অনেক অপেক্ষার প্রহর পেরিয়ে আবু হায়দারের ‘স্পেশাল’ দিন

বাইরে বসে থাকতে থাকতে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন এই বাঁহাতি পেসার, সেই সুযোগ পেয়েই উপহার দিলেন রেকর্ড গড়া বোলিং।

ক্রীড়া প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Feb 2024, 04:29 AM
Updated : 20 Feb 2024, 04:29 AM

ডাগ আউটে তখন আবু হায়দারের চোখেমুখে রাজ্যের অন্ধকার। নিজের ওপর বিরক্তির মতো ভঙ্গিও করলেন সেখানে বসে। বড় শটের চেষ্টায় তখন আউট হয়ে ফিরেছেন। ম্যাচ তাতে পড়ে গেছে পুরোপুরি দোলাচলে। শেষ পর্যন্ত শঙ্কার সেই স্রোত পেরিয়ে শেষ ব্যাটসম্যান হাসান মাহমুদের ব্যাটের ছোঁয়ায় জিততে পারল রংপুর রাইডার্স। আবু হায়দারের মুখও উজ্জ্বল হয়ে উঠল উদ্ভাসিত হাসিতে। তার অসাধারণ স্পেল আর রেকর্ড গড়া ৫ উইকেট তাহলে বিফলে গেল না!

ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে মিষ্টি হাসিতে সেটিই বললেন আবু হায়দার, “আমি ৫ উইকেট পেয়েছি। তবে আমরা যদি শেষ পর্যন্ত হেরে যেতাম, তাহলে ৫ উইকেটের কোনো মূল্য থাকত না। ম্যাচ জেতার জন্য দলের জন্য যদি ছোট ছোট পারফরম্যান্স করা যায়, ওটাই অনেক বড়।”

আবু হায়দার আউট হওয়ার পর ১৯তম ওভারে চারটি বল ঠেকিয়েছেন ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান হাসান মাহমুদ। শেষ ওভারে তার ব্যাটের কানায় লেগে বাউন্ডারি হয়ে জিতেছে রংপুরের। ছোট পারফরম্যান্স, কিন্তু বড় প্রভাব। এতে কোনো সংশয় নেই।

তেমনি সংশয় নেই, এই ম্যাচের নায়ক আসলে আবু হায়দারই। ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত হেরে গেলে তার নিজের বা দলের আক্ষেপ থাকত অবশ্যই। তবে ফরচুন বরিশালের ব্যাটিং বিধ্বস্ত করে দেওয়া তার স্পেলটি স্মরণীয় হয়েই থাকত।

চট্টগ্রামে মঙ্গলবার ১২ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন আবু হায়দার। বিপিএলের সব আসর মিলিয়ে বাংলাদেশের কোনো বোলারের যা সেরা বোলিং কীর্তি।

অথচ এবারের আসরে এটি আবু হায়দারের মাত্র দ্বিতীয় ম্যাচ! এই ম্যাচের আগে স্রেফ একটি ওভার বোলিং করতে পেরেছেন তিনি, রংপুরের সেটি ছিল ষষ্ঠ ম্যাচ। এমনকি বিশেষজ্ঞ পেসার হয়েও এই ম্যাচে তার বল হাতে পেতেই পেরিয়ে গেছে ১২ ওভার!

বরিশাল তখন ছুটছে প্রবল গতিতে। ১৮০ তো বটেই, আরও বেশি স্কোরে চোখ তখন তাদের। আবু হায়দার আক্রমণে এসেই এক ওভারে বিদায় করে দিলেন মুশফিকুর রহিম, সৌম্য সরকার ও দারুণ খেলতে থাকা কাইল মেয়ার্সকে। পরের ওভারে তার শিকার মাহমুদউল্লাহ, তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে মেহেদী হাসান মিরাজ। স্রেফ ১৩ বলেই ৫ উইকেট!

যেভাবে বোলিং করছিলেন, পরের ১১ বলে উইকেট না পাওয়াটাই ছিল বিস্ময়। রেকর্ড তবু হয়ে গেল তার। বরিশালের ব্যাটিং বিধ্বস্ত যেন চোখের পলকেই।

ক্রিকেটাররা সাধারণত রেকর্ড-পরিসংখ্যানের খবর ততটা রাখেন না। আবু হায়দারও বললেন, রেকর্ডের কথা তার জানা ছিল না।   

“এটা আসলে জানতাম না আমি…। ভালো লাগছে, ৫ উইকেট তো সবসময়ই একটা বোলারের জন্য স্পেশাল। আমার জন্যও স্পেশাল একটি দিন ছিল। চেষ্টা করব সামনের ম্যাচগুলিতে সুযোগ পেলে ভালো করার।”

এই ‘স্পেশাল’ দিনটির জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে অনেক। দিনের পর দিন অনুশীলনে নিজেকে উজাড় করে দিতে হয়েছে। তাতে তার অভিযোগ নেই। বরং টিম ম্যানেজমেন্টকে ধন্যবাদই জানালেন।

“বাইরে বসে থাকা কখনোই সুখকর নয়। সবসময়ই ব্যাক অব দা মাইন্ড কাজ করে যে বাইরে বসে আছি। চেষ্টা করছিলাম অনুশীলনে ভালো করতে, ম্যানেজমেন্ট যেন আমার ওপর বিশ্বাস করে যে আমি পারব। আমার ওই চেষ্টাই হয়তো উনারা ভালোভাবে নিয়েছে। এজন্য আমাকে সুযোগ দিয়েছে।”

“আমি সবসময় চেষ্টা করি, যখনই সুযোগ পাই নিজের সেরাটা যেন দিতে পারি। কখনও নিজের সঙ্গে প্রতারণা করি না।”

