Published : 15 Jun 2023, 08:03 PM
দারুণ বাউন্সার ঠিকভাবে সামলাতে পারলেন না আমির হামজা হোতাক। দুর্দান্ত ক্যাচ নেওয়া মুমিনুল হকের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেই চিরচেনা স্যালুট দিলেন ইবাদত হোসেন চৌধুরি। আফগানিস্তানের তখনও বাকি ৩ উইকেট। দেশের মাটিতে প্রথমবার ৫ উইকেট পেতে ইবাদতের দরকার তখন স্রেফ একটি।
অথচ এরপর তিনি কিনা বোলিংয়ের সুযোগ পেলেন মাত্র এক ওভার! দিন শেষে জানা গেল, তার আর বোলিং না পাওয়ার কারণ ছিল মন্থর ওভার রেটের চোখরাঙানি। ব্যক্তিগত মাইলফলক মিলিয়ে গেলেও তাই আক্ষেপ নেই তার। ২৯ বছর বয়সী পেসার খুশি দলের জন্য অবদান রাখতে পেরেই।
তৃপ্ত তিনি হতেই পারেন। মিরপুর টেস্টের দুই দিন শেষেই যে জয়ের ছবি আঁকছে বাংলাদেশ, তাতে বড় ভুমিকা তো তারই!
দ্বিতীয় দিন সকালে ব্যাটিংয়ে ধস নামলেও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত প্রথম ইনিংসে লিড নেয় ২৩৬ রানে। ৪ উইকেট নিয়ে সফলতম বোলার ইবাদতই। দিনশেষে সেই লিড বেড়ে হয়েছে ৩৭০।
আফগানদের প্রথম ইনিংসে ১০ ওভারে এক মেডেনসহ ৪৭ রানে ৪ উইকেট ইবাদতের। যা দেশের মাটিতে তার সেরা বোলিং। আর একটি শিকার ধরতে পারলেই ২০১০ সালের পর বাংলাদেশের প্রথম পেসার হিসেবে দেশের মাঠে ৫ উইকেটের কৃতিত্ব হতে পারত তার।
কিন্তু চতুর্থ উইকেট পাওয়ার পর আর এক ওভার করিয়েই তাকে আক্রমণ থেকে সরিয়ে নেন লিটন দাস। দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে ইবাদত জানান, মন্থর ওভার রেট নিয়ে দুর্ভাবনায় পেসার সরিয়ে দুই প্রান্তে স্পিনার আক্রমণে আনেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

“যা পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ্! ৫ উইকেট হয়নি... তবে যে জিনিসটা ছিল, আমরা ২ ওভার পিছিয়ে ছিলাম। তো অধিনায়ক চেয়েছে যে, আমরা যদি পিছিয়ে থাকি, তাহলে তো জরিমানার একটা ব্যাপার আছে।”
“তখন অধিনায়ক বলেছে যে, 'আমি চা বিরতির পর দুই পাশ থেকে স্পিনার দিয়ে শুরু করব।' তো ঠিক আছে এটি। যেহেতু আমার কাছে দলই আগে। আমার কাছে মনে হয়েছে, আমার ব্যক্তিগত কিছুর চেয়ে দলের স্বার্থটাই বড়।”
চলতি টেস্টে এখন পর্যন্ত আলোকস্বল্পতা বা বৃষ্টিতে ওভার কাটা পড়েনি। তবু ম্যাচ থেকে এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে ২৮ ওভার। প্রথম দিন ৭৯ ওভারের পর এদিন খেলা হয়েছে মোটে ৬৯ ওভার। এর মধ্যে দুই দফায় ইনিংস বিরতির জন্য কাটা গেছে ৪ ওভার।
দ্বিতীয় দিনে প্রথম সেশনে ৬৪ মিনিটে স্রেফ ১০.৪ ওভার বোলিং করে বাংলাদেশ। স্বাভাবিক হিসেবে, এই সময়ের মধ্যে অন্তত ১৫ ওভার ছিল আদর্শ। পরে দ্বিতীয় সেশনের দুই ঘণ্টায় স্বাগতিকরা করে ২৫.২ ওভার। অথচ এক সেশনে তাদের করার কথা ৩০ ওভারের কাছাকাছি।
আনুষঙ্গিক সব বিরতি বাদ দেওয়ার পরও তাই চা বিরতি পর্যন্ত ২ ওভার পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। এজন্য হয়তো আফগানদের ইনিংসে ৩০ ওভারের পর থেকে আর পেসার ব্যবহার করেননি লিটন। অল্প সময়ের মধ্যে ওভার শেষ করে ওভার রেটের কিছুটা উন্নতি ঘটান তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ।
মন্থর ওভার রেটের কারণে ৫ উইকেট পূরণের সুযোগ না পেলেও নিজের ও দলের অন্য পেসারদের বোলিংয়ে সন্তুষ্টি ফুটে উঠল ইবাদতের কণ্ঠে। তার ৪ উইকেট ছাড়াও বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম নেন ২ উইকেট।
