Published : 07 May 2026, 08:11 PM
দুইজন ব্যক্তিকে দল দেওয়ার ব্যাপারে বিসিবিকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন বিসিবি ইন্টেগ্রিটি ইউনিটের প্রধান অ্যালেক্স মার্শাল। তবু তাদের একজনকে দেওয়া হয়েছে বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা। দুটি দল গোটা টুর্নামেন্ট খেলে ফেলেছেন বিসিবির সঙ্গে চুক্তি না করেই। গত বিপিএলের অনিয়ম নিয়ে এরকম বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন বিসিবির বর্তমান অ্যাড-হক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের প্রধান ফাহিম সিনহা।
এছাড়াও তামিম জানান, এক সময়ের লাভজনক এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ থেকে গত মৌসুমে ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বিসিবির। পরে বোর্ড থেকে জানা যায়, ক্ষতির অঙ্কটি আসলে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
তামিম জানান, বিসিবির আগামী নির্বাচনে জিতে তিনি যদি দীর্ঘমেয়াদে সভাপতি হতে পারেন, তাহলে জোড়াতালি দিয়ে বিপিএল আয়োজন করবেন না।
মিরপুরে বৃহস্পতিবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে ফাহিম সিনহা বলেন, বিপিএলের আগের আসরের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে গত আসরে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাইয়ে কিছু মানদণ্ড ঠিক করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো অনুসরণ করা হয়নি।
“একাদশ আসরে (২০২৪-২৫) আমাদের একটা বিশাল ধরনের ব্লান্ডার হয় ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে। দ্বাদশ আসরে (২০২৫-২৬) আমরা কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিই, যেগুলো মেনে চলতে হবে। যেমন ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। এক হাজার কোটি টাকার টার্নওভার থাকতে হবে, যারা আবেদন করবে। তাদের প্রোফাইলে এগুলো চেক করে যে যে স্পেসিফিকেশন দেওয়া ছিল, এগুলো পরীক্ষা করে আমরা একটা দলকে ফ্র্যাঞ্চাইজি দেব।”

“কিন্তু যেটা হয়েছে, ইন্টেগ্রিটি বিভাগের অ্যালেক্স মার্শাল আমাদেরকে জানিয়েছেন, ইওআইর (এক্সপ্রেশনস অব ইন্টারেস্ট) আগে দুজন ব্যক্তির ব্যাপারে বলা হয়েছিল যে ইন্টেগ্রিটি ইস্যু আছে, তাদেরকে যেন ফ্র্যাঞ্চাইজি না দেওয়া হয়। কিন্তু তখনকার গভর্নিং কাউন্সিলের কয়েকজন নাকি খুব ‘ইনসিস্ট’ করে একজনকে বাধ্য করেছে দল দিতে। আরেকজনের ক্ষেত্রে একটু ‘লিনিয়েন্সি’ দেখিয়ে ওই ব্যক্তি পেছনে থেকে আরেকজনকে সামনে দিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর যে ব্যাপার, আমরা এসে দেখলাম যে, দুটি দলের সঙ্গে এখনও পর্যন্ত চুক্তিই হয়নি, অথচ একটা আসর খেলে ফেলেছে।”
ফাহিম সিনহা জানান, চুক্তি না হওয়া সেই দুই দল সিলেট টাইটান্স ও নোয়াখালী এক্সপ্রেস। দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজিই ছিল নতুন।
এছাড়াও আর্থিক সঙ্কটের কারণে বিপিএল শুরুর আগের দিন চট্টগ্রাম রয়্যালস দলের মালিকপক্ষ সরে যাওয়ায় সেই দলের দায়িত্ব নেয় বিসিবি। সেই দলটি পরিচালনা করতে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে জানান ফাহিম সিনহা। পরে তামিম জানান, সব মিলিয়ে এই বিপিএল থেকে বিসিবির ক্ষতি ১৪ থেকে ১৬ কোটি টাকা।
বিসিবি সভাপতি জানান, এসব ব্যাপারে কেউ চ্যালেঞ্জ করলে তারা সবসরকম তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
