Published : 29 May 2026, 04:18 PM
ক্রিকেট তারকাদের তো একটা সময় অবসর নিতেই হয়। ক্রিকেট সমর্থকদেরও কি অবসর বলে কিছু আছে? আব্দুল জলিলের মতো বিখ্যাত সমর্থক হলে অবশ্য ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ বটে। তার অবসর ঘোষণার ব্যাপারটি এজন্যই উঠে এসেছে খবরের শিরোণামে।
বিশ্বের নানা প্রান্তে পাকিস্তানের খেলা মানেই গ্যালারিতে তার উপস্থিতি। ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিত ‘জলিল চাচা’ নামে। গায়ে পাকিস্তানের পতাকার আদলে গাঢ় সবুজ কুর্তা আর মাথায় টুপি, স্বতন্ত্র এই পোশাকে গ্যালারি থেকে দলকে সমর্থন দিয়ে আসছেন তিনি যুগ যুগ ধরে। এই দৃশ্যটিই সামনে আর দেখা যাবে না।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শনিবার শুরু হতে যাওয়া ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচ দিয়ে দেশের মাঠে শেষবার গ্যালারিতে থাকবেন তিনি। আগামী অগাস্ট-সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্তানের টেস্ট সিরিজে শেষবার তাকে দেখা যাবে গ্যালারি থেকে পতাকা নাড়তে।
সেই ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে ইংল্যান্ডের পাকিস্তান সফরে লাহোরে একটি ম্যাচে প্রথমবার তিনি গ্যালারি থেকে খেলা দেখেন। এরপর সেটিই হয়ে ওঠে তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ক্রিকেট বিশ্বজুড়ে তিনি পরিচিতি পেতে শুরু করেন গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে। শারজাহতে নিজের স্বতন্ত্র পোশাকে গ্যালারি থেকে সমর্থন জানিয়ে নজর কাড়েন তিনি সবার। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন তারকা সমর্থক ও ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে চেনা মুখগুলোর একটি।
তখনও পর্যন্ত তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে চাকরি করতেন। এক পর্যায়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানের দলের পূর্ণকালীন সমর্থক হয়ে যান। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছেন নানা সময়ে।

এখন এই ৭৭ বছর বয়সে সেই পথচলা থামিয়ে নিজ শহর শিয়ালকোটের উপকণ্ঠে একটি রেস্তোরাঁ ও জাদুঘর খোলার স্বপ্ন পূরণ করতে চান জলিল চাচা। ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোকে তিনি শুনিয়েছেন সেই স্বপ্নের কথা।
“আমি বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা সমস্ত স্মৃতিচিহ্ন জাদুঘরে প্রদর্শন করব। আমার লক্ষ্য ছিল ৫০০ ম্যাচে পাকিস্তানকে সমর্থন করা, যা আমি অর্জন করেছি।”
তারকাদের জন্য গলা ফাটিয়ে জলিল চাচা নিজেই পাকিস্তানে হয়ে ওঠেন বড় তারকা। স্থানীয় বিভিন্ন ক্রিকেট ম্যাচ, টেপ টেনিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে, বিয়ের অনুষ্ঠান বা সামাজিক বিভিন্ন আয়োজনে তার উপস্থিতি থাকে প্রবলভাবে কাম্য। তিনি এখন এই সুযোগটি অন্যদের উপকারে ব্যবহার করতে চান।
“খেলা এবং আমার দেশের প্রতি নিছক ভালোবাসার জন্য সবকিছু করেছি আমি। আমার লক্ষ্য ছিল দেশের একজন মহান দূত হওয়া এবং সব দলের সমর্থকদের খুশি করা। এখন অবসরের পর কিছু জনকল্যাণমূলক কাজ করার কথা ভাবছি।”
একসময় পাকিস্তানের খেলা দেখতে আবু ধাবিতে নিজের অফিস থেকে শারজাহ পৌঁছানোর জন্য তিনটি বাস বদলাতে হতো তাকে। কিন্তু তার পরও তার উৎসাহে কখনও ভাটা পড়েনি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আশাহত হয়েছেন দলের পারফরম্যান্সে। হতাশা থেকেই এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দেখতে শ্রীলঙ্কায় যাননি তিনি।
“ভারতের কাছে পাকিস্তানের টানা তিনটি পরাজয় দেখেছি আমি (গত এশিয়া কাপে)। আমরা এখন ভারতের কাছে টানা ৯টি ম্যাচ হেরেছি। আমি চাইনি এশিয়া কাপের পর তারা আর একটিও ম্যাচ হারুক।”
একটা সময় চিত্রটি ছিল ভিন্ন। বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াইয়ে ভারত সবসময় জিতলেও অন্যান্য ম্যাচে পাকিস্তানের দাপটই বেশির ভাগ সময় দেখা যেত। বিশেষ করে, শারজাহতে তারা ভারতের ওপর ছড়ি ঘোরাত নিয়মিত।
সমর্থক হিসেবে স্মরণীয় দুটি ম্যাচের কথাও বললেন জলিল চাচা।
“জাভেদ মিয়াঁদাদ যখন শেষ বলে চেতন শর্মাকে ছক্কা মেরেছিলেন (১৯৮৬ সালে শারজাহতে), আমি মাঠেই ছিলাম। স্পষ্ট মনে পড়ে, মিয়াঁদাদ তাকে ডিপ মিডউইকেটের ওপর দিয়ে মেরেছিলেন। আমার জন্য আরেকটি স্মরণীয় ম্যাচ ছিল যখন আমরা ২০১৭ সালে ওভালে ভারতকে হারিয়েছিলাম (চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে)।”
বেদনাদায়ক দুটি ম্যাচের স্মৃতিও তুলে ধরলেন তিনি। একটি ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে, আরেকটি ২০১১ ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে মোহালিতে। দুটিই ভারতের বিপক্ষে।
“তারা নিউ ইয়র্কে (২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে) ভারতের বিপক্ষে ১২০ রান তাড়া করতে পারেনি। আমি দলকে সমর্থন করার জন্য অনেক দূর ভ্রমণ করেছিলাম।"
“মোহালিতে ওই ম্যাচের জন্য আমি অনেক কষ্ট করে ভ্রমণ করেছিলাম। শ্রীলঙ্কা থেকে করাচি, তারপর শিয়ালকোট হয়ে ভারতে প্রবেশ করি। আমরা ম্যাচটি জিততে পারতাম, কিন্তু ভুল তো হয়ই। জয়-পরাজয় খেলারই অংশ।”
পাকিস্তান বর্তমানে সম্ভবত তাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের পর থেকে দেশের বাইরে কোনো টেস্ট জিততে পারেনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে সবশেষ দুটি টেস্ট সিরিজে তারা হোয়াইটওয়াশড হয়েছে। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের গত আসরে পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলানিতে থেকে শেষ করেছে এবং সাদা বলে গত চারটি আইসিসি টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে উঠতে পারেনি তারা।
জলিল চাচাও তাতে হতাশ। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা ছাড়ছেন না।
“হতে পারে ভাই, এরকম হয়েই থাকে। কখনও আগে, কখনও পেছনে, কখনও খুশি, কখনও দুঃখ, কখনও তারা জিতবে, কখনও আমরা…।”