শুধু উইকেট সংখ্যার বিচারেই নয়, মিরপুরের সবুজ উইকেটের সুবিধা কাজে লাগান ইবাদত-শরিফুলরা। ভালো লাইন-লেংথে আফগান ব্যাটসম্যানদের আটকে রাখার সঙ্গে বাউন্সারে তাদের ভড়কে দেন প্রায় নিয়মিতই। দুজন মিলে নেন ৬ উইকেট। এছাড়া তাদের বোলিংয়ে ক্যাচ পড়ে আরও ৩টি। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল স্লিপের আশপাশ দিয়ে যায় বেশ কয়েকবার।
এই দুজনের তুলনায় এই ইনিংসে কিছুটা নিষ্প্রভ ছিলেন দলের পেস বোলিংয়ের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা তাসকিন আহমেদ। তবু সবুজ উইকেটে পেসারদের দাপুটে পারফরম্যান্সের আনন্দটাই বেশি ইবাদতের।
“আমার দেখা, বাংলাদেশ এই প্রথম যে, আমরা এরকম উইকেট পেয়েছি। সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে, তিনটা ফাস্ট বোলার টেস্টে, এরকম উইকেটে খেলা- এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সৌভাগ্য। আমরা চেষ্টা করেছি, ওদেরকে যত কম রানে আউট করা যায়। আমরা পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছি।”
ইবাদতের ৪ উইকেটের প্রতিটিই ছিল খাটো লেংথের ডেলিভারি। আচমকা বাউন্সারে শুরুতে চমকে যান আব্দুল মালিক। পুল করতে গিয়ে টাইমিংয়ে গড়বড় হয় রহমত শাহর। আফসার জাজাই তুলনামূলক ভালো পুল করলেও জোর পাননি। ক্যাচ উঠে যায় ডিপ স্কয়ার লেগে।
তবে সবগুলো উইকেট বাউন্সার ধরনের ডেলিভারিতে পেলেও ইবাদতের পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।
“আমি যে উইকেটগুলো পেয়েছি, সেগুলো টানা বাউন্সার করার কারণে নয়। টানা সামনে বল করে ব্যাটসম্যানকে সেট আপ করেছি। এরপর আচমকা বাউন্সার করেছি। আগে দেখা যেত আমি ইনসুইং, আউটসুইং, বাউন্সার- এরকম ওভারে একসাথে দুই-তিনটা চেষ্টা করতাম। এখন ব্যাটসম্যানকে সেটআপ করে বোলিং করা আস্তে আস্তে আয়ত্ব করার চেষ্টা করতেছি। উইকেটেও একটু সাহায্য ছিল। সেটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি।”
দেশের মাটিতে, বিশেষ করে মিরপুরে টেস্ট ম্যাচ মানেই সচরাচর দেখা যায় স্পিন সহায়ক উইকেট। কিন্তু এবার তাজা ঘাস রেখে পেসবান্ধব উইকেট দেওয়া হয়েছে আফগানিস্তানের সামনে। এটি বড় সুযোগ হয়ে এসেছে গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত উন্নতি করতে থাকা বাংলাদেশের পেস ইউনিটের জন্যও।
তা কাজে লাগানোর পর ইবাদতের আশা, সামনের দিনগুলোতে হয়তো পেসারদের ওপর আরও ভরসা পাবে টিম ম্যানেজমেন্ট।
“উইকেট অনেক ভালো। আমরা তিন ফাস্ট বোলার খেলেছি এখানে, ভালো বোলিং করেছি। এখনও ম্যাচটি শেষ হয়নি, মাত্র একটা ইনিংস বোলিং করেছি। দেখা যাক, দ্বিতীয় ইনিংসে এই ভালোটা করতে পারি কি না। জিনিসটা হচ্ছে, আমরা তিনজনই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে ভালো কিছু করব, ভালো শুরু এনে দেব।”
“আমরা চেষ্টা করেছি, উইকেটটা যেহেতু আমাদের পক্ষে আছে, আমরা তিনজন মিলে এটা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছি। বাকিটা টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার। আমার মনে হয়, আমরা যদি ধারাবাহিকভাবে এরকম করতে পারি, অবশ্যই আমাদের ওপর তারা ভরসা করতে পারবেন।”