Published : 31 Dec 2025, 10:49 AM
ব্যাট হাতে নান্দনিকতার ঝংকার তুলে ২২ গজে অনেক লড়াইয়ে জিতেছেন ডেমিয়েন মার্টিন। এবার তার লড়াই জীবন বাঁচানোর। মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দুটি বিশ্বকাপজয়ী সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান। অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যমের খবর, ‘ইনডিউসড কোমা’ বা কৃত্রিমভাবে কোমায় রাখা হয়েছে ৫৪ বছর বয়সী সাবেক ক্রিকেটারকে।
গত শুক্রবার বক্সিং ডেতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে গোল্ড কোস্টের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে তার অসুস্থতার খবর খুব বেশি প্রচার করেনি পরিবার।
অস্ট্রেলিয়ার সাবেক রুলস ফুটবল তারকা ব্র্যাড হার্ডি পার্থের ৬পিএআর রেডিওতে প্রথম প্রকাশ্য করেন মার্টিনের অসুস্থতা খবর।
“ডেমিয়েন মার্টিন, ওয়েস্ট অস্ট্রেলিয়ার চ্যাম্পিয়ন, দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান… দুর্ভাগ্যজনকভাবে বক্সিং ডেতে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এখন কুইন্সল্যান্ডের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। জীবনের কঠিনতম লড়াই করছে সে।”
“আশা করব, মার্টোর জন্য সবাই শুভ কামনা জানাবেন এবং ইতিবাচক ভাবনা রাখবেন। ঈশ্বর তাকে শক্তি দিন। আশা করি সে লড়াইয়ে জিতবে, কারণ অবস্থা সত্যিই গুরুতর।”
গোল্ড কোস্ট স্বাস্থ্য বিভাগের একজন মুখপাত্র নাইন নেটওয়ার্ককে বলেন, “গোল্ড কোস্ট ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে গুরুদর অবস্থায় আছেন ডেমিয়েন মার্টিন।”
মেনিনজাইটিস হলো মস্তিষ্ক বা সুষুম্নাকাণ্ডের আবরণীর প্রদাহ বা মস্তিষ্ক-ঝিল্লীর প্রদাহ। খুবই গুরুতর রোগ এটি, যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক বা পরজীবীর সংক্রমণের কারণে ঘটে।
‘ইনডিউসড কোমা’ বা ‘মেডিক্যালি ইনডিউসড কোমা’ মানে প্ররোচিত কোমা বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ওষুধের মাধ্যমে অচেতন রাখা। অবস্থার উন্নতি হলে সামনে তাকে কোমা থেকে বের করে আনার আশা আছে। তবে আপাতত অবস্থা ভীষণ গুরুতর এবং তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে।
ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া ও অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলে মার্টিনের দীর্ঘদিনের সতীর্থ ও বন্ধু অ্যাডাম গিলক্রিস্ট পরে জানান, মার্টিনের চিকিৎসায় কোনো কমতি রাখা হচ্ছে না।
“সম্ভাব্য সেরা চিকিৎসাই সে পাচ্ছে। অ্যামান্ডা (মার্টিনের সঙ্গী) ও ওর পরিবার নিশ্চয়ই জানে, অসংখ্য মানুষ প্রার্থনা করছে ও শুভ কামনা জানাচ্ছে।”
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৬৭ টেস্ট খেলে ৪৬.২৭ গড়ে ৪ হাজার ৪০৬ রান করেছেন মার্টিন। সেঞ্চুরি করেছেন ১৩টি, ফিফটি ২৪টি। ২০৮ ওয়ানডে খেলে ৪০.৮০ গড়ে করেছেন ৫ হাজার ৩৪৬ রান। এই সংস্করণে শতরান ৫টি, অর্ধশত ৩৭টি।

ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটও কিছুটা পেয়েছেন। ইতিহাসের প্রথম আন্তর্জাদিক টি-টোয়েন্টিতে খেলেছেন। চারটি ম্যাচ খেলেছেন এই সংস্করণে। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫৬ বলে ৯৬ রানের একটি ইনিংস আছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান বা সংখ্যায় মার্টিনকে ফুটিয়ে তোলা যাবে সামান্যই। দারুণ স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান ছিলেন মার্টিন, যার মায়াঞ্জন বুলিয়ে দিত চোখে, দোলা দিত হৃদয়ে। তার কাভার ড্রাইভ, তার ফ্লিক, কাট শট, তার ব্যাটিংয়ে যেন নান্দনিকতার ফুল ফুটত। তার টেকনিক ছিল ধ্রুপদি ঘরানার, সব ধরনের শট ছিল হাতে।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তিনি জিতেছেন ১৯৯৯ ও ২০০৩ বিশ্বকাপ। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি। তবে ২০০৩ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার শিরোপা জয়ের নায়কদের একজন ছিলেন তিনি। ফাইনালে ভাঙা আঙুল নিয়ে খেলে উপহার দেন ৮৪ বলে ৮৮ রানের অপরাজিত ইনিংস। অধিনায়ক রিকি পন্টিংয়ের সঙ্গে গড়েন ২৩৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি।
ওই বিশ্বকাপে ৩২৩ রান করেন তিনি ৬৪.৬০ গড়ে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক ১৯৯২ সালে। তবে শুরুর কয়েক বছর দলে জায়গা পাকা করতে পারেননি। নব্বই দশকের শেষ দিকে ওয়ানডেতে নিয়মিত হতে শুরু করেন। টেস্ট দলে ফিরে আসেন ২০০০ সালে। এরপর থেকে দুই সংস্করণেই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটিংয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটসম্যান হিসেবে পেস বোলিং তো তিনি ভালো খেলতেনই, তবে তার বিশেষ দক্ষতা ছিল স্পিনে। ওই সময়ের অস্ট্রেলিয়া দলে স্পিনের বিপক্ষে সেরা মনে করা হতো তাকেই। ২০০৪ সালে ভারত সফরে অস্ট্রেলিয়ার স্মরণীয় সিরিজ জয়ের নায়ক তিনি। সেবার চেন্নাই ও নাগপুরে করেছিলেন সেঞ্চুরি, আরেক ইনিংসে আউট হন ৯৭ রানে। ৪৪৪ রান করে হয়েছিলেন সিরিজ-সেরা।
ওই বছর শ্রীলঙ্কা সফরে অস্ট্রেলিয়ার ৩-০ ব্যবধানের অভাবনীয় সিরিজ জয়েও মার্টিন করেছিলেন দুটি সেঞ্চুরি।
তারকায় ঠাসা অস্ট্রেলিয়া দলে খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ছিলেন খানিকটা ‘আন্ডাররেটেড।’ নিজেও চাইকেন পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে থাকতে। কিছুটা খেয়ালীও ছিলেন। তার ক্যারিয়ারের শেষটাও এমনই। ২০০৬-০৭ অ্যাশেজের দুটি টেস্টে ব্যর্থতার পর হুট করেই অবসর ঘোষণা করে ঘুরতে চলে যান বন্ধুদের সঙ্গে।
খেলা ছাড়ার পর বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ধারাভাষ্য দিয়েছে বা বিশ্লেষকের কাঝ করেছেন। এছাড়া ক্রিকেট থেকে দূরেই ছিলেন। তার জন্য প্রার্থনায় এখন গোটা ক্রিকেট বিশ্ব।