Published : 28 Nov 2025, 02:24 PM
আব্দুল গাফফার সাকলাইন ছিলেন টেপ টেনিস আঙিনার পরিচিত মুখ। খ্যাপ খেলে বেড়াতেন নানা জায়গায়। প্রতিভা আর পরিশ্রম দিয়ে সেখান থেকে উঠে এসে তিনি খেলছেন ঘরোয়া ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে না খেলেও জায়গা করে নিয়েছেন দেশের ক্রিকেটের মূল স্রোতে। সুযোগ আদায় করে নিয়েছেন বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও। এই পর্যায়ের ক্রিকেটে প্রথমবার খেলেই সম্প্রতি রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপে তিনি আলো ছড়িয়েছেন।
কাতারের দোহায় এই টুর্নামেন্টে ৫ ম্যাচে তার শিকার ৫ উইকেট। তবে এই পরিসংখ্যানে ফুটে উঠছে না সবকিছু। টুর্নামেন্টে চমক দেখিয়েছেন তিনি দারুণ সব স্লোয়ার ডেলিভারি করে ও নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে। ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন মাত্র ৬.৫৭। ফাইনালে তো দেখিয়েছেন ব্যাটিং সামর্থ্যও।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২৭ বছর বয়সী ক্রিকেটার শোনালেন তার চমকপ্রদ পথচলার গল্প।
প্রথমবার বাংলাদেশ ‘এ’ দলে খেললেন। রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপে দারুণভাবে নজর কাড়লেন। এই পর্যায়ে প্রথমবার খেলে সাফল্য পেতে স্কিলের পাশাপাশি মানসিক দৃঢ়তাও প্রয়োজন। আপনি কিভাবে রপ্ত করলেন? কেমন অভিজ্ঞতা হলো এই টুর্নামেন্ট খেলে?
আব্দুল গাফফার সাকলাইন: দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় গর্ব। প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই স্বপ্ন থাকে দেশের জার্সি গায়ে খেলার। আমিও আলাদা নই। খবরটা পাওয়ার পর দারুণ লেগেছিল। তখন থেকেই মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলাম যে সুযোগ পেলেই সর্বোচ্চটা দেব। আল্লাহর মেহেরবানি, সুযোগটা সহজ হয়েছে এবং আমি আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের প্রথাগত পথ ধরে তো আপনি উঠে আসেননি। আপনার উত্থানের অধ্যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিরল। নীলফামারিতে টেপ টেনিস খেলে দেশের ক্রিকেটের বড় পর্যায়ে উঠে এসেছেন, কয়েক বছর ধরে ঘরোয়া ক্রিকেটের শীর্ষ পর্যায়ে খেলছেন। শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত আপনার পথচলার গল্প যদি শোনাতেন…
সাকলাইন: ছেলেবেলায় আমার বাসার পাশে বড় মাঠ থেকেই ক্রিকেটের শুরু। অন্য সবার মতোই টেপ টেনিসে খেলতাম। সেখান থেকেই আমার যাত্রা শুরু। একদিন একটি টুর্নামেন্টে ভালো খেলি, তখন আমার এক বড় ভাই বললেন তোমার প্রতিভা আছে, ক্রিকেট বল দিয়ে খেলা শুরু কর। এরপর আমি সেফ স্পোর্টস ক্রিকেট ক্লাব থেকে ক্রিকেট বলে খেলা শুরু করি।
প্রথমে আমি ঢাকার লিগে খেলেছি ওরিয়েন্ট স্পোর্টিং ক্লাবে। তৃতীয় বিভাগের রেলিগেশনে খেলতে গিয়েছিলাম। পরের বছর খেলি গাজী টায়ার ক্রিকেট একাডেমিতে দ্বিতীয় বিভাগে, সেখানে দুই বছর খেলেছি। এরপর প্রথম বিভাগে খেলেছি এক বছর কাকরাইল বয়েজে। পরের বছর আবার গাজী টায়ার ক্রিকেট একাডেমিতে খেলি, যারা দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই বছরই আমরা চ্যাম্পিয়ন হই এবং প্রিমিয়ারে উঠি।
পরে গাজী গ্রুপে প্রিমিয়ারে দুই বছর খেলেছি। এখান থেকেই জাতীয় লিগে খেলার ডাক পাই রংপুর বিভাগের হয়ে। শুরুতে প্রাথমিক ক্যাম্পে ডাকা হয়েছিল, এক মাসের। ক্যাম্পে ভালো করায় জাতীয় লিগে খেলার সুযোগ পাই।

ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করেই বাংলাদেশ ‘এ’ দলে এলেন। আপনার স্লোয়ার ডেলিভারি তো তাক লাগিয়ে দিয়েছে অনেককেই। রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপেও আপনার স্লোয়ারগুলো দারুণ প্রশংসিত হয়েছে। কয়েকধরনের স্লোয়ার করতে পারেন অ্যাকশন বদল না করেই। নিয়ন্ত্রণও দারুণ। কিভাবে এটা শিখলেন ও এত ভালোভাবে রপ্ত করলেন?