“আমি তো এক্সপোজ করেছি এবার। আগের সময় এক্সপোজ হয়নি। আমি একদম পুরো তথ্যসহ আপনাকে এক্সপোজ করেছি, যদি কেউ এটা চ্যালেঞ্জ করতে চায় দেন দে আর ওয়েলকাম টু ডু।”
বিসিবি ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা এখনও আলোচনা হয়নি বলে জানালেন তামিম।
“আমরা স্রেফ ঘোষণাটি দিলাম আজকে। আমরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, তাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত। আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেব কি না, এটা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। হঠাৎ করে আমি যদি বলে দিই যে, আমরা মামলা করব, সেটা ঠিক হবে না।”
তামিম প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি দীর্ঘমেয়াদে সভাপতি হতে পারলে ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাই প্রক্রিয়া নিখুঁতভাবে করার চেষ্টা করবেন। উপযুক্ত ফ্র্যাঞ্চাইজি না পেলে প্রয়োজনে টুর্নামেন্ট আয়োজন না করার পক্ষপাতী তিনি।
“সামনে যদি আমরা যদি দায়িত্বে আসি, আমার যেটা ইচ্ছা, পরিষ্কার বলি, যদি আমরা যথাযথ ফ্র্যাঞ্চাইজি না পাই, আমার কাছে মনে হয় না যে বিপিএলটা করা উচিত আমাদের। ফ্র্যাঞ্চাইজিকে যদি ক্রিকেটাররা বিশ্বাস করতে না পারে, পরিচ্ছন্ন ক্রিকেট হবে, ক্রিকেটাররা সময়ের মধ্যে টাকা পাবে, এসব যদি না হয়, বিপিএল করার মানে নেই। বিপিএল আমাদের দারুণ একটি প্রোডাক্ট। কিন্তু গতবারের মতো করার জন্যই করতে হলে এটার চেয়ে না করাই ভালো।”
“জোড়াতালি দিয়ে দলের মালিকানা দিয়ে, (ব্যাংক গ্যারান্টি) ১০ কোটির জায়গায় ২ কোটিতে দিয়ে দেওয়ার চেয়ে টুর্নামেন্ট না করাই ভালো। আশা করি, ভবিষ্যতে আমি আসি বা যারা আসে, তারা এটা নিয়ে কাজ শুরু করবে। আমাদের এখানে অনেক বড় বড় কর্পোরেট আছে, যাদেরকে আমাদের কনভিন্স করতে হবে (দল নিতে)। আমিও বিপিএলের অনেক বড় ভক্ত। কিন্তু বছরের পর বছর শুধু বিপিএলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে না, ক্রিকেট বোর্ডের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, ক্রিকেটারদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়, দেশ হিসেবেও বাংলাদেশের ওপরও বাজে প্রভাব পড়ে।”
প্রয়োজনে দেশের বাইরের প্রতিষ্ঠানকে ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানা দেওয়ার পক্ষপাতী তামিম। আইপিএল দলগুলির কর্ণধাররা যেমন এসএ টোয়েন্টি, দা হান্ড্রেড, সিপিএলসহ নানা লিগে দলের মালিকানা নিয়েছে, সেই উদাহরণ তুলে ধরলেন তিনি।
“সফল লিগ যেগুলো আছে, সফলভাবে বিশ্বব্যাপি চলছে, এদের ফ্র্যাঞ্চাইজিকে যদি আমরা কোনোভাবে রাজি করাতে করতে পারি বাংলাদেশে আসার জন্য, সেটা হবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথে বড় পদক্ষেপ। এর আগে অবশ্যই আমাদের নিজেদের দেশের যারা কর্পোরেট হাউজ আছে, তাদেরকে অ্যাপ্রোচ করতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি লিগে সফল যে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো আছে, তারা যদি ইন্টারেস্টেড হয়, তাহলে লিগের ভ্যালু স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যাবে।”
“এখন সিপিএল ভালো টুর্নামেন্ট, পিএসএলও ভালো, আইপিএল তো বিশ্বের সেরা লিগ। এখন তো দেখছি একটা দল অনেক জায়গায় দল কিনছে। তাদের জন্য বাংলাদেশ হবে দারুণ এক বাজার। আর্থিক দিক থেকে অনেক স্বস্তা হবে অন্যান্য লিগের তুলনায়। অন্যান্য লিগে দল চালাতে যত খরচ হয়, এর চেয়ে অনেক কম এখানে। এই জায়গায় যদি আমরা সঠিকভাবে ভাবতে পারি, সবার জন্যই লাভজনক হতে পারে।”