Published : 23 Sep 2025, 09:49 AM
বিসিবির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের শেষ সভা শুরু হওয়ার কথা ছিল সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। কিন্তু পৌনে সাতটার দিকে পরিচালকদের জানানো হয়, সভাটি শুরু হবে রাত সাড়ে ৯টায়। স্রেফ অল্প সময়ের কিছু আনুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও সেই সভা শেষ হলো প্রায় মধ্যরাতে। এরপর জানানো হলো, সভার মূল যে উদ্দেশ্য, বিসিবি নির্বাচনের কাউন্সিলর বা ভোটার তালিকার খসড়া অনুমোদন, সেটি হয়নি এ দিনও!
দুই দফা বাড়িয়ে কাউন্সিলর চূড়ান্ত করার শেষ সময় নির্ধারিত হয়েছিল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় জানানো হয়েছিল, বোর্ড সভায় অনুমোদনের পর সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় প্রকাশ করা হবে খসড়া ভোটার তালিকা। তফসিলের বরখেলাপ তাই হয়ে গেল শুরুতেই।
এর আগেও দিনজুড়ে নির্বাচন ঘিরে হয়েছে নানা নাটক। কাউন্সিলরদের নাম পাঠাতে দ্বিতীয় দফায় সময় বৃদ্ধি করে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত যে চিঠি গত বৃহস্পতিবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো হয়, সেটি স্থগিত করে দেন হাই কোর্ট। এই চিঠির কার্যকারিকা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন রাজবাড়ির কাউন্সিলর মঞ্জুরুল আলম, গোপালগঞ্জের জসিম উদ্দিন খসরু, লক্ষ্মীপুরের মঈনুদ্দিন চৌধুরী ও টাঙ্গাইলের আলী ইমাম। তবে ঘণ্টা দেড়েক পরই হাইকোর্টের এই আদেশ আগামী রোববার পর্যন্ত স্থগিত করে দেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
বিসিবিরি নির্বাচন সময়মতো হওয়ায় কোনো বাধা অবশ্য ছিল না এই রিট ও পাল্টা রিটের পালায়। তবে নির্বাচনে ভোট দেবেন কারা, সেটি নিয়ে খেলাই যে শেষ হচ্ছিল না!
কাউন্সিলরদর নাম জমা দেওয়ার শেষ সময় সন্ধ্যা ৬টা হলেও রাত ৯টার পরও কাউন্সিলদের নাম আসছিল বোর্ডে। নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গত মে মাসের শেষ দিকে বিসিবি সভাপতির পদ হারানো ফারুক আহমেদের নাম কাউন্সিলর হিসেবে এসেছে যেমন রাত ৯টার পর!
বোর্ড সভা শেষে বিসিবি পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির প্রধান ইফতেখার রহমান তফসিলের বরখেলাপের কারণ ব্যাখ্যায় জানান, যেহেতু এ বিষয়ে আদালতে দুটি রিট হয়েছে, আদালতের চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ না পাওয়া পর্যন্ত তারা আলোচনায় বসতে চাননি। আদালতের নির্দেশনা গভীরভবে অনুধাবন করার জন্যই এই দেরি বলে দাবি তাদের।
এই সংবাদ সম্মেলনেই উপস্থিত বিসিবির আইনজীবী মাহিন রহমান জানান, সোমবার চেম্বার জজ আদালতে রিট সংক্রান্ত আরেকটি শুনানি হবে।
বিসিবি পরিচালক ইফতেখার জানান, কাউন্সিলর হিসেবে কার নাম কটার সময় এসেছে, সেটির নোট রেখে তারা নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছেন। বাকি সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের।
জেলা ও বিভাগ থেকে বিসিবির কাউন্সিলর মনোনয়ন নিয়ে গত বেশ কিছুদিন ধরেই তুমুল যে বিতর্ক চলছে, সেটিই আরও জটিল মোড়ে পৌঁছে গেল তফসিলের বরখেলাপের ঘটনা। কাউন্সিলর কাউন্সিলর মনোনয়ন করতে বিভাগীয় ও জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে চিঠি দেওয়া হয় গত ১ সেপ্টেম্বর। তখন শেষ সময় ছিল গত বুধবার। এর মধ্যেই জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা থেকে কাউন্সিলর মনোনীত হয়েছিলেন সাবেক খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকদের অনেকে। কাউন্সিলর মনোনীত ফর্ম বিসিবিতে জমাও হয়েছিল সময়মতো।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো বিসিবি সভাপতি স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়, বিসিবির কাউন্সিলর হিসেবে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের মধ্য থেকে নাম প্রেরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হয়নি। আগের ফর্ম বাতিল করে নতুন করে পুরো পক্রিয়া করতে সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।