এই ম্যাচের একাদশে যখন জায়গা পেলেন, ভালো কিছুর ছবি তখন থেকেই আঁকতে শুরু করেছিলেন তিনি ভাবনায়। ৫ উইকেট বা অসাধারণ কিছু তো আর ভেবে করা যায় না। তবে ছাপ রাখতে চেয়েছিলেন তিনি মাঠে নেমে।

“ম্যাচ শুরুর আগে কেউই চিন্তা করে না যে এত ভালো করব, ম্যাচ-সেরা হব। ব্যাক অব দা মাইন্ড থাকে যে, ভালো করার জন্য নেমেছি, দলকে যেন ইম্প্যাক্ট পারফরম্যান্স দিতে পারি। আজকে একটি ওভারেই দলের মোমেন্টাম বদলে গিয়েছে। এটাই সবাই চিন্তা করে যে, আমি যেন দলকে সহায়তা করতে পারি।”

এমনিতে তিনি সুইং বোলার। নতুন বলেই বেশি কার্যকর। তবে এ দিন বোলিংই পেয়েছেন ত্রয়োদশ ওভারে। তিনিও তাই ম্যাচের পরিস্থিতি আর উইকেটের চরিত্র বুঝে নিজের বোলিংয়ের ছক সাজিয়েছিলেন।

“আমার পরিকল্পনা ছিল একদম সিম্পল। সিম্পল পরিকল্পনাতেই বল করেছি। যেহেতু দেখছিলাম যে, উইকেটে ব্যাক অব দা লেংথ হিট করতে পারলে বাউন্স একটু বেশি করছিল, আমার এই পরিকল্পনাই ছিল যেন উইকেট বরাবর হার্ড লেংথে বল করতে পারি, ব্যাটসম্যানরা যেন থ্রু দা লাইন খেলতে না পারে।”

“এটাই… সাধারণ পরিকল্পনা ছিল। আমি বেশি কিছু পরিবর্তন করিনি। একটা পরিকল্পনাতেই থেকেছি। এজন্যই হয়তো সফল হয়েছি।”

এই সফলতার স্বাদ তিনি আগেও পেয়েছেন বিপিএলে। যদিও বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে এসেছেন তিনি। ২০১২ অনূধর্ব-১৯ এশিয়া কাপে বাংলাদেশের হয়ে এক ম্যাচে ১০ রানে ৯ উইকেট নিয়ে চমকে দিয়েছিলেন। তবে দেশের ক্রিকেটে সাড়া জাগিয়েছেন তিনি বিপিএল দিয়েই। ২০১৫ আসরে চমকপ্রদ পারফরম্যান্সে ২১ উইকেট নিয়ে কুমিল্লা ভিক্টারিয়ান্সের শিরোপা জয়ে রেখেছিলেন বড় অবদান। সেবার তার সুইং, নিয়ন্ত্রণ আর দুর্দান্ত ইয়র্কার নজর কেড়েছিল সবার।

সম্ভাবনার পথ ধরে একসময় জাতীয় দলেও ঠাঁই পান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন। তবে সেই বিচরণ দীর্ঘায়িত হয়নি বেশি। ২টা ওয়ানডে ও ১৩ টি-টোয়েন্টিতেই আপাতত থমকে আছে ক্যারিয়ার। সবশেষটি ছিল সেই ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে।

ঘরোয়া ক্রিকেট অবশ্য পারফর্ম করে যাচ্ছেন। চড়াই-উতরাই এখানেও ছিল তার। সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে তাই কাজ করে চলেছেন।

“যত বড় খেলোয়াড়ই আছে… আমি হয়তো অত বড় খেলোয়াড় নই, তবে সবারই খারাপ সময় যায়। আমি জাতীয় দলে খেলেছি, বাদ পড়েছি, এর মানে এই নয় যে আমি ক্রিকেট খেলছি না। ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো দাপট দেখিয়েই খেলি, এখনও পর্যন্ত যা খেলছি।”

“হয়তো ওই লেভেলটা ধরতে পারিনি, হয়তো ঘাটতি ছিল, মাঝখানে গতি কমে গিয়েছিল। আমি ওটা নিয়ে কাজ করছি, শক্তি বাড়ানো নিয়ে কাজ করছি। রান আপ দিয়ে কাজ করেছি। রান আপের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। আর বল ডেলিভারির সময় হাতেই সুইং যেন আরেকটু দ্রুত করা যায়, তা নিয়ে কাজ করেছি। এখনও কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। চেষ্টা করছি আরও উন্নতি করতে।”

উন্নতির এই পথ ধরেই আপাতত তিনি ছুটতে চান। একটি ম্যাচ দিয়েই আবার হইচই ফেলে দেবেন, জাতীয় দলে ফিরবেন, এখনই এমন স্বপ্ন তিনি দেখছেন না। বরং পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা দিয়েই একটু একটু করে নিজেকে আবার জানান দিতে চান ২৮ বছর বয়সী পেসার।

“আসলে একটা ম্যাচ দিয়ে তো সব মিলিয়ে চিন্তা করলে হবে না। আমি বললামই, যেখানে খেলি, চেষ্টা করি ভালো করার। যেহেতু আজকের ম্যাচ ভালো হয়েছে, চেষ্টা করব যেন ম্যাচ বাই ম্যাচ ভালো করতে পারি।”

“ভালো পারফরম্যান্স করলে সবাই আপনাকে নিয়ে কথা বলবে। ভালো না করলে বলবে না। ভালো পারফরম্যান্সের বিকল্প নেই। আমি চেষ্টা করছি ভালো করার। বাকিটা ওপরওয়ালার ইচ্ছা।”