Published : 21 Jun 2026, 10:28 PM
ক্রিস গেইলের সঙ্গে কাইরন পোলার্ডের সম্পর্ক দারুণ। দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এবার রানের তালিকায় গেইলকে ছাড়িয়ে একটু মজা করার উপলক্ষ পেয়ে গেলেন পোলার্ড। পাশাপাশি তিনি শোনালেন গর্বের কথাও। মিডল অর্ডার ও লোয়ার মিডল অর্ডারে খেলে টি-টোয়েন্টির রানের তালিকায় চূড়ায় ওঠা তো চাট্টিখানি কথা নয়!
২০১৪ সালের মার্চ থেকে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটি ছিল গেইলের। ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে, কারণ এখন আর নেই। বাংলাদেশ সময় রোববার সকালে তাকে ছাড়িয়ে গেছে পোলার্ড। মেজর লিগ ক্রিকেটের ম্যাচে ৫৬ বলে ১০০ রানের ইনিংসটির পথে রেকর্ডটি নিজের করে নিয়েছেন তিনি।
১৪ হাজার ৫৬২ রান নিয়ে ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে গেইলের। পোলার্ডের রান এখন ১৪ হাজার ৫৬২।
রেকর্ডের পর গেইলের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা জানিয়ে একটু মজাও করলেন পোলার্ড।
“ক্রিস গেইলকে ছাড়িয়ে যাওয়াটা বিশেষ কিছু, যাকে আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজে একটা সময় ধরে আদর্শ হিসেবে দেখতাম। তিনি ক্রিকেটের সব সংস্করণেই দুর্দান্ত করেছেন, তাই আবারও বলছি, ‘সরি ইউনিভার্স বস’, কিন্তু এই ক্ষেত্রে আমরা দুজনেই শীর্ষে আছি।”
রানের রেকর্ড তো এমনিতেই বিশেষ কিছু। পোলার্ডের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি স্পেশাল আরেকটি কারণে। ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় যে মিডল ও লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাট করেছেন তিনি! টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওসব পজিশনে ব্যাট করে বড় ইনিংস খেলার সুযোগ এসেছে কালেভদ্রে। বেশির ভাগ সময়ই ক্রিজে গিয়ে ঝুঁকি নিতে হয়েছে। তার পরও রেকর্ডটি তিনি গড়েছেন। সেই গর্ব মিশে থাকল তার প্রতিক্রিয়ায়।
“একথা ঠিক যে, ৬ বা ৭ নম্বরে ব্যাটিং করা খুবই কঠিন। কিন্তু অপ্রিয় কাজটা তো কাউকে না কাউকে করতেই হয়! যদিও সবাই টপ অর্ডারে ব্যাট করার জন্য উঠেপড়ে লেগে থাকে, একটি ক্রিকেট ম্যাচে ১১ জন খেলোয়াড় থাকে এবং প্রত্যেকেরই একটি ভূমিকা পালন করার থাকে।”
“আমার মনে হয়, সময় যত গড়িয়েছে, আমার ভূমিকা ছিল ম্যাচ শেষ করা এবং আমি তা সানন্দে গ্রহণ করেছিলাম। একবার চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করে সেজন্য অনুশীলন শুরু করলে, ভালো কিছু ঘটেই যায়।”
গেইল তার ৪৫৫ ইনিংসের ক্যারিয়ারে স্রেফ ৬টি ইনিংস ছাড়া বাকি সব খেলেছেন টপ অর্ডারেই। পোলার্ড চার নম্বরে ব্যাট করেছেন ৯৭ ইনিংসে, পাঁচ ও ছয় নম্বরে ব্যাট করেছেন ৪৬১ ইনিংসে, এমনকি সাত ও আট মিলিয়ে খেলেছেন ৭৩ ইনিংস।
ওসব পজিশন থেকে বড় ইনিংস খেলা কঠিনই ছিল। এজন্যই গেইলের সেঞ্চুরি যেখানে ২২টি, পোলার্ডের সেখানে মাত্র দুটি। কিন্তু পোলার্ড বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধু রচনা করেছেন।
গেইলের রান ছাড়িয়ে যেতে ১৯৮ ইনিংস বেশি লেগেছে পোলার্ডের। কিন্তু সেখানেই মিশে আছে তার দীর্ঘ পথচলা, অধ্যবসায় ও ধারাবাহিকতার প্রমাণ।
পোলার্ড অবশ্য একসময় ভাবতেও পারেননি, এই রেকর্ড তার হাতে পারে। তবে পেছন ফিরে তাকিয়ে তিনি সংশয়বাদী ও সমালোচনাকারীদের দিকে তির ছুড়তে ভুললেন না।
