সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন তারা। আকরামের সঙ্গে নিজের নাম উচ্চারিত হতে দেখে সেখানে বসেই মজা করে চিৎকার দিয়ে উঠলেন কারান। পাশে বসে থাকা রশিদ ও মইনকেও হাসতে হাসতে কিছু একটা বললেন। 

আকরামের সঙ্গে তুলনা অবশ্যই বাড়াবাড়ি। আকরামের সেই পারফরম্যান্সের সঙ্গে তুলনাও খুব উপযুক্ত নয়। ১৯৯২ বিশ্বকাপের ফাইনালে তার সেই পারফরম্যান্স ক্রিকেটে অমর হয়ে আছে মূলত দুটি ডেলিভারির কারণে। পুরনো বলে অ্যালান ল্যাম্ব ও ক্রিস লুইসকে পরপর দুই ডেলিভারিতে বোল্ড করে ম্যাচ পাকিস্তানের দিকে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। তার সেদিন ম্যাচ সেরা হওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা ছিল ব্যাট হাতে ১৮ বলে ৩৩ রানের ঝড়ো ইনিংসটিরও। 

কারানকে ব্যাট হাতে নামতে হয়নি। জাদুকরি কোনো ডেলিভারিও করেননি। তবে যা করেছেন, দলের জয়ের পথ তৈরি করে দিয়েছে তা। ৪ ওভারে ১২ রানে ৩ উইকেট, বিশ্বকাপ ফাইনালে এমন পারফরম্যান্স তো অমূল্য। 

সেই উইকেটগুলোও এসেছে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। টস জিতে বোলিংয়ে নামা ইংল্যান্ড যখন প্রথম ৪ ওভারে উইকেট পাননি, মোহাম্মদ রিজওয়ানকে ফিরিয়ে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন তিনিই। 

পাওয়ার প্লেতে ২ ওভারে রান দেন স্রেফ ৫! 

দ্বিতীয় স্পেলে যখন ফেরেন, শান মাসুদ ও শাদাব খানের জুটিতে তখন ঘুরে দাঁড়ানোর পথে পাকিস্তান। দুজন শুধু প্রতিরোধই গড়েননি, রানের গতিও ছিল বেশ ভালো। এবারও যথারীতি ইংল্যান্ডের ত্রাতা কারান। আক্রমণে ফিরে প্রথম ওভারেই থামান ২৮ বলে ৩৮ রান করা মাসুদকে। 

নিজের শেষ ওভারে তিনি ফেরান মোহাম্মদ নাওয়াজকে, শেষ দিকে যিনি হতে পারতেন বিপজ্জনক। 

৪ ওভারে ডট বল ১৫টি। চার-ছক্কা দেননি একটিও। 

এমন পারফরম্যান্সের পর আকরামের সেই পারফরম্যান্সের সঙ্গে তুলনাকে আসলে অবান্তর মনে হয় না খুব একটা। 

বাটলার অবশ্য এই তুলনার গভীরে গেলেন না। তবে কারান যে আরও অনেক দূর যাবে, এটা নিয়ে সংশয় নেই ইংলিশ অধিনায়কের। 

“ওয়াসিম আকরামের সঙ্গে তুলনা নিশ্চয়ই স্যাম সানন্দে গ্রহণ করবে! দারুণ সম্মান এটি… সে (কারান) দুর্দান্ত পারফরমার। এখান থেকে কেবল আরও ভালোই হবে। এখনও ওর বয়স কম। কিন্তু এখনই অভিজ্ঞতা জমা করেছে অনেক এবং সে শুধু বল করতে চায়। বোলিংয়ে আনার জন্য তার দিকে তাকালে দেখা যায়, সে আগে থেকেই বলতে শুরু করেছে যে বল করতে চায়…!” 