সাকলাইন: আসলে টেপ টেনিসেও স্লোয়ার করি, ক্রিকেট বলেও করি। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে স্লোয়ারটা আমি ছেলেবেলা থেকেই করতে পারি।
ছোট থেকেই আইপিএল দেখতাম। আইপিএলে আমি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের সমর্থক ছিলাম। সে সময় দলটিতে খেলতেন ক্যারিবিান অলরাউন্ডার ডোয়াইন ব্রাভো। তিনি যখন বোলিং করতেন, স্লোয়ার করতেন, আমি তার স্লোয়ারগুলো টিভিতে দেখতাম আর মাঠে এসে একটু চেষ্টা করতাম যে তার মতো হয় কি না।
একটা ব্যাপার আছে না, কোনো কিছু যদি নিয়মিত করা যায়, অনুশীলন করতে করতে সেটা আয়ত্তে চলে আসে। আমার ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়ে গেছে। আল্লাহ্র কাছে শুকরিয়া যে স্লোয়ার করতে শিখেছি। এটা আমার জন্য খুব ভালো ব্যাপার ও মূল শক্তির জায়গা।
ভারতের বিপদজনক ব্যাটসম্যান বৈভাব সুরিয়াভানশিকে আউট করেছেন একটি দারুণ স্লোয়ার ডেলিভারিতে। সেই সময় পরিকল্পনা কী ছিল?
সাকলাইন: আসলে সে ভালো ব্যাটিং করতেছিল। অধিনায়ক (আকবার আলি) যখন আমাকে বলল যে, ‘সাকলাইন, তুমি এই দিক থেকে বোলিং করবে’, আমাকে বল দেওয়ার সময় থেকে বিশ্বাস ছিল যে ভালো জায়গায় বল করলে ধারাবাহিকভাবে, ব্যাটসম্যান ভুল করে বা ভুল করার সুযোগ বেশি তৈরি হয়। আমি আমার সামর্থ্যে থাকার চেষ্টা করেছি। অফ স্টাম্পের বাইরে স্লোয়ার দিয়েছিলাম। তাতেই কাজ হয়েছিল।
টেপ টেনিস আর ক্রিকেট বলের মধ্যে বোলিংয়ের পার্থক্য কতটুকু মনে হয়?
সাকলাইন: ক্রিকেট বল খেলা আর টেপ টেনিস বলে পার্থক্য তো আছেই। ক্রিকেট বলে খেলতে হলে প্রক্রিয়া মেনে আর কঠিন অনুশীলনের মধ্যে থাকা লাগে নিয়মিত। টেপ টেনিস খেলতে হলে এটা আপনাআপনি হয়ে যায়, যখন খেলবেন তখন থেকেই। আমি কম বয়সে শুরু করেছিলাম টেপ টেনিস খেলা। ওটার জন্য অত বিশেষ কোনো দক্ষতা লাগে না। টেপ টেনিস সবাই কমবেশি খেলতে পারে।
সবশেষ আপনি যখন হাই পারফরম্যান্স স্কোয়াডে ছিলেন, বিসিবির কোচ তারেক আজিজের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করেছেন। টেনিস বল থেকে এসে ক্রিকেটের মূল পর্যায়ে পোক্ত হতে সেই ক্যাম্প কতটা সহায়তা করেছে?
