‘সামর্থ্যের ১০ শতাংশও দিতে পারিনি’, বিভীষিকার সিরিজের পর বাংলাদেশ অধিনায়কের আক্ষেপ

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজজুড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের হতশ্রী অবস্থা দেখে অধিনায়ক নিগার সুলতানা নিজেও বিস্মিত।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 27 March 2024, 10:14 AM
Updated : 27 March 2024, 10:14 AM

তিন ম্যাচে রান ৯৫, ৯৭ ও ৮৯। না, কারও ব্যক্তিগত রান নয়, এসব বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ। টি-টেন ক্রিকেটের স্কোর এসব নয়, ৫০ ওভারের ম্যাচের রান!

ঘরের মাঠে যেন একদমই অচেনা বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন ম্যাচের একটিতেও তিন অঙ্ক ছুঁতে পারেনি তারা। ত্রিশ ছোঁয়া ইনিংসও আসেনি কারও ব্যাট থেকে। ব্যাটিংয়ের এই চরম ব্যর্থতায় আইসিসি উইমেন'স চ্যাম্পিয়নশিপের সিরিজটিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো লড়াই করতেই পারেনি বাংলাদেশ। যাচ্ছেতাই ব্যাটিংয়ে সিরিজের সবকটি ম্যাচ হারের পর নিগার সুলতানা বললেন, সামর্থ্যের দশ শতাংশও দিতে পারেনি তার দল।

সিরিজ হার নিশ্চিত হওয়ার পর বুধবার শেষ ম্যাচে টসের সময় নিগার বলেন, টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগে এই ম্যাচ থেকে ইতিবাচক কিছু পেতে চান তিনি। তার প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি দল।  তিনি নিজেও পারেননি দলকে উদ্ধার করতে।  

অথচ এই সিরিজের আগে সবশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে তিন ম্যাচের দুটিতে দুইশ ছোঁয়া স্কোর দাঁড় করায় বাংলাদেশ। প্রথম ওয়ানডেতে মুর্শিদা খাতুনের নব্বই ছোঁয়া ইনিংসে তারা করে নিজেদের সর্বোচ্চ ২৫০ রান। পরেরটিতে সেঞ্চুরি করেন ফারজানা হক। ঘরের মাঠে পুরোপুরি বদলে গেল এই চিত্র।

প্রথম ম্যাচে দলের সর্বোচ্চ ২৭ রানের ইনিংস খেলেন নিগার। দ্বিতীয়টিতে ২২ রান করেন সহ-অধিনায়ক নাহিদা আক্তার। তিন ম্যাচে বিশ ছোঁয়া ইনিংস স্রেফ এই দুটিই। শেষ ম্যাচে ১৬ রান করেই দলের সর্বোচ্চ স্কোরার নিগার।

সিরিজ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক বললেন, দলের ব্যাটিংয়ের এমন অবস্থা দেখে তিনি নিজেই অবাক।

“(সামর্থ্যের কতটা দিতে পেরেছেন) ১০ শতাংশও না। আমি নিজেও পুরোপুরি সারপ্রাইজড। যেভাবে গত ৬ মাসে ক্রিকেট খেলেছি, এটা একেবারেই অমন নয়। পুরো দল ব্যর্থ। দু-একটা দিকে ভুল হলে তবুও মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু পুরো দল ভিন্ন ধরনের ক্রিকেট খেলছে। মনে হচ্ছে যে, নিজেদের ব্যাকফুটে রেখেছে। মনে হয়, সামর্থ্যের ১০ শতাংশও খেলতে পারিনি।”

গত বছরের শেষ ছয় মাস দারুণ কেটেছিল বাংলাদেশের। ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজ ড্র করার পর দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে একটি ম্যাচ জেতে তারা। তাদের তুলনায় বেশ শক্তিশালী ছয়বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। তাদের মোকাবিলা করার আগে নিজেদেরকে যথাসম্ভব প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ। গত জানুয়ারি থেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনুশীলন শুরু করেন নিগার, ফারজানা, নাহিদারা। গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি পর্ব।

ঢাকায় চার দিনের স্পিন ক্যাম্পের পর খুলনায় গিয়ে দুই সপ্তাহের পূর্ণাঙ্গ স্কিল ক্যাম্প করেন ক্রিকেটাররা। সিরিজ শুরুর আগে ঢাকায় ফিরে হয় তিন দিনের অনুশীলন।

সব মিলিয়ে নিজেদের প্রস্তুতিতে কোনো ফাঁকফোকর দেখেন না নিগার। তবে মাঠে বাস্তবায়নের ঘাটতিতে আক্ষেপের কথাই বললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