গেইল, পোলার্ড, ডোয়াইন ব্রাভোর মতো ক্রিকেটাররা পেশাদার ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটার হয়ে ওঠার অগ্রপথিক। বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে সরে তারা ‘ফ্রিল্যান্স’ ক্রিকেটার হয়েছিলেন। পরে সুনিল নারাইন, আন্দ্রে রাসেলরাও একই পথে পা বাড়ান। সেসব তাদেরকে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছে প্রবলভাবে। এখন এটিই খুব স্বাভাবিক চিত্র। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে নিয়মিত খেলার জন্য বোর্ডের চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানো, তরুণ বয়সেই অবসর নেওয়া, এসব এখন হরহামেশাই হচ্ছে।
সেটিই মনে করিয়ে দিয়ে পোলার্ড বললেন পরির্তনকে আলিঙ্গন করে নেওয়ার মানসিকতা রাখতে।
“নাহ, কোনোভাবেই না। যদি বলি যে, এটা (এত রান করার কথা) ভাবনায় ছিল, তাহলে মিথ্যা বলা হবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে এবং ক্রিসের মতো আপনার উল্লেখ করা অন্য সবার সঙ্গে যে বিষয়টি নিয়ে গর্বিত, তা হলো আমরা বিশ্বাসের উপর ভরসা করে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছিলাম এবং এর জন্য আমাদের অনেক উপহাসের শিকার হতে হয়েছিল। এখন আপনি দেখতে পাবেন যে অল্প বয়সেই ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট খেলছে, কারণ ক্রিকেট এখন আর শুধু একটি খেলা নয়; এটি একটি ব্যবসাও।”
“মানুষ সম্পর্কে জীবনে একটি জিনিস বুঝেছি যে, যখন কেউ ভিন্ন কিছু করে, সেই পরিবর্তনটা অনেকে মেনে নিতে পারে না। আমি খুশি যে আমি এই দিনটি দেখার জন্য বেঁচে আছি, এবং আশা করি, যারা বছরের পর বছর ধরে আমাদের সমালোচনা করেছেন, তারা এখন বলতে পারেন, ‘চিয়ার্স।’ কাউকে বলছি না যে ক্ষমা চাইতে হবে। শুধু খেলার প্রতিটি সংস্করণকে সম্মান করুন এবং বুঝুন যে, প্রযুক্তির মতোই সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে।”
পোলার্ডের বয়স এখন ৩৯ পেরিয়ে গেছে। আইপিএলে খেলা ছেড়ে দিয়ে গত তিন মৌসুম ধরেই মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ব্যাটিং কোচ। দা হান্ড্রেডে তিনি প্রধান কোচ। ইংল্যান্ড জাতীয় দলেও সহকারী কোচ ছিলেন। এই তো, পাঁচ দিন পরই তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের বয়স পূর্ণ হবে ২০ বছর। তবে খেলা পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত এখনও নেননি তিনি।
“আমার মনে হয়, এটা ব্যক্তিগত গর্ব, অনুপ্রেরণা, খেলাটি খেলার ইচ্ছা এবং আমি যে দলের হয়েই খেলি না কেন, সেখানকার তরুণদের সাহায্য করার ইচ্ছার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। এই আকাঙ্ক্ষাটা থাকলে খেলা চালিয়ে যাব। আমি শুধু এই মুহূর্তটা উপভোগ করছি।”
“শারীরিকভাবে নিজেকে ফিট রাখতে পারলে, ক্রিকেটের ‘মাসল মেমোরি’ সবসময় থেকে যায়। আইপিএলের পর বাড়ি গিয়ে তিন-চার দিন ছুটি নিয়েছিলাম এবং তারপর আড়াই সপ্তাহ ধরে খুব ভোরে কঠোর অনুশীলন করেছি। যেমনটা আমি বলেছি, আমার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে ব্যক্তিগত গর্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো টুর্নামেন্টে অপ্রস্তুত হয়ে এসে শুধু নামের খাতিরে খেলব, এমনটা হতে পারে না। উঠতি তরুণদের জন্য এটা সঠিক উদাহরণ নয়।”
১৪ হাজার ৫৮২ রানের পাশাপাশি পোলার্ড টি-টোয়েন্টিতে উইকেট নিয়েছেন ৩৩৩টি। এছাড়া এই সংস্করণে চারশ ক্যাচ নেওয়া (৪০৫) একমাত্র ক্রিকেটারও তিনি।