Published : 16 May 2026, 09:42 PM
“পাকিস্তানের পেসার খুররাম শাহজাদ তো বলে গেলেন, আপনি নাকি ‘লাকি’ ছিলেন! আপনার নিজের কি মনে হয়?”, সংবাদ সম্মেলনে লিটন কুমার দাসের কাছে প্রথম প্রশ্নই ছুটে গেল এটি। ২২ গজে এ দিন পাকিস্তানিদের বাউন্সারের দারুণ জবাব দিয়েছেন তিনি। সেটিই বুঝি যথেষ্ট মনে হলো তার। কথার বাউন্সার তাই এড়িয়েই গেলেন, “লাকি বলছে? ঠিইক আছে, লাকের দরকার আছে…।”
সৌভাগ্যের ছোঁয়া তার ইনিংসে কিছুটা ছিল বটে। ৫২ রানেই তিনি আউট ছিলেন। শাহজাদের বলেই ক্যাচ নিয়েছিলেন কিপার। কিন্তু ব্যাটে আলতো করে বলের স্পর্শ বুঝতে পারেননি আম্পায়ার। তিনি আউট দেননি। পাকিস্তান রিভিউও নেয়নি। বেঁচে যান লিটন।
তবে একটি সেঞ্চুরির ইনিংস, এতটা অসাধারণ ইনিংস তো স্রেফ সৌভাগ্যের ছোঁয়ায় হতে পারে না! লিটনের ইনিংসে ছিল স্কিল, টেম্পারমেন্ট, দুর্দান্ত মানসিকতা ও সাহসিকতার মিশেল। লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে ইনিংস গড়ার ক্ষেত্রে এটি ছিল ব্যাটিং মাস্টারক্লাস।
১১৬ রানে যখন ষষ্ঠ উইকেট হারায় দল, লিটনের রান তখন ছিল মাত্র ২। ওই বিপর্যয় থেকে তাইজুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামকে নিয়ে যোগ করেন তিনি ১৬২ রান, সেখানে তার নিজের রান ছিল ১২৪।
বিপদের মধ্যে এমন ইনিংস তিনি আগেও খেলেছেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরিটি যখন তিনি করলেন, ২০২১ সালে সেই টেস্টে তিনি ক্রিজে গিয়েছিলেন দল ৪৯ রানে ৪ উইকেট হারানোর পর। ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে ১৩৮ রানের ইনিংস খেলেছিলেন, যখন ২৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে দল ছিল ধ্বংসস্তূপ।
ক্যারিয়ার সেরা ১৪১ রানের ইনিংসটি তিনি খেলেছেন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুরে। সেখানে দলের রান ছিল ৫ উইকেটে ২৪! ২০২২ সালে ক্রাইস্টচার্চেও সেঞ্চুরি করেছিলেন দলের বিপদের সময়।
তবে ওই ইনিংসগুলোর সময় ক্রিজে সঙ্গী ছিলেন মুশফিকুর রহিম, মেহেদী হাসান মিরাজরা, যারা স্বীকৃত ব্যাটসম্যানই। এবার তিনি শতরান করেছেন শুধুই লোয়ার অর্ডারদের নিয়ে।
ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে এই প্রসঙ্গটিই উঠে এলো বারবার। লিটন ব্যাখ্যা করলেন তার পরিকল্পনা আর ওই সময়ের মানসিকতা।
“আমার ভূমিকা একটু ভিন্ন থাকে, যখন টেস্ট ক্রিকেটে খেলি। কখনও ব্যাটিং করতে হয় মুশি (মুশফিকুর রহিম) ভাই, মিরাজের সঙ্গে। যখন ব্যাটসম্যান থাকে (সঙ্গী), তখন মাইন্ডসেট পুরো আলাদা থাকে। তবে আমাদের টেলএন্ডাররা তো এতটা শক্তিশালী নয়, যাদেরকে আমি প্রতি ওভারে চার-পাঁচ বল খেলার সুযোগ করে দেব। এখানে আমার কাজটা কঠিন।”
“তবে এই ইনিংসটাতে সেঞ্চুরির থেকে বড় ব্যাপার যে, আমাদের নিচের দিকে যারাই ব্যাটিং করেছে—তাইজুল ভাই, তাসকিন, শরিফুল—এই তিনজন ব্যাটসম্যান অনেকগুলা বল খেলেছে। তারা তো রান করবে না, রান তো আমাকেই করতে হবে। ব্যাটসম্যান হিসেবে রান করার দায়িত্বটা আমার। তবে ওরা যখন উইকেটে থাকে, কাজটা সহজ হয়ে যায় আমার জন্য।”