“আমরা প্রস্তুতি অনেক ভালো নিয়েছি। বিষয়টা হলো, অনুশীলনে যখন দেখবেন (ক্রিকেটাররা) এক ধরনের মানসিকতা নিয়ে করছে, ম্যাচে এসে আরেকভাবে করছে, তখন কঠিন হয়ে যায়। কোচ বলেন বা অধিনায়ক হিসেবে বলেন, যখন দেখি ক্রিকেটাররা আত্মবিশ্বাসী বা প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে অনেক রান করছে, নিখুঁত ব্যাটিং করছে... এরপর যখন ম্যাচে দেখি ভিন্নভাবে খেলছে, তখন আমাদের হাতেও অনেকসময় কিছু করার থাকে না। আমার মনে হয় না, প্রস্তুতিতে সমস্যা ছিল। সামর্থ্য যতটুকু ছিল, তা একদমই খেলতে পারিনি।”

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, কেন মাঠে নিজেদের সামর্থ্যের বাস্তবায়ন করতে পারছেন না তারা? নিগার আঙুল তুললেন দলের মানসিকতায়।

“আমার মনে হয় মানসিক ব্যাপার। কারণ স্কিল অনুযায়ী সমস্যা আছে বলে মনে হয় না। যদি থাকত, তাহলে তো আগে ম্যাচ জিততে পারতাম না। কারও নাম ধরে বলতে চাই না, তবে আমি জানি না, সবার মধ্যে কী কাজ করছে। আমি সবাইকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছি।”

“প্রথম ম্যাচ থেকেই সবাই কেমন যেন ব্যাকফুটে ছিল। সবাইকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছি। সেখান থেকে হয়তো খেলোয়াড়রা আর ফিরতে পারেনি। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী খেলা, নিজেদের শক্তি অনুযায়ী খেলা... ওই শক্তির জায়গা অনুযায়ী আমরা ক্রিকেট খেলিনি। পুরোপুরি ভিন্ন ক্রিকেট খেলেছি।”

সিরিজ শুরুর আগে থেকেই দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় দল হওয়ায় বাড়তি কোনো চাপ কাজ করবে না তাদের। বরং শক্তিশালী দলের বিপক্ষে ভালো কিছু করার প্রেরণায় উজ্জীবিত ছিলেন তারা। কিন্তু মাঠে সেটির প্রতিফলন পড়েনি।

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বসেরা তারকাদের নামের ভারেই মানসিকভাবে বাংলাদেশ চাপা পড়ল কি না, এই প্রশ্নও তাই উঠছে। নিগার ঠিক জানেন না এটির ব্যাখ্যা।

 “খেলোয়াড়ের মন বা মস্তিস্কের ব্যাপারটি আমি বলতে পারব না। তবে অনেক সময় মনের ভেতরে নেতিবাচক ব্যাপার চলে আসে। যদি কেউ ভালো শুরু না পায়, তখন নিজ থেকেই মনে করে যে, ‘না, আমার হচ্ছে না।’ যখন প্রথম ম্যাচে কোনো ক্রিকেটার রান করতে পারেনি, পরের ম্যাচেও পারেনি, তখন কিন্তু নিজে থেকেই ব্যাকফুটে চলে যায়। সেখান থেকে অনেকে ফিরে আসতে পারে, অনেকে পারে না। আমি বলব, এটা মানসিক ব্যাপার।”

ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশড হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এখন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টির লড়াই। আগামী রোববার শুরু হবে তিন ম্যাচের সিরিজ।

টি-টোয়েন্টিতে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য ইতিবাচকতার মন্ত্রে নিজেদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করছেন নিগার।

“আমাদের অবশ্যই ইতিবাচক থাকতে হবে। এটা এখন আমাদেরই দায়িত্ব, আমরা কীভাবে নিজেদেরকে অনুপ্রাণিত করব। কারণ সামনে আবার আমরা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ খেলব। টি-টোয়েন্টিতে যদি আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি, সেটা আমাদের পরবর্তী সিরিজগুলোতে সাহায্য করবে।” 

“আমরা যেহেতু ব্যর্থ হয়েছি, আমাদেরই নিজেদের উজ্জীবিত করতে হবে। অন্য কেউ বাইরে থেকে করতে পারবে না। আমরা চেষ্টা করব, একসাথে বসে ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা করার। যত বেশি ইতিবাচকভাবে আলোচনা করব, আমাদের জন্য ভালো হবে। কারণ আমরা জানি, আমরা এর চেয়ে ভালো খেলি, এর চেয়ে ভালো ক্রিকেটার।”