সাকলাইন: প্রথমবার হাই পারফরম্যান্সে ক্যাম্পে অংশ নিতে পেরেছি, এটা ছিল আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের। অভিজ্ঞতা সত্যিই দারুণ ছিল। ক্যাম্পে দারুণ ট্রেনিং করেছি। সেখানে স্কিল আর ফিটনেস উন্নতির চেষ্টা করেছি। খুব ভালো পরিবেশ, একজন খেলোয়াড়ের জন্য স্কিল গড়ে তোলার আদর্শ সুযোগ।
তারেক স্যারের সাথে আমি নিয়মিতই কাজ করেছি। বিদেশি পেস বোলিং কোচ কোরি কলিমোর ছিলেন। সবার কাছ থেকেই শিখেছি। স্যার (তারেক) আমাকে সবসময় উৎসাহ দিয়েছেন। যেখানে আমার ঘাটতি ছিল, সেগুলো উন্নত করার চেষ্টা করেছেন। লাইন–লেংথে ধারাবাহিক থাকার চেষ্টা করেছি। সত্যি বলতে, এইচপি ক্যাম্প থেকে অনেক বড় সহায়তা পেয়েছি নিজের জন্য।
এবারই প্রথম দেশের বাইরে খেললেন। পরিবার ও বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
সাকলাইন: আমার বাবা নেই, তিন বছর আগে মারা গেছেন। তার খুব ইচ্ছে ছিল আমি জাতীয় দলের মতো জায়গায় খেলব, তিনি দেখবেন। এখন তিনি নেই। তার দোয়া সবসময়ই আমার সাথে ছিল।
আমি যখন ডাক পেলাম ‘এ’ দলে খেলার জন্য তখন পরিবার, বন্ধুবান্ধব, বড় ভাই সবাইকে জানিয়েছিলাম। ওরাও খবরটা শুনে খুশি হয়েছিল। সবাই আমাকে বলেছিল, বেশি উত্তেজিত না হয়ে মনোযোগ ধরে রাখতে, নিজের প্রক্রিয়া আর শক্তির জায়গায় থাকতে। ভালো কিছু করতে হলে মনোযোগই সবচেয়ে জরুরি। মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত রাখার কথাও বলেছে। ওরাই আমাকে সমর্থন দিয়েছে। দোয়া তো থাকেই, প্রত্যেক মা-বাবা চান তাদের সন্তান ভালো জায়গায় পৌঁছাক।

টেপ টেনিস থেকে উঠে এসে আপনি ‘এ’ দলে খেললেন, মানে জাতীয় দলের কাছাকাছিও আছেন। আপনার এই চমকপ্রদ উত্থান দেশের টেপ টেনিসে খেলা অসংখ্য ক্রিকেটারের স্বপ্নে কতটা রঙ চড়াতে পারে?
সাকলাইন: আমি আশা করি যে আমি তাদের জন্য একটি প্রেরণা হতে পারি। যারা ভালো খেলার চেষ্টা করছে বা খেলার স্বপ্ন দেখে, তারা যেন ক্রিকেটে মনোযোগ দিয়ে নিজেদের উন্নতির চেষ্টা চালিয়ে যায়।
এই টুর্নামেন্ট খেলার পর জাতীয় নির্বাচকরা বা সংশ্লিষ্ট কেউ কি আপনাকে কিছু বলেছেন?
সাকলাইন: বিসিবি সভাপতি (আমিনুল ইসলাম বুলবুল) স্যার ছিলেন ফাইনাল ম্যাচে। আমরা ম্যাচটা জিততে পারিনি। উনি ম্যাচ শেষে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাকে উৎসাহিত করেছেন। দলের সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। আমাদেরকে সমর্থন দিয়েছেন।
জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন তো নিশ্চয়ই অনেক দিন ধরেই দেখছেন। প্রথমবার ‘এ’ দলে খেলার অভিজ্ঞতার পর, এখন কি স্বপ্ন সত্যি হওয়াকে খুব কাছেই দেখছেন?
সাকলাইন: জাতীয় দলের স্বপ্ন তো প্রত্যেক ক্রিকেটারেরই থাকে। আমারও আছে। ধাপে ধাপে সবকিছু হয় প্রক্রিয়া মেনে। আমি ‘এ’ দলে খেললাম, ভালো করার চেষ্টা করেছি। সামনে হয়তো আরও পথ যেতে হবে। তার জন্য মানসিকভাবে ও পারফরম্যান্স ঠিকঠাক থাকার চেষ্টা করছি, যাতে সুযোগ পেলে প্রমাণ করতে পারি নিজেকে।
বোলিংয়ের মতো আপনি নরজ কেড়েছে উদযাপন দিয়েও। উইকেট পেলেই ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর ‘Siuuu’ উদযাপন করেন। বেশ ভালোভাবে রপ্তও করেছেন সেটি। কোনো গল্প আছে পেছনে?
সাকলাইন: আমি আসলে ফুটবলে ব্রাজিলকে সমর্থন করি। তবে ফুটবলার হিসাবে আমার ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোকে ভালো লাগে। কারণ, তার হার্ড ওয়ার্ক। নিজের ফিটনেসের প্রতি অনেক সক্রিয় থাকে। এই ব্যাপারটা আমার ভালো লাগে। সেই ভালো লাগা থেকেই তার মতো করে উদযাপন করি।