Published : 28 May 2026, 02:41 PM
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনও পা পড়েনি বৈভাব সুরিয়াভানশির। কিন্তু মাইকেল ভনের মতো একজন, যিনি অনেক ক্ষেত্রেই বেশ সূচারু বিশ্লেষণ করেন, সেই তিনি অকপটে বলে দিলেন, “সে এখন বিশ্বের সেরা টি-টোয়েন্টি ওপেনার… ভারতের তাকে দলে নিতেই হবে।”
সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়কের এই মন্তব্য স্রেফ ছোট্ট একটি নমুনা। সাচিন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে সানাৎ জায়াসুরিয়া, আরও অনেক গ্রেট কিংবা কিংবদন্তি, সাবেক ক্রিকেটারদের আরও অনেকে, সবাই যেন বিস্ময় ও মুগ্ধতায় ডুবে গেছেন সুরিয়াভানশিকে দেখে।
এসব অবশ্য নতুন কিছু নয়। গত বছর আইপিএলে আবির্ভাবের পর থেকেই তো তিনি চমকের পর চমক উপহার দিয়েছেন। প্রশংসা আর স্তুতির জোয়ার বয়ে গেছে তাকে নিয়ে। সেসবই নতুন উচ্চতা ছুঁয়েছে আর নতুন সীমানা প্লাবিত করেছে এবারের আইপিএলে। বিশ্ব ক্রিকেটে তাকে নিয়ে বিস্ময় এবং তোলপাড়ও নতুন কিছু নয়। কিন্তু ভারতের ১৫ বছর বয়সী ‘ওয়ান্ডার কিড’ এতটাই অসাধারণ যে, কল্পনার সীমানা ছাড়িয়েও নতুন করে বিস্ময় তিনি উপহার দিচ্ছেন।
আইপিএলের এলিমিনেটর ম্যাচে বুধবার ১২ ছক্কায় তার ২৯ বলে ৯৭ রানের ইনিংসের ঢেউ নিউ চান্ডিগাড় থেকে আছড়ে পড়েছে ক্রিকেট বিশ্বের নানা প্রান্তে। তাকে বর্ণনায় যেন উপযুক্ত ভাষা খুঁজে হয়রান হচ্ছেন বিশ্ব ক্রিকেটের বড় তারকারাও।
যার সামান্য প্রশংসাও অনেকের আরাধ্য, ভারতের ক্রিকেট ইশ্বর সাচিন টেন্ডুলকার, তিনি আলাদা করে বললেন সুরিয়াভানশির একটি শটের কথা, যেটি দেখে বিস্ফোরিত হয়ে গেছে তার দৃষ্টি।
“বৈভাব সুরিয়াভানশির ব্যাট সুইং ছিল অসাধারণ। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পায়ের দিকে আসা বলগুলোর জন্য জায়গা তৈরি করতে কত সুন্দরভাবে সে সামনের পা সরিয়ে নেয়। এটিই তাকে স্বাধীনভাবে শট খেলতে সাহায্য করে।”
“এই ইনিংসটি ছিল এক কথায় দর্শনীয়!”
টি-টোয়েন্টিতে এক টুর্নামেন্টে ক্রিস গেইলের ৫৯ ছক্কার রেকর্ড পেরিয়ে এই ম্যাচ শেষে সুরিয়াভানশির ছক্কা এখন ৬৫টি। সেই রেকর্ডের কথাই বললেন ইউভরাজ সিং, যার নিজের ব্যাট সুইং ছিল ক্রিকেট বিশ্বে বিখ্যাত।
“ওয়ার্ল্ড বসের রেকর্ড ভেঙে দিল বেবি বস! অবিশ্বাস্য… বাচ্চা ছেলেটাকে দেখতে অসাধারণ লাগে!”

