Published : 27 Nov 2025, 10:50 AM
সময়ের প্রবাহে এসিসি রাইজিং স্টার্স টুর্নামেন্টের ফাইনালের রেশ মুছে গেছে প্রায়। তবে মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন কি বের হতে পেরেছেন সেই ফাইনাল থেকে? সেদিন তিনি আউট হয়েছিলেন ৫ বলে শূন্য রান করে। ও হ্যাঁ, সেমি-ফাইনালে তার নামের পাশে ছিল ১ রান। আসরের চার ইনিংসে রান করেছিলেন মোট ৩৬, স্ট্রাইক রেট ৭৬.৫৯।
উঠতিদের এশিয়া কাপে যার এরকম পারফরম্যান্স, তাকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত মনে করছেন নির্বাচকরা। বিশ্বকাপে খেলানোর ভাবনায় এই কিপার-ব্যাটসম্যানকে রাখা হয়েছে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের দলে।
এই সিরিজ শুরুর আগের দিন বাংলাদেশ অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের সংবাদ সম্মেলন উত্তপ্ত হয় শামীম হোসেনকে নিয়ে। মাহিদুলের নাম সেখানে সেভাবে ওঠেইনি। তবে তার নামটিও তুমুলভাবে আলোচনায় আসার কথা এবং এখানেও যথারীতি কাঠগড়ায় নির্বাচকরা।
ভাবতে পারেন, রাইজিং স্টার্স তো মোটে একটি টুর্নামেন্ট। এখানে খারাপ করায় মাহিদুলকে দলে নেওয়া কেন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আদতে প্রশ্নটা উল্টো, মাহিদুল কোথায় ভালো করেছেন?
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার ভালো পারফরম্যান্স খুঁজতে চলে যেতে হচ্ছে বছরখানেক পেছনে। গত বিপিএলে তার ভূমিকা অনুযায়ী পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু এরপর গত ১০ মাসে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার তেমন কোনো পারফরম্যান্স নেই। অবিশ্বাস্যভাবে তাকেই নেওয়া হয়েছে জাতীয় দলে।

কাতারে রাইজিং স্টার্স টুর্নামেন্টের আগে মাহিদুল খেলেছেন সিলেটে জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টিতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকা মানের টুর্নামেন্টে তিনি করেছেন ৫ ইনিংসে ১১৬ রান। স্ট্রাইক রেট ১১৬.৮৩।
এর আগে খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে। সেখানেও ক্রিকেটীয় মান খুব উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। মাহিদুল করেছিলেন ৩ ইনিংসে ১৯ রান। স্ট্রাইক রেট ৯০.৪৭। জুলাইয়ে গ্লোবাস সুপার লিগে ৪ ইনিংসে করেছিলেন ৬৬ রান, স্ট্রাইক রেট ১২৪.৫২।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এ বছর ২৪ ইনিংস খেলে তার কোনো ফিফটি নেই। সেই ব্যাটসম্যানকেই নেওয়া হয়েছে বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশ দলে।
সবশেষ ফিফটি করেছিলেন তিনি গত ডিসেম্বরে, বিপিএলে। সেই আসরে তার পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। খুলনা টাইগার্সে তিনি পেয়েছিলেন ফিনিশারের ভূমিকা। সেই আসরে ৩৫.১১ গড়ে তিনি করেছিলেন ৩১৬ রান। স্ট্রাইক রেট ছিল ১৭৪.৫৮। টুর্নামেন্টে অন্তত ৩০০ রান করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে তার স্ট্রাইক রেটই ছিল সেরা।
সেই পারফরম্যান্স বিবেচনা করেই তাকে জাতীয় দলে নেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন সেটিই উল্লেখ করেছেন।

সেই বিপিএলে পারফর্ম করার পুরস্কার এতদিন পরে কেন দেওয়া হলো, বিস্ময় জাগতেই পারে। এর চেয়েও বড় প্রশ্ন আসলে প্রধান নির্বাচকের আরেকটি ভাবনা নিয়ে। তিনি বলেছেন, মাহিদুলকে নেওয়া হয়েছে ব্যাটিং অর্ডারের চার-পাঁচ নম্বরে ব্যাটিংয়ের ভাবনায়। মানে, গত বিপিএলে ফিনিশারের ভূমিকায় ভালো করা ক্রিকেটারকে এতদিন পর জাতীয় দলে নেওয়া হয়েছে ‘প্রপার’ মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে!
অনেক সময় অবশ্য ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনায় চার-পাঁচেই ফিনিশার খেলাতে হয়। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় সেই পরিস্থিতি তৈরি হয় সামান্যই। চার-পাঁচের ব্যাটসম্যানকে এথানে যথাযথ মিডল অর্ডারের ভূমিকাই বেশি পালন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দলের মিডল অর্ডারের অবস্থাও ভালো নয়। সেই সময়ে এখানে এমন একজনকে নেওয়া হলো, যিনি এই পজিশনে তেমন কিছুই করতে পারেননি গত কিছুদিনে।
এ বছর চার-পাঁচ নম্বরে ১৩ ইনিংস খেলে তার রান ২৫.৪১ গড়ে ৩০৫, ফিফটি নেই, স্ট্রাইক রেট ১২১.০৩।
মজার ব্যাপার হলো, এই সিরিজে মাহিদুলকে নেওয়া হয়েছে শামীমের বদলে। অথচ দুজনের ভূমিকা আলাদা। শামীম তো একজন ফিনিশার!
প্রধান নির্বাচকের আরেকটি যুক্তিও মহাবিস্ময় জাগানিয়া। তিনি বলেছেন, বিশ্বকাপের আগে এখন যদি মাহিদুলকে পরখ করে না দেখা হয়, তাহলে আর কখন! পরীক্ষা-নীরিক্ষা বা কাউকে পরখ করার জন্য নয়। সিরিজটি হওয়ার কথা টুকটাক ঘাটতি পূরণ করা, কিছু ‘ফাইন টিউন’ করা, শেষ সময়ে কিছু জায়গা শাণিত করা বা এই ধরনের কিছু।
চার-পাঁচের জন্য মাহিদুল বা অন্য কাউকে পরখ করার প্রয়োজন হলে সেটা হতে পারত এক বছর বা ছয় মাস কিংবা অন্তত মাস তিনেক আগে। গত এক বছরে নির্বাচকদের, কোচ-অধিনায়কের বা বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে এই পজিশনের বিকল্পের অভাব নিয়ে নানা প্রশ্নও হয়েছে। তারা সবাই সেটি উড়িয়ে দিয়েছেন।
অথচ বিশ্বকাপের আগে শেষ সিরিজে প্রধান নির্বাচক বলছেন, এখন না হলে আর কখন!
মাহিদুল যদি এই সিরিজে ভালো করেও ফেলেন, তবু তো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই!
বাংলাদেশের দল নির্বাচন প্রক্রিয়া কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি খণ্ডচিত্র বলা যায় মাহিদুলের এই অবাক দলে ঢোকা।