Published : 16 Jan 2026, 04:55 PM
শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের এক নম্বর ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকে একসঙ্গে গ্যালারির দিকে যাচ্ছিলেন তিন জন দর্শক। কোথা থেকে এসেছেন জানতে চাইলে একজন বলে উঠলেন, ‘আমরা সকাল বেলা এসেছি রংপুর থেকে, রংপুর রাইডার্সের খেলা দেখতে। রাতে রওনা দিয়ে সকালে নেমেছি, কিন্তু পারলাম না রংপুরের খেলা দেখতে।’ হতাশা-ক্ষোভ সবই মিশে রইল তার কণ্ঠে। বিতর্ক ও টানাপোড়েনের মধ্যে একদিন বন্ধ থাকার পর বিপিএল ফেরার দিনে এমন অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন আরও অনেক দর্শক।
ক্রিকেটারদের নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যের পর বুধবার রাতে ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াব ঘোষণা দেয়, বিপিএলে বৃহস্পতিবার প্রথম ম্যাচের আগে এই পরিচালক পদত্যাগ না করলে সব ধরনের খেলা বন্ধ রাখবেন তারা।
এ নিয়ে বৃহস্পতিবার দিনভর চলে নানা নাটক। ক্রিকেটারদের বিভিন্ন আশ্বাস দিয়েও মাঠে ফেরাতে ব্যর্থ হয় বিসিবি। শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায় বৃহস্পতিবারের দুই ম্যাচ। যেখানে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল চট্টগ্রাম রয়্যালস ও নোয়াখালী এক্সপ্রেস এবং সিলেট টাইটান্স ও রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের। রোমাঞ্চ নিয়ে যারা মাঠে ঢুকেছিলেন, তাদের উত্তেজনা মিলিয়ে যায় গ্যালারিতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় থেকে। মাঠ ছাড়েন তারা হতাশা নিয়ে।
রাতে বিসিবি কর্তাদের সঙ্গে কোয়াবের বৈঠক শেষে জানানো হয়, দুই পক্ষের সমঝোতা হয়েছে এবং শুক্রবার থেকেই আবার চলবে বিপিএল। একদিন করে পিছিয়ে দেওয়া হয় ম্যাচগুলো। আগের সূচি অনুযায়ী, শুক্রবার দিনের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল রংপুর রাইডার্স ও ঢাকা ক্যাপিটালসের। সেটি এখন চলে গেছে শনিবারে। বৃহস্পতিবারের ম্যাচগুলি হচ্ছে শুক্রবারে।
এই পরিবর্তনের কথা যারা জানতেন না, প্রত্যাশিত ম্যাচ দেখতে না পেরে তারা হতাশ। রংপুর থেকে একসঙ্গে আসা তিন জনের একজন মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম যেমন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে বললেন, ম্যাচ পেছানোর বিষয় তারা জেনেছেন পরে।
“আমরা তো জেনেছি সকালে। কিন্তু আগে জানতাম না। খারাপ লেগেছে মানে, এই যে জার্সি গায়ে দিয়ে আসছি, কিন্তু কাজ হলো না। লিটন, সোহানদের খেলা দেখার জন্য এসেছি। কিন্তু দুঃখজনক এদের খেলা দেখতে পারলাম না। এটা খুবই দুঃখজনক… হামরা রংপুরের মানুষ বাহে।”
সিরাজগঞ্জের মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন খেলা দেখতে এসেছিলেন বৃহস্পতিবারও। কিন্তু অনেক অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত ফিরে যান তিনি।
“আমরা ঢাকা-রংপুরের ম্যাচ দেখতে আসছি। কালকেও আসছিলাম। কিন্তু খেলা হলো না। আমরা অনেকক্ষণ বসে থেকে, মানে সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে চলে গেছি। ভেবেছিলাম প্রথম ম্যাচ হয়নি, পরেরটি হয়তো হবে। কিন্তু কোনোটিই হলো না।”

ম্যাচ বর্জনের পথে না হেঁটে বোর্ড ও ক্রিকেটাররা বসে বিষয়টি সমাধান করা উচিত ছিল বলে মনে করেন ইসমাইল।
“এরকম না করে বোর্ড ও ক্রিকেটাররাই বসে সমাধান করতে পারত। এরকম করার দরকার ছিল না। দর্শকেরা… আমরা যেমন হয়রানির শিকার হলাম। আমাদের মতো তো আরও অনেক দর্শক এসেছিল। দুপুর পর্যন্ত সময় ছিল, কিন্তু (সমাধান করেনি)…. তাই আমরা বাধ্য হয়ে চলে গেছি।