গেইলের ‘ইউনিভার্স বস’ নামের সঙ্গে মিলিয়ে সুরিভানশিকে এখন ‘ইউনিভার্স বেবি বস’ নামে ডাকতে শুরু করেছেন অনেকে। টিভি পর্দায় ‘ইউনিভার্স বেবি বস’ লেখা স্ক্রিনশট সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে গেইল নিজে লিখেছেন, “কী অভূতপূর্ব এক ক্রিকেটার বৈভাব! দারুণ বিনোদন, ইয়াং ম্যান! নতুন ছক্কা মেশিন।”
সুরিভানশিকে ‘ছক্কা মেশিন’ স্বীকৃতি দিলেন ভারতের অফ স্পিনিং গ্রেট ‘টারবুনেটর’ নামে খ্যাত হারভাজান সিং।
“একদিকে গোটা বিশ্ব, অন্যদিকে এই ক্রিকেটার। সবচেয়ে অনন্য, সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যাটসম্যান। ছক্কা মেশিন, আমাদেরই বৈভাব সুরিয়াভানশি।”
মারকাটারি ব্যাটিং আর ছক্কার ঝড়ে একসময় যিনি ক্রিকেটের ধারা বদলে দিয়েছিলেন, সেই সানাৎ জায়াসুরিয়া রোমাঞ্চিত নতুনের আবাহনে।
“বৈভাবের কী দারুণ হিটিং! খুবই স্পেশাল প্রতিভা, এই বয়সেই কত প্রবল আত্মবিশ্বাস। স্পেশাল একজন ক্রিকেটার উঠে আসছে ক্রিকেটে।”
সুরিয়াভানশির বয়স নিয়ে বিতর্ক বা আলোচনাগুলোকে উড়িয়ে অলরাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল তুলে ধরলেন বিস্ময়-বালকের মহিমা।
“অভিনন্দন ইয়াং স্টার! বিদ্বেষীরা বলবে, তোমার বয়স ১৫ বছর নয়। কিন্তু তাতে কী আসে যায়! ৩০ বছর বয়সী ক্রিকেটাররাও এখানে তোমার মতোই করার জন্য নিজেদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করছে। চালিয়ে যাও, আমি তোমার একজন বড় ভক্ত। স্রেফ বল দেখো আর মারো।”
এই ম্যাচে ৯৭ রানে দাঁড়িয়েও শতরানের জন্য না খেলে ছক্কার চেষ্টায় আউট হয়েছেন সুরিয়াভানশি। এক ম্যাচ আগেই ৯৩ রানে তিনি আউট হন বড় শটের চেষ্টায়। মাইলফলকের জন্য না খেলে দলের জন্য খেলার দিকটি তুলে ধরলেন সাবেক ব্যাটসম্যান সাঞ্জায় মাঞ্জরেকার।
“মারকুটে দক্ষতার পাশাপাশি বৈভাব সুরিয়াভানশির যে বিষয়টি ভালো লাগার মতো তা হলো, তার কাছে অর্ধশতক ও শতকগুলো যেন স্রেফ আনুষঙ্গিক। প্রতিটি বলকেই সে সজোরে পেটাতে চান। ৯৭ রানে থাকার সময়ও সে বড় শট খেলেছে!”
সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডার ও আইপিএল দল লাক্ষ্নৌ সুপার জায়ান্টসের ‘গ্লোবাল ডিরেক্টর অব ক্রিকেট’ টম মুডি তো কোনো ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যাই খুঁজে পাচ্ছেন না সুরিভানশিকে নিয়ে। সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান বলে বিবেচিত স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের প্রসঙ্গও তুলে আনলেন তিনি এখানে।
“আমার মাথায় ঠিক ঢুকছে না যে, কীভাবে এটা ব্যাখ্যা করব। এটা ব্যাখ্যা করার একমাত্র উপায় হলো, কাউকে এটা দেখতে বলা এবং তাকে নিজের মতো করে বর্ণনা দিতে বলা। কারণ, আমরা এমন কিছুর সাক্ষী হচ্ছি, যা আমার মনে হয় না খেলাটির এই সংস্করণে, বা এমনকি অন্য কোনো সংস্করণেও আমাদের জীবদ্দশায় আর দেখেছি। আমরা অসাধারণ অনেক কিছু দেখেছি, কিন্তু এতটা এই পর্যায়ের কিছু দেখিনি।”