দ্বিতীয় দফা সময় বাড়ানো নিয়ে বিতর্কের ঝড় চলছে তখন থেকেই। সাবেক জাতীয় অধিনায়ক, বিসিবি নির্বাচনের কাউন্সিলর ও সম্ভাব্য পরিচালক পদপ্রার্থী তামিম ইকবাল গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, কোনো পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা না করেই বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলাম দ্বিতীয় দফায় সময় বাড়িয়েছেন। মঙ্গলবার গভীর রাতের সংবাদ সম্মেলনে সেটি দিয়ে ধোয়াশাঁ বেড়েছে আরও।
বিসিবির আইনজীবী মাহিন রহমানের দাবি, শনিবারের বোর্ড সভায় সর্বসম্মতিক্রমেই সোমবার পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। পরিচালক ইফতেখার রহমান বলেন, বিসিবি সভাপতির ক্ষমতাবলে ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে বাড়িয়ে কাউন্সিলরদের নাম জমা দেওয়ার শেষ সময় ২২ সেপ্টেম্বর করেছেন আমিনুল ইসলাম।
দুইজনের এই দুইরকম দাবির পর সাম্প্রতিক বিতর্কগুলোই আরও প্রবলভাবে প্রকাশ্য হচ্ছে। বিসিবি নির্বাচনে নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রেরণে সরকারি হস্তক্ষেপ ও সভাপতির নির্বাহী ক্ষমতার অপপ্রয়োগের প্রতিবাদে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলন কর হয় বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় এবং ক্লাবের সকল পর্যায়ের ক্রিকেট খেলোয়াড় ও সংগঠকবৃন্দের ব্যানারে।
ওল্ড ডিওইচএস ক্লাবের কাউন্সিলর তামিম ইকবাল সেখানে অভিযোগ করেন, বিসিবি নির্বাচনে ক্রীড়া উপদেষ্টা ও সরকারের একটি অংশ হস্তক্ষেপ করছে সরাসরি। নির্বাচন ঘিরে ‘নোংরামি’ হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “বিসিবি নির্বাচনে যা হচ্ছে তা আসলে নির্বাচন নয়, বরং সিলেকশন চলছে।” সেই সংবাদ সম্মেলনেই ব্রাদার্স ইউনিয়নের কাউন্সিলর ও বিনএনপি নেতা ইশরাক হোসেন হুমকি দেন, “বিসিবি নির্বাচনে সরকারের হস্তক্ষেপ স্পষ্ট। সরকার নিরপেক্ষ নয়, বরং নানাভাবে প্রভাব খাটাচ্ছে। যদি এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হয়, প্রয়োজনে বিসিবি ঘেরাও করা হবে।”
সেদিন সরকারি হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ জানান বিসিবির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বাবু, সাবেক পরিচালক সিরাজউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর, সাবেক পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান, সম্ভাব্য পরিচালক পদপ্রার্থী ইসরাফিল খসরুসহ আরও অনেকেই।
বিসিবিতে এখন কাজের পরিবেশ নেই উল্লেখ করে সেই সংবাদ সম্মেলনেই ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সংস্থাটির ভাইস-চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামান। হস্তক্ষেপ চলতে থাকলে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণা দেন সাবেক পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ফুয়াদ রেদোয়ান।
এসবের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠল সোমবারের ঘটনাপ্রবাহে। তফসিল অনুযায়ী, খসড়া ভোটার তালিকার ওপর আপত্তি গ্রহণ করার কথা মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। কিন্তু সেই ভোটার তালিকাই তো এখনও চূড়ান্ত নয়!
বিসিবি পরিচালক ইফতেখার জানালেন, খসড়া ভোটার তালিকা নির্ধারিত সময়ে প্রকাশ না হওয়ায় নির্বাচনের সূচিতে আর কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন।
তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৬ অক্টোবর হওয়ার কথা পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন। এরপর সেদিন রাতেই হওয়ার কথা সভাপতি ও সহ-সভাপতি নির্বাচন।