বৃহস্পতিবার রাতে সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, অনির্দিষ্টকালের জন্য বিপিএল স্থগিত করে দিতে পারে বিসিবি। একদিন পরই যে আবার খেলা মাঠে ফিরবে, ভাবতে পারেননি ইসমাইল।
“ক্রিকেটাররা যে এত দ্রুত ফিরে আসছে, এতেই আমরা খুশি। আমরা তো মনে করছিলাম অনির্দিষ্টকালের জন্য বিপিএল স্থগিত হয়ে যাবে, ক্রিকেটাররা যে আজকে এ ম্যাচ খেলবে এরকম (ধারণা) ছিল না। যাই হোক, আজকে খেলা দেখব আমরা।”
ঢাকার মাসুম এসেছেন ঢাকা ক্যাপিটালসের ম্যাচ দেখতে। তিনিও হতাশ প্রিয় দলের খেলা দেখতে না পেরে।
“ঢাকার খেলা দেখার জন্য টিকেট কাটছি… অবশ্যই খারাপ লাগছে। চেহারা দেখে বোঝেন না! ঢাকার মানুষ, ঢাকার খেলা দেখতেই তো আসছি। বুঝতে তো হবে! এখন আমাদের দেখতে হবে নোয়াখালি আর চট্টগ্রামের খেলা।”
একইরকম কথা বললেন কিশোরগঞ্জ থেকে আসা রব্বানিও।
“আমরা কিশোরগঞ্জ থেকে এসেছি। আমরা মূলত ঢাকা আর রংপুরের ম্যাচ দেখতে এসেছিলাম। মনে অনেক কষ্ট, অনেক বেদনা আছে, যেহেতু ঢাকার সাপোর্ট করি, ঢাকার খেলা দেখতে আসছিলাম। মনে একটু আঘাতই লাগছে।”
সবকিছুর জন্য মূলত বিসিবিরই দায় দেখছেন রব্বানি।
“আসলে এখানে কী বলব, দর্শকেরা তো জানত খেলা হবে, যেহেতু বিসিবির ভেতরে একটা সমস্যা। সে কারণে তারা খেলা পিছিয়ে দিছে, এখানে দর্শকের তো কোনো দোষ নাই। সেক্ষেত্রে আমি মনে করব দোষটা বিসিবিরই। একটা ম্যাচও যদি দিত, তাহলেও দর্শক ঠান্ডা হতো।”

কেরানীগঞ্জ থেকে আসা সিরাজুলের ভাবনা আবার ভিন্ন। তিনি আঙুল তুলছেন ক্রিকেটারদের দিকে।
“দোষটা অবশ্যই ক্রিকেটারদের। খেলা বর্জন করার দরকার ছিল না এটা। এভাবে বিশৃঙ্খলা না করে হয়তো টেবিলের মাধ্যমে বসে সমাধান করা যেত, জনসম্মুখে না করে। ক্রিকেটাররাই তো বলে দর্শকরা ক্রিকেটের প্রাণ। যদি দর্শকেরা খেলা বর্জন করে, তাহলে তো ক্রিকেটের সৌন্দর্য থাকবে না। কিন্তু আমরা তার পরও ওদেরকে অনেক ভালোবাসা দেই।”
রাজশাহী থেকে আসা মোহাম্মদ শান্ত দায় দেখছেন দুই পক্ষেরই। দর্শকদের কথা সবারই মাথায় রাখা উচিত ছিল বলে মত তার।
“বিসিবির এটা খারাপ, এক দিক থেকে এটা খারাপ, আবার এক দিক থেকে ঠিক বলেছে। কিন্তু ক্রিকেটাররা যে বয়কট করছে, এটা ঠিক হয়নি। কারণ অনেক দর্শকের কষ্ট হইছে। অনেকে দূর দূরান্ত থেকে আসছে।”
ময়মনসিংহ থেকে সকাল ৭টায় রওনা দিয়ে ম্যাচ দেখতে এসেছেন চার জন। তাদের একজন রাজু আহমেদের মতে, এভাবে ম্যাচ পেছানো একদমই উচিত হয়নি।
“যে ম্যাচের টিকেট কাটছি, সেটা তো পাইলাম না, রংপুর আর ঢাকার। এই ম্যাচ (চট্টগ্রাম-নোয়াখালী) তো ১৮ তারিখেও দিতে পারত, এখন তো এ ম্যাচের জন্য সব ম্যাচের সূচি পাল্টানো লাগছে। আমরা তো ঢাকা আর রংপুরের ম্যাচের জন্য টিকেট কাটছি, হাইভোল্টেজ ম্যাচ। এ ম্যাচ দেখার জন্য আইছি।”
ক্রিকেটারদের নিয়ে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্য এবং সেটির জের ধরে ক্রিকেটারদের খেলা বন্ধ রাখার কারণেই সূচির এমন ওলট-পালট আর দর্শকদের এই ভোগান্তি।
সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ক্রিকেট অনুসারীদের অনেকেই বিপিএলের ম্যাচ বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন সামাজিক মাধ্যমে। বিসিবির সামনে প্রতিবাদ জানানোর ঘোষণাও দেন কেউ কেউ।
তবে শুক্রবার তেমন কিছু দেখা যায়নি। দুপুর ২টায় ম্যাচ শুরুর ঘন্টা দুয়েক আগে থেকেই শের-ই-বাংলার বিভিন্ন গেইটের সামনে দর্শকদের ভীড় দেখা যায় মাঠে ঢোকার জন্য। প্রথম ম্যাচ চলার সময়ই দর্শক সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়।