“আমি শুধু ব্র্যাডম্যানের কথাই এখানে বলতে পারি। টেস্ট ক্রিকেটে ব্র্যাডম্যানের গড় ছিল প্রায় ১০০, তার পরের সেরা গড় ৬০-এর আশেপাশে। সুতরাং, আমরা এত বড় পার্থক্যটার কথাই বলছি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সে এমন ব্যবধানই গড়ে দিচ্ছে এবং সেটি স্রেফ ১৫ বছর বয়সেই।”
বিস্ফোরক ইনিংসে একসময় আইপিএল ও বিশ্ব ক্রিকেট মাতিয়েছেন যিনি, সেই এবি ডি ভিলিয়ার্স মুগ্ধ চাপের মধ্যেও সুরিয়াভানশিকে অবিচল দেখে।
“মাত্র ১৫ বছর বয়সে চাপের মুখে স্থিরতা এবং স্বচ্ছতাই সুরিয়াভানশির ইনিংসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। প্যাট কামিন্স এবং সানরাইজার্স হায়দরাবাদ তার ছন্দ নষ্ট করার জন্য ক্রমাগত ফিল্ডিং পরিবর্তন এবং বিভিন্ন লেংথের বল করে নানা কৌশল অবলম্বন করছিল, কিন্তু সে ইনিংসজুড়েই নিজের জগতে পুরোপুরি নিমগ্ন ছিল। একটি নকআউট ম্যাচে এত অল্পবয়সী একজনের এই মাত্রার সচেতনতা সত্যিই অসাধারণ।”
“তারা শর্ট বল করুক বা ফুল লেংথ ডেলিভারি দিয়ে তাকে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করুক, তাকে প্রতিটি কৌশলের জন্যই প্রস্তুত মনে হচ্ছিল এবং সবকিছুর বিপক্ষেই সে নিয়ন্ত্রণে ছিল। একটি এলিমিনেটর ম্যাচে মাত্র ২৯ বলে ৯৭ রান করা এবং মাঠের সবদিকেই আধিপত্য বিস্তার করাটা ছিল ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ের এক অসাধারণ প্রদর্শনী এবং এটিই দেখিয়ে দিয়েছে, আইপিএলে সবচেয়ে বিস্ফোরক খেলোয়াড়দের মধ্যে তার নাম এখনই কেন উচ্চারিত হচ্ছে।”
চাপকে পাত্তা না দেওয়া ও প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ধ্বংস করে দেওয়ার ব্যাপারটি বললেন কিংবদন্তি স্পিনার আনিল কুম্বলেও।
“মৌসুমজুড়েই সুরিয়াভানশি দেখিয়েছে যে, চাপ তাকে মোটেই প্রভাবিত করে না এবং এই ইনিংসটি ছিল সেটিরই আরেকটি উদাহরণ। মাত্র ২৯ বলে সে খেলার মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দিয়েছে এবং শুরু থেকেই সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদকে প্রচণ্ড চাপে ফেলে দিয়েছে। প্যাট কামিন্স এবং অন্য বোলাররা পরিকল্পনা নিয়েই মাঠে নেমেছিল, কিন্তু প্রথম দুই-এক ওভারের মধ্যেই সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, কারণ তারা বুঝতেই পারছিলেন না, তাকে কোথায় বল করতে হবে।”
“১৫ বছর বয়সে একটি নকআউট ম্যাচে এমন বিশাল মাপের একটি ইনিংস খেলা অসাধারণ ব্যাপার। রাজস্থান রয়্যালস যে এখন কোয়ালিফায়ার ২-এ উঠেছে, এর প্রধান কারণগুলির একটি হলো পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার প্রভাব।”
কদিন আগেই কেভিন পিটারসেনের সঙ্গে আলোচনায় সুরিয়াভানশি বলেছিলেন, টি-টোয়েন্টিতে ক্রিস গেইলের ১৭৫ রানের রেকর্ড ছাড়িয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করতে চান তিনি। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক বললেন, বিশ্বাসটা তারও আছে।
“বৈভাব আমাকে বলেছে, সে টি-টোয়েন্টিতে ২০০ রান করতে চায়। তার ওপর আমার বিশ্বাস আছে!”
অপেক্ষা এখন সেই ডাবল সেঞ্চুরির!