বিপর্যয়ের মধ্যে তার আগের সেঞ্চুরিগুলোর সঙ্গে এই সেঞ্চুরির তুলনাতেও ব্যাপারটি তুলে ধরলেন তিনি নিজেই। ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পর তার লক্ষ্য ছিল দলের রানকে ২০০ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া।
“শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যে ইনিংসটা ছিল, ওটা পুরো আলাদা। কারণ মুশফিক ভাইয়ের সঙ্গে জুটি ছিল। ব্যাটসম্যান যখন সঙ্গী থাকবে, তখন মাইন্ডসেট স্বচ্ছ থাকে। রাওয়ালপিন্ডিতেও একই ছিল, মিরাজ ছিল সঙ্গে। আজকেরটা পুরো ভিন্ন। আমি মনে হয় যখন দুই রান, তখন তাইজুল ভাই স্ট্রাইকে আসছে। সেঞ্চুরি মানুষ বলে-কয়ে করতে পারে না। আমি এটা নিয়ে খুব একটা চিন্তিতও না যে সেঞ্চুরি করা লাগবে। আমার লক্ষ্য ছিল, রানটা কীভাবে বোর্ডে আসবে।”
“আমার চাওয়া ছিল দলকে ২০০ রান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া যায় কীভাবে। জানতাম যে কাজটা আমাকেই করতে হবে। আমি একটা ইনফরমেশন পাঠিয়েছিলাম যে, আমরা আক্রমণে যাব কি না। ওপর থেকে (ড্রেসিং রুম) বলেছে রানের জন্য খেলতে। আমি চেষ্টা করেছি রান করার।”

লিটনের ইনিংসের বেশির ভাগ সময় ধরেই ফিল্ডিং ছিল সীমানায় ছড়ানো। শতরানের দিকে যখন তিনি এগোচ্ছেন, তখন তো এমনকি ৮ জন ফিল্ডারও রাখা হয়েছে সীমানায়। ওই সময়ের লিটন এগিয়েছেন নিজের ছকে।
“ওই সময়টায় আমার মনে হচ্ছিল যে, ওভারে চারটা করে বল খেলতে হবে আমাকে, এক-দুইটা বল টেলএন্ডারতের দেব। মাথায় ওই জিনিসটাই ছিল, যত বেশি পারা যায়, আমি খেলব। বুঝছিলাম যে সামনের বলটায় রান করাটা আমার জন কষ্টকর হবে। চাচ্ছিলাম তারা ব্যাক অব লেংথে বল করুক, যেটা আমি স্কোরিংয়ের সুযোগ হিসেবে নিতে পারি। আপনি যদি দেখেন, পেস বোলিংয়ে বেশির ভাগ রান আমার ব্যাক অব লেংথের বলে এসেছে।”
পাকিস্তানি পেসাররা যখন একের পর এক বাউন্সারের কৌশল বেছে নিয়েছে, লিটন সেটিকেই কাজে লাগিয়েছেন নিজের রান বাড়ানোর পথ হিসেবে।
“বাউন্সার…আমি মনে করি এটা একটা রান করার সুযোগ আমার জন্য। গত দুই ইনিংসে বাউন্সারে আউট হয়ে গেছি এবং আজকে মনে হয় তাদের ব্যাক অফ দা মাইন্ডে ওই জিনিসটা ছিল। বাউন্সার তাদের কাছে মনে হয়েছে একটা সেরা অপশন। তবে আমি অনেক উপভোগ করেছি বাউন্সার।”
লিটন এমন একটি ইনিংস খেলেছেন বলেই ম্যাচে বাংলাদেশের সম্ভাবনা টিকে আছে। তবে ২৭৮ রান নিয়ে লিড পেতে হলে বোলারদের অপেক্ষায় কঠিন চ্যালেঞ্জ। লিটন জানালেন, বোলারদের দিকে তাকিয়ে এখন তারা।
“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব (লিড নিতে)। বোলারদের দায়িত্বটা অনেক বেশি। একটা ভালো ব্যাপার হচ্ছে যে আউটফিল্ডটা খুবই ধীরগতির, বল অনেক জোরে মারতে হয় বাউন্ডারি হওয়ার জন্য। তবে আবার বলছি, বোলারদের দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ সকালে উইকেট যেরকম ছিল, সময়ের সঙ্গে সেটা আরও ভালো হয়েছে। বোলারদের অ্যাকুরেসি ভালো হওয়া উচিত।”
“কালকে সকালবেলা যদি আবহাওয়া একটু মেঘলা থাকে, প্রথম ১০ ওভার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওখান থেকে যদি এক-দুইটা উইকেট নিতে পারি, তারা ব্যাকফুটে পড়বে। মূল ব্যাপার হচ্ছে বোলারদের লম্বা সময় ধরে বল করতে হবে এবং ভালো জায়গায় বল করতে হবে। যদি ওরা লিডও পায়, সেটার জন্য যেন অনেক সময় লাগে।”