কারান নিজে অবশ্য আকরামের সঙ্গে তুলনাকে স্রেফ উড়িয়ে দিলেন। কিংবদন্তির পাশে নিজের নাম শোনার বাড়তি রোমাঞ্চ তাকে টানছে না, বরং দলের জয়ের তৃপ্তিতেই আচ্ছন্ন তিনি। 

“অবশ্যই আমার ভালো লাগবে (এই তুলনায়)… তবে আমার মনে হয় না, তার অর্ধেক মানের বোলারও আমি। তিনি অবিশ্বাস্য এক পারফরমার ছিলেন। অসাধারণ এক জয় পেয়েছি, দুর্দান্ত… এটুকুই যথেষ্ট।” 

নায়ক তিনি শুধু ফাইনালেরই কিন্তু নন। দলকে ফাইনালে তুলে আনার পথেও তিনি ছিলেন দলের সেরাদের একজন। টুর্নামেন্টের শুরুটা ছিল তার চমকপ্রদ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৫ উইকেট নেন স্রেফ ১০ রানে। তার হাত ধরে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ৫ উইকেট পায় ইংল্যান্ড। 

অথচ চোট কাটিয়ে ফেরার পর এবার ইংলিশ গ্রীষ্মে প্রথম ৫ টি-টোয়েন্টিতেই তিনি ছিলেন উইকেটশূন্য!  

গত বছর আইপিএলে খেলার সময় পিঠের চোটে মাঠের বাইরে ছিটকে যাওয়ায় বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ওই আসরে তিনি কাজ করেন টিভি বিশ্লেষক হিসেবে। মাঠের বাইরে থেকে দেখেন সেমি-ফাইনালে দলের পরাজয়। 

এক বছরের বেশি সময় বাইরে থাকার পর সুস্থ হয়ে ফেরেন গত জুলাইয়ে। মাঠে ফিরলেও নিজেকে ফিরে পেতে সময় লাগে তার। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে উইকেটই পাননি। সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সফর থেকে একটু একটু করে পেতে থাকেন ছন্দ। বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজের ২ ম্যাচ খেলে শিকার করেন ৫ উইকেট। সেই ফর্মই বয়ে আনেন বিশ্বকাপে। 

আফগান ব্যাটিং গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর ২টি করে উইকেট নেন তিনি আয়ারল্যান্ড ও নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষ একটি। কেবল সেমি-ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেই উইকেট পাননি। তা সুদে-আসলে পুষিয়ে দেন ফাইনালে। 

সুইং করানোর সামর্থ্য বরাবরই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে এবারের আসরে শুধু সুইংই নয়, নাকল বল, প্রয়োজনের সময় বাউন্সার, কাটার, স্লোয়ার বাউন্সার, দুর্দান্ত সব স্কিলের প্রদর্শনী মেলে ধরেছেন তিনি। বৈচিত্র বাড়ার কারণেই ডেথ ওভারে টুর্নামেন্টজুড়ে তিনি ছিলেন অসাধারণ। ইংল্যান্ডের সাফল্যের বড় কারণ শেষের ওভারগুলোয় কারানের ঠাণ্ডা মাথার কার্যকর বোলিং। 

সব মিলিয়ে ৬ ম্যাচে ১৩ উইকেট। বোলিং গড় ১১.৩৮, ওভারপ্রতি রান মাত্র ৬.৫২। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা উইকেট শিকারি। ম্যান অব দা ম্যাচই শুধু নয়, ম্যান অব দা টুর্নামেন্টও তিনিই। 

গত বিশ্বকাপ থেকে এই বিশ্বকাপে কী অবিশ্বাস্য এক অভিযান! 

কারান নিজেও দারুণ রোমাঞ্চিত। তবে নিজের পারফরম্যান্সে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি দলের জয়ে। বারবার এটিই উঠে আসছিল তার কথায়। 

“বিশ্বকাপ জিতেছি, এতেই খুশি আমি। আর কিছু দরকার নেই।” 

“এখনও পুরোপুরি হজম করে উঠতে পারছি না। বুঝে উঠতে সময় লাগবে। কালকে সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন মনে হবে যে আমরা বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন, নিশ্চিতভাবেই শিহরণ জাগবে মনে।” 

নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে আরেকটি প্রশ্নে তার উত্তর, “আই ডোন্ট কেয়ার। আমরা জিতেছি, এটাই আসল…।” 

সেই জয়ের আনন্দ এবার উপভোগ করার পালা। কীভাবে উদযাপন করবে দল, তা খোলাসা করলেন না তিনি, “উদযাপন তো করবই, খুব ভালোভাবেই করব। কীভাবে, সেটা আপনাদের বলব না…।” 

সেটা বলা অবশ্য জরুরিও নয়। বল হাতে যেভাবে কথা বলছেন, তাতেই তো মুগ্ধতার শেষ নেই। 

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক